অটিস্টিক শিশুরাও সমাজ নির্মাণে অংশ নিতে পারে - মতামত - দৈনিকশিক্ষা


অটিস্টিক শিশুরাও সমাজ নির্মাণে অংশ নিতে পারে

অধ্যাপক ড. মো. লোকমান হোসেন |

অটিজম একটি মানসিক বিকাশঘটিত সমস্যা যা স্নায়ুতন্ত্রের গঠন ও পরিবর্ধনজনিত অস্বাভাবিকতার ফলে সৃষ্টি হয়। সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ও অসামান্য প্রতিভার অধিকারী স্যার আইজ্যাক নিউটন এই দুই মহাবিজ্ঞানীর স্বভাব, আচার-আচরণ এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে অক্সফোর্ড এবং ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই অধ্যাপক ইউয়ান জেমস এবং সিমন বেরন কোহেন গবেষণা পরিচালনা করে যেই সিদ্ধান্তে উপনীত হন তা হলো, আলবার্ট আইনস্টাইন এবং আইজ্যাক নিউটন উভয়ই অটিস্টিক বা পার্ভেসিভ ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার বা অ্যাসপারজার সিনড্রোমে আক্রান্ত ছিলেন। অস্কারজয়ী অভিনেতা স্যার অ্যান্থনি হপকিন্স, এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড-এর লেখক লুইস ক্যারল, কালজয়ী কেমিস্ট হেনরি ক্যাভেন্ডিস, বিবর্তনবাদের প্রবক্তা চার্লস ডারউইন, গ্রান্ডমাস্টার বিশ্বদাবা-চ্যাম্পিয়ন ববি ফিশার কিংবা নিকোলাস টেসলারের মতো বিজ্ঞানীসহ সবাই অটিজম সমস্যায় ভুগেছিলেন।

১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে ‘অটিজম’ শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন সাইকিয়াট্রিস্ট ইউজেন বিউলার। আর অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (এএসডি) ধারণার জন্ম দেন অস্ট্রিয়ান মেডিকেল থিয়োরিস্ট হ্যানস অ্যাসপারজার এবং আমেরিকান শিশু-মনোবিজ্ঞানী লিও ক্যানার। লিও ক্যানার ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে ১১ জন শিশুকে নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করেন। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, ওই সকল শিশুর স্মৃতি ধরে রাখা, সামাজিক সম্পর্ক তৈরি, ডাক দিলে সাড়া না দেয়া, সহনশীলতা, বুদ্ধিমত্তা, দক্ষতার প্রয়োগ, একই কথার পুনরাবৃত্তি ইত্যাদি সমস্যা রয়েছে। সবচেয়ে অবাক বিষয় হলো, এত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও অটিস্টিক শিশুরা নিম্ন বুদ্ধিসম্পন্ন হয় না। এরা গড় বুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে থাকে এবং কিছুকিছু ক্ষেত্রে এরা উচ্চ বুদ্ধিসম্পন্ন হয়। আর তখনই একজন অটিস্টিক তার পছন্দের বিষয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে যায়। নিজের পছন্দের বিষয়ে, কোনো ধাঁধা কিংবা সমস্যার সমাধানে এরা বেশ দক্ষ হয়ে থাকে।

অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার (এএসডি) একটি জটিল স্নায়ুবিক বিকাশ সংক্রান্ত রোগের শ্রেণি। স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার হলো এক ধরনের মানসিক জটিলতা যেখানে অনেক ধরনের নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার ও মানসিক সমস্যা বা প্রতিবন্ধিতা একসাথে ঘটতে পারে। এই ধরনের নিউরোলজিকাল বা স্নায়ুবিক সমস্যার কারণে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, যার সাথে মানসিক বিকাশগত জটিলতাও প্রকাশ পায়। সাধারণত ছেলে-শিশুরাই এই ধরনের সমস্যায় বেশি ভোগে। এটা একজন ব্যক্তির মস্তিষ্কের রোগ, যা সাধারণত অন্যদের সাথে পারস্পরিক যোগাযোগ করার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের বেড়ে ওঠা, তাদের কথাবার্তা, অঙ্গভঙ্গি ও আচার-আচরণ একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে, অনেকক্ষেত্রে শিশুর মানসিক বিকাশ ও ভাষার উপর দক্ষতা কম থাকে। এই সমস্যার কারণে শিশুর আচরণগত এবং মানসিক সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়, যার ফলে কথা বলা বা ঠিকমতো শব্দ উচ্চারণ করা, নতুন জিনিস বুঝতে পারা বা শেখা কিংবা সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলা শিশুর জন্য বেশ বড়সড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

চিকিৎসকদের মতে ভাইরাল ইনফেকশন, গর্ভকালীন জটিলতা, শিশুর জন্মের সময় নার্ভাস সিস্টেমে আঘাত লাগা, গর্ভকালীন অবস্থায় মায়েদের বিশেষ কিছু ঔষধ, যেমন- থ্যালিডোমাইড এবং ভালপ্রোয়িক এসিড সেবনের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অটিস্টিক বাচ্চার জন্ম হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পরিবেশগত কারণে, যেমন- বায়ুদূষণকারী উপাদানসমূহ স্পেক্ট্রাম ডিজঅর্ডার হওয়ার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। জেনেটিক বা বংশগত কারণে অটিস্টিক হওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ক্রোমোজোমের অস্বাভাবিক অবস্থার কারণে অটিজম স্পেক্ট্রাম ডিজঅর্ডার বা জেনেটিক ডিজঅর্ডার হতে পারে, যেমন- রেড সিন্ড্রোম বা ফ্র্যাজাইল এক্স সিন্ড্রোমের সাথে এই রোগটি হতে পারে। কিছু জিন মস্তিষ্কের কোষসমূহের পরিবহন ব্যবস্থায় বাধা প্রদান করে এবং এ রোগের তীব্রতা বৃদ্ধি করে। জেনেটিক বা জিনগত সমস্যা বংশগতও হতে পারে, আবার নির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই হতে পারে। ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধকের সাথে অটিজমের কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। এএসডি সাধারণত একজন লোকের ৩ বছর বয়স বা তার আগে শুরু হয়ে সমগ্র জীবন পর্যন্ত থাকতে পারে, যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপসর্গ কমে যেতে পারে। কিছু শিশুর ক্ষেত্রে প্রায় ১৮ থেকে ২৪ মাস বয়স পর্যন্ত স্বাভাবিক বিকাশ হয় বলে ধারণা করা হয়। তারপর তারা নতুন দক্ষতা অর্জন বন্ধ করে অথবা পূর্বের অর্জিত দক্ষতা হারিয়ে ফেলে।

এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে যে লক্ষণগুলো দেখতে পাওয়া যায় সেগুলো হলো- অটিস্টিক শিশুদের ঘুম স্বাভাবিক না হওয়ার কারণে তাদের মনোযোগ ও কাজের সক্ষমতা কমে যায়; সঠিক সময়ে কথা বলতে সমস্যা হয়; অল্প মাত্রায় হলেও বুদ্ধি- প্রতিবন্ধিতা লক্ষ করা যায়; শারীরিক বৃদ্ধি সঠিকভাবে হয় না; প্রতি চারজনে একজনের খিঁচুনি সমস্যা হতে পারে; মানসিক অস্থিরতার ঝুঁকি বেশি থাকে; বিষণ্নতা, উদ্বিগ্নতা ও মনোযোগে ঘাটতি দেখা দিতে পারে; নাম ধরে ডাকলেও সাড়া দিতে চায় না; সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে চায় না, একা একা থাকতে চায়; একই শব্দ বা কথা বারবার উচ্চারণ করে; হঠাৎ মনের ভাব পরিবর্তন করে ফেলে, যাকে বলে বাইপোলার ডিসঅর্ডার; কারো চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারে না; অস্বাভাবিক বিষয়ে আগ্রহ বেড়ে যায়; অস্বাভাবিক শব্দ করে বা দেরি করে কথা বলতে শিখে; শব্দ বা ছোট ছোট বাক্য বারবার বলতে থাকে (ইকোলালিয়া); প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কহীন উত্তর দেয়; ইশারা-ইঙ্গিতে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে; নতুন কোনো পরিবর্তনের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে চায় না; অন্য মানুষের অনুভূতি বুঝতে বা তাদের নিজস্ব অনুভূতি প্রকাশ করতে অসুবিধা বোধ করে; ছোটখাটো কোনো পরিবর্তন পছন্দ করে না; কিছু কিছু সময় দুই হাতে ঝাপটি মারতে থাকে; শরীর দোলাতে থাকে অথবা চক্রাকারে ঘোরাতে থাকে; অনেক শিশু দেখা, শোনা, গন্ধ, স্বাদ, চেহারা অথবা স্পর্শের প্রতি অতি সংবেদনশীল অথবা প্রতিক্রিয়াহীন হয়ে থাকে ইত্যাদি।

গবেষণায় দেখা গেছে এএসডি-আক্রান্ত রোগীদের মস্তিষ্কে সেরোটোনিন বা অন্যান্য নিউরোট্রান্সমিটার অস্বাভাবিক মাত্রায় থাকে। এই সব অস্বাভাবিকতা ধারণা দেয় যে ভ্রুণ বৃদ্ধির প্রারম্ভিক অবস্থায় জিনের অস্বাভাবিকতার জন্য মস্তিস্কের বৃদ্ধি এবং মস্তিষ্কের কোষগুলি নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করে। শিশুর আচরণ এবং বৃদ্ধির উপর ভিত্তি করে চিকিৎসকরা এই রোগ নির্ণয় করতে পারেন।

অনেকের ধারণা সঠিক পরিচর্যার অভাবে অটিস্টিক শিশু হয়ে থাকে, এটা কিন্তু ঠিক নয়। অটিস্টিক শিশুকে অনেকে পিতা-মাতার অভিশাপ বলে থাকেন, কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল, ভিত্তিহীন এবং অবৈজ্ঞানিক। সম্পূর্ণ সুস্থ বাবা-মায়েরও ঘরেও অটিস্টিক শিশু জন্ম নিতে পারে। অনেক শিশু জন্ম ও স্বভাবগতভাবেই একটু বেশি অস্থির, চঞ্চল, রাগী অথবা জেদি প্রকৃতির হয়ে থাকে। এতেই কিন্তু বোঝা যায় না যে শিশুটি অটিস্টিক। শিশুর কোনো আচরণে অটিজমের লক্ষণ প্রকাশ পেলে দেরি না করে প্রাথমিক অবস্থাতেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। আমাদের সমাজে প্রচলিত নানান ভুল ধারণা ও কুসংস্কারের ফলে অনেক শিশুর ভুল চিকিৎসা শুরু হয়, যা শিশুর জীবনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে, অটিজম সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় অনেক শিশু ভুল রোগনির্ণয়ের শিকার হয়ে থাকে। আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় না করেই তাদেরকে অ্যান্টি-সাইকোটিক জাতীয় ঔষধ দেয়া হয়। চিকিৎসকদের মধ্যেও অটিজম বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো দরকার। সঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহণ করলে সম্পূর্ণ সুস্থ-স্বাভাবিক হয়ে বিয়ে ও সংসার করাও অনেকের পক্ষেই সম্ভব।

প্রাথমিক অবস্থায় কোনো শিশুর অটিজম নির্ণয় বা উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলে অটিজমের ক্ষতিকারক প্রতিক্রিয়াগুলো সফলভাবে মোকাবেলা করা যায়। অটিজমের যেহেতু সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই, তাই সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই তা প্রতিরোধ করা উত্তম। পরিবারে কারো অটিজম অথবা কোনো মানসিক এবং আচরণগত সমস্যা থাকলে পরবর্তী সন্তানের ক্ষেত্রে অটিজমের ঝুঁকি অনেকটা বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে পরিকল্পিত গর্ভধারণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভাবস্থায় অধিক দুশ্চিন্তা না করা, পর্যাপ্ত ঘুম, শিশুর সাথে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন ইত্যাদি ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। আরও বেশকিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, যেমন- বেশি বয়সে বাচ্চা না নেয়া, বাচ্চা নেয়ার আগে মাকে রুবেলা ভেকসিন দেয়া নিশ্চিত করা, গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ না খাওয়া, মদ্যপানের মতো কোনো অভ্যাস থেকে থাকলে বাচ্চা নেয়ার আগেই তা পরিহার করা, বাচ্চাকে মায়ের বুকের দুধ পান করানো ইত্যাদি।

আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের মতে এএসডি সবরকমের মানসিক জটিলতার সমন্বয়। এর অপর নাম ‘হাই ফাংশনিং অটিজম’। স্নায়ুগত সমস্যার কারণে ভাষাগত জটিলতা, সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনীহা, কিংবা অদ্ভূত সব অভ্যাস আর জিনিসের প্রতি আকর্ষণ সবই এই ডিসঅর্ডারের অন্তর্ভুক্ত। অতি দুঃখের বিষয় যে, অটিজম পুরোপুরি নিরাময় করা আজ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। কিন্তু সঠিক টেস্ট, চিকিৎসা, থেরাপি এবং কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে শিশুদের ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ আচরণ স্বাভাবিক গণ্ডির মধ্যে নিয়ে আসা সম্ভব। বর্তমানে দেশের অনেক শিশুই অটিস্টিক হওয়া সত্ত্বেও স্বাভাবিক জীবনের সাথে মানিয়ে চলতে সক্ষম হচ্ছে। এই জন্য সবচেয়ে বেশি সাহায্য করতে পারে নিউরোজেন। বর্তমানে আমাদের দেশে থেরাপিস্ট, জেনেটিক এক্সপার্ট এবং কাউন্সিলরা অটিস্টিক শিশুদের সুচিকিৎসা দিতে বেশ আন্তরিক। অটিস্টিক শিশু হয়তো অন্য সকল সাধারণ শিশুর মতো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আচরণ করতে পারবে না। কিন্তু, সাইকোথেরাপি বা স্পেশাল শিক্ষাদানের মাধ্যমে এসব শিশুদের বেশির ভাগই সুস্থ করে তোলা সম্ভব।

দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসা আর সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব এই সমস্যাটিকে খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। অটিস্টিক শিশুর প্রথম চিকিৎসা হলো তার সমস্যাটি খুঁজে বের করা। অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের জটিলতাগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে অকুপেশনাল থেরাপি খুবই কার্যকরী। এই থেরাপিতে শিশুর খাবার গ্রহণ করার সময় ঠিকমতো চামচ ধরা, জামার বোতাম আটকানো থেকে শুরু করে স্কুলের কাজ, খেলাধুলাসহ যাবতীয় বিষয় সমন্ধে শেখানো হয়। উদ্দেশ্য হচ্ছে শিশুরা নিজেরাই যেন নিজের ন্যূনতম প্রয়োজনটুকু মেটাতে পারে। এই থেরাপি শিশুদের সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এই ক্ষেত্রে শিশুদের সাংকেতিক ভাষা বা ছবির মাধ্যমে কথা বলা শেখানো হয়। চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা অর্থাৎ আই কন্টাক্টের ব্যাপারটিও এই থেরাপির মাধ্যমে শেখানো হয়ে থাকে। অ্যাপাইড বিহেভিয়ার এনালাইসিস- এই থেরাপিতে অটিস্টিক শিশুদের বিভিন্ন কাজের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে এবং কাজটি কয়েকটি ধাপে শেষ করার জন্য শিশুদেরকে উদ্বুদ্ধ করা হয়। ঠিকমতো কাজটি শেষ করতে পারলে শিশুকে পুরস্কার দেয়া হয়। এই পদ্ধতিতে অটিস্টিক শিশুদের মানসিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে কিনা সেই বিষয়েও লক্ষ রাখা হয়। এই থেরাপির কয়েকটি পদ্ধতি আছে। যেমন- ডিসক্রিট ট্রায়াল ট্রেনিং। এই পদ্ধতিতে অটিস্টিক শিশুদের জন্য বড় কাজগুলোকে ছোট কয়েকটি ধাপে ভাগ করে দেয়া হয়। তাছাড়া আর্লি ইন্টেনসিভ বিহেভিওরাল ইন্টারভেনশন পদ্ধতি- ৫ বছরের কম বয়সী অটিস্টিক শিশুদের মানসিক উন্নতির জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। পিভোটাল রেসপন্স ট্রেনিং এই পদ্ধতিতে শিশুদেরকে নতুন জিনিস শিখতে আগ্রহী করে গড়ে তোলা হয়। নিজের নিয়ন্ত্রণ অটিস্টিক শিশু যাতে নিজেই করতে পারে সেই বিষয়ে এখানে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে। এই পদ্ধতিতে থেরাপির ফলে অটিস্টিক শিশু সামাজিকভাবে তার যোগাযোগের উপায়গুলোকে আরও উন্নত করতে পারে। যেমন- সমবয়সীদের সাথে মিশতে পারা, ডাক দিলে সাড়া দেয়া ইত্যাদি। ভার্বাল বিহেভিওর ইন্টারভেনশন- অটিস্টিক শিশুদের ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরোডিসঅর্ডার অ্যান্ড অটিজম (ইপনা)-এর উদ্যোগে দেশব্যাপী অটিজমের ব্যাপারে যে জরিপকার্য পরিচালিত হয়েছে তাতে দেখা যায়, বাংলাদেশে ১৬ থেকে ৩০ মাস বয়সী শিশুদের মাঝে অটিজম বিস্তারের হার প্রতি ১০ হাজারে ১৭ জন। দেশে যেই হারে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা বাড়ছে সেই অনুপাতে অটিস্টিক শিশুদেও শিক্ষাদানের জন্য স্কুলের সংখ্যা বাড়ছে না। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে পড়ছে। অটিস্টিক শিশুদের জন্য কিছু সংখ্যক বিশেষায়িত স্কুল আছে, সেখানে তাদের বিশেষভাবে পাঠদান করা হয়। এ ধরনের স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে কোন ধরনের শিশুর জন্য কোন ধরনের স্কুল উপযোগী একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্টের তা বলে দিবেন। অনেক সময় এরকম ক্ষেত্রে চিকিৎসক শিশুটিকে ঔষধ দিতে পারেন অথবা নিবিড় পরিচর্যা, স্কুলভিত্তিক প্রশিক্ষণ, সঠিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের মাধ্যমে শিশুদের অটিজম-সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বর্তমান সরকার অটিজম শিশুদের যথাযথ সহায়তা প্রদানে উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে অটিস্টিক শিশুদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও বিশেষায়িত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেমন, সুইড বাংলাদেশ পরিচালিত বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন পরিচালিত ইনক্লুসিভ বিদ্যালয়, তরি ফাউন্ডেশন পরিচালিত স্কুল ফর গিফটেড চিলড্রেন; প্রয়াস পরিচালিত অটিস্টিক শিশুদের বিদ্যালয় যেখানে জাতীয় পাঠ্যক্রম অনুযায়ী প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাশাপাশি অটিস্টিক শিশুদের জন্য ব্রিটিশ পাঠ্যসূচি অনুযায়ী ইনক্লুসিভ ইংরেজি মাধ্যম ও কারিগরি ও ভকেশনাল শিক্ষাও চালু রয়েছে; ঢাকার খিলগাঁয়ে রয়েছে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়; গুলশানে রয়েছে রেইনবো অটিজম কেয়ার ফাউন্ডেশন; বারিধারায় শিশুদের সার্বিক বিকাশের জন্য রয়েছে ইউনিক গিফট ফাউন্ডেশন; বাংলাদেশ ডাউন সিন্ড্রোম অ্যাসোসিয়েশন; অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন; সূচনা ফাউন্ডেশন ইত্যাদি। অটিস্টিক শিশুদের দৈনন্দিন জীবনে সাহায্য করার জন্য ‘অটিজম বার্তা’ নামক একটি অ্যাপ রয়েছে, যেটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে অটিস্টিক শিশুদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা ও পরবর্তী সময়ে বাবা-মাকে করণীয় সম্পর্কে অবগত করা, সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা ইত্যাদি।

সারা পৃথিবীতে বেড়ে চলেছে অটিজম, কিন্তু এ বিষয়ে মানুষের সচেতনতা এখনো অনেক কম। অটিজমসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অটিস্টিক শিশুদের বিভিন্ন সেবা- সম্বলিত গ্লোবাল অটিজম কর্তৃক তৈরিকৃত পোস্টার, বুকলেট, প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক কার্যক্রম সম্পর্কিত বিলবোর্ড; অটিস্টিক শিশুদের বিভিন্ন সেবা-সম্বলিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রামাণ্য চিত্র তৈরি ও প্রদর্শনী, প্রভৃতি সেবা প্রদান করা হয়।

শিক্ষা এবং কর্মসংস্থান হলো উন্নয়নের চাবিকাঠি। ২০৩০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা হল ‘কাউকেই পেছনে ফেলে না রাখা’ অর্জনের চ্যালেঞ্জ অনুধাবনে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিদের সমান অংশগ্রহণ ও কার্যকর সংশ্লিষ্টতা অপরিহার্য। অটিজমে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির মাধ্যমে তাদেরকে সমাজের সাথে একত্র করা আবশ্যক। সুতরাং ‘সহায়ক প্রযুক্তির ব্যবহার, অটিজম সম্পন্ন ব্যক্তির অধিকার’- এই শ্লোগান ধরে সমতা, ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তি- এইসব মূল্যবোধ এবং অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পূর্ণ অংশগ্রহণ এবং তাঁদের অধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতাসমূহের অনুশীলনের প্রয়োজনীয় উপকরণগুলোর নিশ্চয়তার লক্ষ্যে আসুন আমাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করি।

লেখক : প্রফেসর ড. মো. লোকমান হোসেন, পরিচালক (প্রশিক্ষণ ও বাস্তবায়ন), জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম), শিক্ষা মন্ত্রণালয়।




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
করোনায় ৩০ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ২ হাজার ৬৮৬ - dainik shiksha করোনায় ৩০ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ২ হাজার ৬৮৬ আশ্রয়কেন্দ্র হিসাবে বন্যা দুর্গত এলাকায় স্কুল-কলেজ খুলে দেয়ার নির্দেশ - dainik shiksha আশ্রয়কেন্দ্র হিসাবে বন্যা দুর্গত এলাকায় স্কুল-কলেজ খুলে দেয়ার নির্দেশ তিন শিক্ষকের ডাবল এমপিও : দৈনিক শিক্ষায় প্রতিবেদন প্রকাশের পর অধ্যক্ষকে শোকজ - dainik shiksha তিন শিক্ষকের ডাবল এমপিও : দৈনিক শিক্ষায় প্রতিবেদন প্রকাশের পর অধ্যক্ষকে শোকজ দৈনিক শিক্ষায় প্রতিবেদন প্রকাশের পর : তথ্য গোপন করে নেয়া অনুদানের টাকা ফেরত - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় প্রতিবেদন প্রকাশের পর : তথ্য গোপন করে নেয়া অনুদানের টাকা ফেরত শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ইন্টারনেট : সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি মোবাইল অপারেটররা - dainik shiksha শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ইন্টারনেট : সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি মোবাইল অপারেটররা জটিলতার দ্রুত সমাধান চান এমপিওবঞ্চিত শিক্ষকরা - dainik shiksha জটিলতার দ্রুত সমাধান চান এমপিওবঞ্চিত শিক্ষকরা প্রভাষকের বিরুদ্ধে ভুয়া সনদে চাকরির অভিযোগ - dainik shiksha প্রভাষকের বিরুদ্ধে ভুয়া সনদে চাকরির অভিযোগ স্কুলছাত্রের মৃত্যুতে পরোক্ষ দায়ী সেই যুগ্মসচিব নৌঅধিদপ্তরের মহাপরিচালক - dainik shiksha স্কুলছাত্রের মৃত্যুতে পরোক্ষ দায়ী সেই যুগ্মসচিব নৌঅধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ হতে পারছেন না প্রভাষকরা: রুলের জবাব দেয়নি সরকার - dainik shiksha অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ হতে পারছেন না প্রভাষকরা: রুলের জবাব দেয়নি সরকার শিক্ষায় বঙ্গবন্ধুর অবদান নিয়ে লেখা আহ্বান - dainik shiksha শিক্ষায় বঙ্গবন্ধুর অবদান নিয়ে লেখা আহ্বান বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল কনটেন্ট দিচ্ছে টিউটর্সইঙ্ক - dainik shiksha বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল কনটেন্ট দিচ্ছে টিউটর্সইঙ্ক শিক্ষকদের ফ্রি অনলাইন প্রশিক্ষণ চলছে - dainik shiksha শিক্ষকদের ফ্রি অনলাইন প্রশিক্ষণ চলছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website