অদম্য স্বপ্ন যেন ভেঙে না যায় - মতামত - Dainikshiksha


এইচএসসির ফলঅদম্য স্বপ্ন যেন ভেঙে না যায়

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান |

যশোরের মনিরামপুর উপজেলার হানুয়ার গ্রামের হতদরিদ্র তপন সাধু ও বাসনা সাধুর বড় সন্তান, রাজগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী শ্রাবন্তী মানবিক বিভাগে জিপিএ ৫ পেয়েছে। বাবার একমাত্র আয়ের উৎস রাজগঞ্জ বাজারের ফুটপাতে একটি চায়ের দোকান। জমিজমা বলতে দেড় শতকের ভিটেবাড়ি। টানাটানির সংসারে টিউশনি করে নিজের লেখাপড়ার খরচ কিছুটা পুষিয়ে নিত শ্রাবন্তী। কখনও মা বাসনা সাধু অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। ফল দেখে বড় লজ্জা পেয়েছেন শ্রাবন্তীর বাবা-মা। কারণ অভাব আর টানাটানির সংসারে শ্রাবন্তীকে পড়ালেখার খরচ, ভালো পোশাক, দু'বেলা দু'মুঠো খাবার সময়মতো দিতে পারেননি তারা। এ ফলে খুশি হলেও উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছে শ্রাবন্তী (২২ জুলাই ২০১৮, সংবাদ)।

দুই. অন্যের পুরনো বই ধার করে, বিদ্যুৎহীন বাড়িতে দিনের বেলা পড়ে কাকলী এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার মধ্যে একমাত্র জিপিএ ৫ পেয়েছে। পদ্মার ভাঙনে নিঃস্ব কাকলীর সাত সদস্যের দরিদ্র পরিবারের বসবাস উপজেলার পাচ্চর এলাকায় একচালার জরাজীর্ণ টিনের একটি খুপরি ঘরে। মা তাসলিমা বেগম গৃহিণী আর বাবা দিনমজুর হারুন মাদবর অন্যের জমিতে কাজ করে কোনো রকমে সংসার চালান। খাতা ফুরিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় সে পড়ত বেশি, লিখত কম। যাতায়াত ভাড়া থাকত না অনেক সময়। খরচ চালাতে প্রাইভেট পড়াত কাকলী। দিনমজুর হারুন মাদবর টাকা না থাকায় মিষ্টি কিনতে পারেননি বলে শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে মসজিদে মিলাদের যে একটি জিলাপি পেয়েছিলেন, তা দিয়েই মিষ্টিমুখ করিয়েছেন আদরের মেয়েকে (২০ জুলাই ২০১৮, বার্তা বাজার.কম)। নদীভাঙনে নিঃস্ব কাকলী ভর্তির জন্য প্রস্তুতিও নিতে পারেনি। 

তিন. কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের মাজিহাট এলাকার গরিব বর্গাচাষি আজিজ হোসেন ও গৃহিণী নাসিমা খাতুনের ছেলে নাজমুল হক হালসা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছে। লেখাপড়ার খরচ চালাতে গিয়ে প্রাইভেট পড়ানোর পাশাপাশি মাঠে বাবার সঙ্গে দিনমজুরের কাজ করেছে সে। বাড়িতে অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া প্রতিবন্ধী এক বোন আছে। নিদারুণ অভাবের কারণে উচ্চশিক্ষা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে সে ও তার পরিবার (২০ জুলাই ২০১৮, বাংলানিউজ২৪.কম)।

চার. রাজশাহীর বাঘা উপজেলার মর্শিদপুর গ্রামের ভ্যানচালক শাহাদত ও গৃহিণী নরজিমা বেগমের বড় মেয়ে শাকিলা মহিলা বাণিজ্যিক অ্যান্ড ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট থেকে বাণিজ্য বিভাগে (ট্রেড ব্যাংকিং) জিপিএ ৫ পেয়েছে। বাবা-মায়ের রোজগারে কোনো রকমে ৫ সদস্যের চলা সংসারে তিন বোন পড়ালেখা করেও শাকিলার এই অর্জন। বাঘা উপজেলার শাহদৌলা কলেজ থেকে এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ ৫ পেয়েছে আশরাফপুর গ্রামের শিখা, দেবত্তবিনোদপুর গ্রামের সোহাগ ও মনিগ্রাম দক্ষিণপাড়ার তুহিন। আরজেদ আলী ও মনোয়ারা বেগমের হতদরিদ্র সাত সদস্যের পরিবারের ঠিকমতো খেতে না পাওয়া শিখা দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করেও দীপশিখা হয়ে জ্বলে উঠেছে আপন আলোয়। দেবত্তবিনোদপুর গ্রামের ভিটাবাড়িহীন দিনমজুর পিতা আকরাম আলী আর মা চায়না বেগমের গরু-ছাগল পালন, বাবার সঙ্গে কাজ করে ও টিউশনি করে পড়ালেখার খরচ জোগাড় করে সোহাগ পড়ালেখা চালিয়ে অর্জন করেছে এই ফল। আর কাজ করতে না পারা মানসিক রোগী আলম সরকার ও গৃহিণী লতিফা বেগমের বড় ছেলে তুহিন। তার মা ৫ সদস্যের সংসার পরিচালনা করেন হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালন করে। পড়ালেখার খরচ জোগাতে টিউশনি করত তুহিন (২১ জুলাই ২০১৮, এফএনএস২৪.কম)। 

এরই মধ্যে পত্রিকায় এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হওয়ার সপ্তাহখানেকের মাথায় দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য আলাদা তারিখ নির্ধারণ করে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের সংগঠন 'বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ'। অথচ ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ সন্ধ্যায় মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে উপাচার্যদের বৈঠকে ভর্তিকালীন দুর্ভোগ কমাতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত হওয়ায় গাইড লাইন তৈরি করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে আহ্বায়ক করে ৯ সদস্যের আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়। দুই কমিটি সমন্বয় করে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার নীতিমালা সংক্রান্ত ধারণাপত্র ১৫ এপ্রিলের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার কথা ছিল। বড় দুঃখের বিষয় হলো, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই- পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও এ ব্যাপারে দৃশ্যত এত দ্রুত বৈঠক কিংবা কোনো প্রকার সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যায়নি। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, ইউজিসি একাধিকবার বলা সত্ত্বেও বিষয়টি আলোর মুখ দেখল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী শিক্ষক হিসেবে সমাজ, রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি এই আমাদের দায়বদ্ধতা? 

এভাবে 'গোল্লাছুট' ধরনের তারিখ নির্ধারণ না করে- ১. অঞ্চল বা বিভাগ অনুযায়ী এবং ওই বিভাগের মধ্যে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দূরত্ব বিবেচনা করে তারিখ নির্ধারণ করলে শিক্ষার্থীরা এক ভ্রমণে এক এলাকার সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পরপর পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারত; ২. ভর্তি ফরমের মূল্য যেন একই হয়, অনেক বেশি না হয়, সহনীয় হয়; ৩. কীভাবে ভর্তি পরীক্ষা শিক্ষার্থীবান্ধব করা যায়; ৪. পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারছে না কিংবা প্রবেশপত্র পাচ্ছে না, এমন শিক্ষার্থী যেন কোনোভাবেই আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন না হয়, এসব ব্যাপারে আলোচনা হতে পারত। এটা করতে পারলে কিছুটা হলেও আমাদের আন্তরিকতা ও মানবিকতাবোধ প্রকাশ পেত। যারা পত্রিকা বা টক শোতে কোচিং সেন্টারকে ধুয়ে দেন, তারাই এ ধরনের নিয়ম তৈরি ও টিকিয়ে রাখার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে কোচিং বাণিজ্যকে উৎসাহিত করেন! অদ্ভুত! 

ফল প্রকাশের পর থেকেই ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৮০১ জন শিক্ষার্থী এবং তাদের ১৭ লাখ ১৭ হাজার ৬০২ জন অভিভাবক মিলে মোট ২৫ লাখ ৭৬ হাজার ৪০৩ জন মানুষ নিদারুণ যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। একদিকে হাজার হাজার টাকা ও সারা বাংলাদেশ ছুটে বেড়ানোর চিন্তা, অন্যদিকে অর্থ-বিত্তহীন পরিবার হলেও সন্তানের সামনে সম্মান রক্ষা করার মানসিক কষ্ট ও হাহাকার অভিভাবকদের অসহনীয় এক বেদনার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। কারণ এক বৈঠকে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা ভর্তি পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করতে পারলেও মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও আচার্যের আমন্ত্রণে বঙ্গভবনে আলোচনার পরও হাজার হাজার দরিদ্র ও অসহায় মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট এবং লাখ লাখ শিক্ষার্থীর হয়রানি বিবেচনা করে মাসের পর মাস (ফেব্রুয়ারি-জুলাই) ধরে দৃশ্যত কিছুই করতে পারিনি আমরা। 

এটা প্রশংসনীয় যে, কাকলীর দায়িত্ব নিয়েছেন স্থানীয় সাংসদ ও র‌্যাবের ডিজি। বাকি হাজার হাজার অদম্য শ্রাবন্তী, শিখা কিংবা নাজমুলের কী হবে? কে বা কারা দাঁড়াবে তাদের পাশে? শত কষ্টের মধ্যেও পড়ালেখার প্রতি যে অদম্য ইচ্ছাশক্তি দমাতে পারেনি তাদের, সেই ইচ্ছাশক্তির কাছে অসহায় হয়ে, ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করে নীরবে-নিভৃতে ডুকরে কাঁদছে তারা। নিম্নমধ্যবিত্ত, ভূমিহীন কৃষক, মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করা মা, দিনমজুর, রিকশাচালক, জেলে, কুমার, কামার, সমুদ্র উপকূলবর্তী, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ও আদিবাসী, শ্রমজীবী মানুষের সন্তানদের কী হবে? কোথায় পাবেন তারা এত ফরম কেনার টাকা? 

মহামান্য রাষ্ট্রপতির অভিপ্রায় মানে অলিখিত আইন, যা অখণ্ডনীয় বলে প্রতীয়মান হওয়াই কাম্য ছিল। গোটা ব্রিটেন পরিচালিত হয় অলিখিত সংবিধান দ্বারা (যদিও শাসন ব্যবস্থা সংক্রান্ত কিছু বিধান লিখিত, যেমন ম্যাগনা কার্টা, বিল অব রাইটস ইত্যাদি)। সেখানে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মিলিয়ে লাখ লাখ মানুষের সঙ্গে আমরা ছিনিমিনি খেললাম। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আবার নাজেহাল হওয়ার বন্দোবস্ত করে দিলাম। ইতিহাস ক্ষমা করবে কি আমাদের? সবার পক্ষে ইতিহাস রচনা করা কিংবা ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া সম্ভব হয় না বলেই বহুবার আলোচনা সত্ত্বেও দেখি দেখি করে আলোর মুখ দেখছে না সমন্বিত বা গুচ্ছ পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষা। 

২০১৮ সালে ১০টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১৩ লাখ ১১ হাজার ৪৫৭ পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। কৃতকার্য হয়েছে ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৮০১ জন। কৃতকার্য হতে পারেনি ৪ লাখ ৫২ হাজার ৬৫৬ জন। ফল পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ আছে। খুব বেশি মন খারাপ করার কিছু নেই শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের। কৃতকার্য শিক্ষার্থীদের চলার পথ হয়তো মসৃণ হলো; কিন্তু যারা কৃতকার্য হতে পারেনি তারা হিমালয়সম পথ পাড়ি দেওয়ার মতো শক্তি অর্জন করল। সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে অকৃতকার্যরাই সবচেয়ে বেশি সফল হয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসে। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত হবে সোনার বাংলা। কেটে যাবে সব অমানিশা। দুঃখ-কষ্ট, অকৃতকার্যতা আছে বলেই জীবন এত সুন্দর। পরিশেষে অদম্য শিক্ষার্থীদের বলতে চাই, তোমরা হলে অমাবস্যার রাতে পথিককে পথ দেখানো জোনাকি। ঘরের ফুটো চাল দিয়ে সূর্য, চাঁদ আর তারার আলো দেখার এমন সৌভাগ্য ক'জনার হয় বলো! আর তাই শত দুঃখ-কষ্টের মাঝে সুখের নীল জল দিগন্ত ছোঁয়ার জন্য দু'চোখ মেলে অদম্য স্বপ্ন দেখতে হবে তোমাদের। 


লেখক: পিএইচডি গবেষক, জেঝিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন এবং শিক্ষক (শিক্ষা ছুটি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগ বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ

সূত্র: সমকাল




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
নভেম্বরের এমপিওর সাথেই ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেয়া হতে পারে - dainik shiksha নভেম্বরের এমপিওর সাথেই ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেয়া হতে পারে এমপিও বাতিল হচ্ছে ১২ শিক্ষক-কর্মচারীর - dainik shiksha এমপিও বাতিল হচ্ছে ১২ শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিওভুক্ত হচ্ছেন কারিগরির ২২৮ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন কারিগরির ২২৮ শিক্ষক বেসরকারি স্কুলে ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ - dainik shiksha বেসরকারি স্কুলে ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ স্ত্রীর মৃত্যুতে আজীবন পেনশন পাবেন স্বামী - dainik shiksha স্ত্রীর মৃত্যুতে আজীবন পেনশন পাবেন স্বামী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website