অসম্মান আর গ্লানি ভুলে দাঁড়াতে চাই - মতামত - দৈনিকশিক্ষা


অসম্মান আর গ্লানি ভুলে দাঁড়াতে চাই

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

দেশবাসী দীর্ঘ প্রায় তিন মাস যাবৎ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ধরনের অশ্বস্তিকর পরিস্থিতি লক্ষ করছেন। এই অশ্বস্তি এমন যে, কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আন্দোলনের নামে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবনগুলোর প্রধান ফটকে ‘তালা’ ঝুলিয়ে বসে থাকছেন। এতে একটি বড় অংশের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ক্লাস পরীক্ষা নিতে গিয়ে বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হতে হচ্ছিল। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি বিভাজন দেখা দিলেও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে কোনো বিভেদ-বিভাজন অন্যান্য বারের মতো এবারের উপাচার্য বিরোধী আন্দোলনে দেখা যায়নি। বরং কর্মকর্তা ও কর্মচারী সমিতি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান উন্নয়ন ও প্রশাসনের পক্ষে অবস্থান নিলেও কাজে যোগদানের জন্য স্ব-স্ব অফিসে প্রবেশ করতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছিলেন। এই বাধা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অতিক্রম অসম্ভব কিছু ছিল না। রোববার (১৭ নভেম্বর) ভোরের কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে  এ তথ্য জানা যায়। 

কিন্তু আন্দোলনের বাইরে বৃহত্তর অংশে থাকা শিক্ষক-শিক্ষার্থী কিংবা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কেবল আন্দোলনের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শনের জন্যই শক্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থেকেছেন। অধিকংশ ভবনে ক্লাস পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও প্রশাসনিক ভবনে ‘তালা’ ঝুলিয়ে দেয়ার ফলে প্রবেশ করতে পারেননি উপাচার্যসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী। দেখা গেছে ক্লাসের জন্য কখনো ভবনের প্রধান ফটকের তালা খুলে ফেলার পর উল্লাস করে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ঢুকেছে। ক্লাস ও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে তালা খোলা নিয়ে বাকবিতণ্ডায় এক ধরনের অশ্বস্তি ও উত্তেজনা সবার মধ্যেই কাজ করত। তখন মনে পড়ত আমাদের ছাত্রাবস্থায় দেখা আন্দোলন, সংগ্রাম কিংবা ধর্মঘট থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান আন্দোলন একেবারেই ভিন্ন। তখন দেখেছি কোনো আন্দোলন বা ধর্মঘটের ডাক এলে কোনো শিক্ষার্থী আর একাডেমিক ভবনমুখী হতো না- আন্দোলনের পক্ষে মিটিং মিছিলে সরব থাকত। অর্থাৎ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন থাকত বৃহত্তর অংশের শিক্ষার্থীদের। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীর সেই সমর্থনের তীব্র অভাব। তাই জোর-জবরদস্তি করে আন্দোলন চলছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। আন্দোলনটি চলমান আছে বিগত প্রায় তিন মাস ধরে। যা দেশবাসীকে অশ্বস্তিতে ফেলেছে।

চলমান আন্দোলনে জোর-জবরদস্তির একটি নমুনা হলো আন্দোলনকারী শিক্ষকরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযোগ দাখিল করে আচার্যের দপ্তর থেকে তার কোনোরূপ উত্তরের অপেক্ষা না করেই আন্দোলন চলমান রাখলেন। ক্লাস ও পরীক্ষাসহ প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার চেষ্টায় মারিয়া হয়ে উঠলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই আন্দোলনকারীদের ‘তালা-সংস্কৃতি’র কারণে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অক্টোবর মাসের বেতনভাতা প্রাপ্তিতে বিলম্বও ঘটেছিল। আর আগের সব নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ‘প্রশাসনিক’ আদেশে এবার শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বেতন পরিশোধ করতে হয়েছে।

আবার রাষ্ট্রপতি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যকে চিঠি দিয়ে অভিযোগ জানানোই নয়, এরপর শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গেও আন্দোলনকারী শিক্ষকরা আলোচনায় বসেন। আলোচনাকালে শিক্ষামন্ত্রী আন্দোলনকারীদের কাছে ৭ নভেম্বরের মধ্যে তথ্যপ্রমাণসহ উপাচার্যের দুর্নীতি বিষয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিতে বলেন। কিন্তু তা না করে আন্দোলনকারী শিক্ষকরা ছাত্রদের নিয়ে বিভিন্ন ভবনে তালা লাগিয়ে দিয়ে সমস্ত কিছু স্থবির করে দিলেন! শিক্ষা উপমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন জাহাঙ্গীরনগর থেকে ঢাকার দূরত্ব এক-দেড় ঘণ্টা হলেও যথাযথভাবে অভিযোগপত্র জমা না দিয়ে উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করার মধ্যে ভিন্ন ষড়যন্ত্র থাকতেই পারে। জাহাঙ্গীরনগর নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে নানা দিক থেকেই। আন্দোলনকারীদের এমন কর্মকাণ্ড যে কোনো বিচারে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের পরিপন্থী। উপরন্তু, সংকট নিরসনে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা চলমান থাকার মধ্যেই আন্দোলনকারীরা হারমোনিয়ম-তবলা, ঢোল-খোল, মাইক ও বিভিন্ন রকমের সাজসজ্জা ধারণ করে উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করে ফেলেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি অশ্বস্তি বিরাজ করছে। অশ্বস্তির শুরু ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে। অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর দ্বিতীয় মেয়াদে আবারো চার বছরের জন্য উপাচার্যের দায়িত্ব অর্পণ করেন। কিন্তু উপাচার্য হওয়ার আগ্রহীদের রাষ্ট্রপতি ও আচার্যের এ আদেশ সংক্ষুব্ধ করে তুলে। আমাদের অশ্বস্তি আরো বেড়ে যায় মহামান্যের সেই আদেশের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে একাধিক শিক্ষকের উচ্চ আদালতে রিট মামলা দায়ের করায়। বলাবাহুল্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের বিধান মেনেই রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর এই নিয়োগদান সম্পন্ন করেছিলেন। এতে ন্যায্যতার কোনো বিধি লঙ্ঘিত হয়নি বলেই সাধারণ শিক্ষক হিসেবে আমাদের মনে হয়েছে। কারণ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের বিধানের ১১ (১) সংবিধি রাষ্ট্রপতিকে সে ক্ষমতা ন্যস্ত করেই রেখেছে।

উপাচার্য হতে আগ্রহীদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের বিধান কীভাবে তুচ্ছ হয়ে গেল জানি না। শুরু হয় ‘উপাচার্য’ শব্দটির আগে বিভিন্ন রকমের হীন বিশ্লেষণের প্রয়োগ। একই সঙ্গে উপচার্যসহ প্রশাসনিক সব কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা এবং অসহযোগিতা। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকতর উন্নয়নের জন্য একনেক থেকে দেড় হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন লাভ করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর অংশীজনের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়! শুরু হয় নতুন সংকট। এই সংকটকে আরো ঘনীভূত করে তুলে কিছু গণমাধ্যমের দায়িত্বহীন আচরণ। টেলিভিশনে প্রচারিত টকশোগুলোও এই আন্দোলনকে বেগবান করেছে সন্দেহ নেই। মধ্যরাতে টেলিভিশন আলোচনায় ড. ফারজানাকে ‘অবৈধ উপাচার্য’ আখ্যা দেয়ায় আলোচকরা ঘাম ঝরিয়েছেন। ড. ফারজানা ইসলাম সিনেটের সর্বোচ্চ ভোটে প্যানেলে নির্বাচিত এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশে মহামান্য রাষ্ট্রপতি তাকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। তাৎক্ষণিক বাহবা কিংবা আন্দোলনকে উসকে দেয়ার জন্য এসব বক্তব্য জনপ্রিয়তা লাভ করে ঠিকই কিন্তু দায়িত্বজ্ঞানহীন এসব বক্তব্য একজন মানুষের জীবনে কত বড় ক্ষত হয়ে থাকে তা তারও জানবার কথা। আসলে এখানকার সমস্যা অন্যত্র।

অপরদিকে, আর ড. ফারজানাকে বারবার বলতে শুনেছি শুধু অভিযোগ নয়- যদি প্রমাণিত হয় এখানে দুর্নীতি হয়েছে তবে তিনি নিজেই পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন। আমরাও বিশ্বাস করি যে, শুধু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যই নয়- যে কোনো দায়িত্বশীল পদে আসীন ব্যক্তির বিরুদ্ধে যে কেউ যে কোনো সময় যে কোনো অভিযোগ উত্থাপন করতে পারেন। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে সাফল্যময় সমস্ত জীবনের শেষে ‘কলঙ্ক চিহ্ন’ নিয়ে তাকে বিদায় নিতে হবে তা কোনোরূপ দায়িত্ব-কাঠামোর মধ্যেই পড়ে না। অপরাধী প্রমাণিত হলে শাস্তির ব্যবস্থা তো আছেই। ড. ফারজানাও বলেছেন, অপরাধ প্রমাণের পর তাকে যে শাস্তি দেয়া হবে তা তিনি মেনে নেবেন। প্রকৃত দুর্নীতি প্রমাণের চেয়ে তাহলে কি ‘উপাচার্য উৎখাত’ই রহস্যময় ইস্যু? অভিযোগ প্রমাণের আগে আন্দোলনের নামে জোর-জবরদস্তিই বরং অপরাধ।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের অনুুরোধ, পদ্মাসেতুর কথিত দুর্নীতির গল্প শেষ পর্যন্ত বিশ্বসেরা ‘রসময়’ গল্পে পরিণত হয়েছে। খোঁজ নিলে নিশ্চিত দেখা যাবে পদ্মাসেতুর দুর্নীতি-গল্পের যারা স্রষ্টা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কথিত দুর্নীতি-গল্পের পশ্চাতেও সেইসব কারিগরের কারো কারো কারসাজি থাকা অসম্ভব কিছু নয়। দেশবাসীর স্বপ্নের পদ্মাসেতু আপনি নির্মাণ করছেন- জাহাঙ্গীরনগর আমাদের স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়কেও আপনি পদ্মাসেতুর মতো নির্মাণ করুন। সব অসম্মান আর গ্লানি ভুলে আমরা সোজা হয়ে দাঁড়াই।
 
লেখক: আহমেদ আমিনুল ইসলাম, অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
করোনায় আরও ৩৮ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৪ হাজার ১৯ - dainik shiksha করোনায় আরও ৩৮ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৪ হাজার ১৯ পিটিআই ইন্সট্রাক্টরদের পদোন্নতির সুযোগ বাড়ল - dainik shiksha পিটিআই ইন্সট্রাক্টরদের পদোন্নতির সুযোগ বাড়ল প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন ৮ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু - dainik shiksha প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন ৮ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু পলিটেকনিকে ভর্তিতে বয়সসীমা থাকছে না - dainik shiksha পলিটেকনিকে ভর্তিতে বয়সসীমা থাকছে না সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ পদের আবেদন শুরু - dainik shiksha সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ পদের আবেদন শুরু অ্যাডহক নিয়োগ পেলেন ৩৭ শিক্ষক - dainik shiksha অ্যাডহক নিয়োগ পেলেন ৩৭ শিক্ষক চলতি মাসেই মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষকদের বকেয়াসহ এমপিওর টাকা ছাড় - dainik shiksha চলতি মাসেই মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষকদের বকেয়াসহ এমপিওর টাকা ছাড় বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল কনটেন্ট দিচ্ছে টিউটর্সইঙ্ক - dainik shiksha বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল কনটেন্ট দিচ্ছে টিউটর্সইঙ্ক শিক্ষকদের ফ্রি অনলাইন প্রশিক্ষণ চলছে - dainik shiksha শিক্ষকদের ফ্রি অনলাইন প্রশিক্ষণ চলছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website