আদর্শ বাবাই সন্তানের বন্ধু ও পথপ্রদর্শক - বিবিধ - দৈনিকশিক্ষা


আদর্শ বাবাই সন্তানের বন্ধু ও পথপ্রদর্শক

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

বাবা দিবস প্রত্যেক সন্তানের কাছে একটি মহিমান্বিত দিন। যদিও মায়ের প্রতি ভালোবাসাটা বেশি সোচ্চার, বেশি আলোচিত, কিন্তু বাবার প্রতি নিভৃতে থাকা ভালোবাসার কথা তত বেশি উচ্চারিত না হলেও এর গভীরতা ও বিশালতাকে আমরা সব মনপ্রাণ দিয়ে অনুভব করি। আমাদের অনুভবে এ এক প্রেরণা ও শক্তি হয়ে থাকে। রোববার (১৬ জুন) কালের কণ্ঠে প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ তথ্য জানা যায়। নিবন্ধটি লিখেছেন দিল মনোয়ারা মনু।

জন্মগ্রহণের পর থেকেই মা-বাবার ভালোবাসা আমাদের রক্তে দোলা দেয়। বুকের গভীরে আনন্দ দেয়, সব কষ্ট, সমস্যায় তাঁদের নিবিড়ভাবে অনুভব করি। আমরা এর মধ্য দিয়ে তখন ঠিকই চিনে নিই তাঁদের দুজনকে। জীবনের জটিলতার মধ্যেও তাঁদের ভালোবাসার গভীরতাকে অনুভব করি। সন্তান নিয়ে মা-বাবার একটি মহত্তর স্বপ্ন থাকে। বাবা স্বপ্ন দেখান, পথ দেখান, নির্দেশনাও দেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো মা অলক্ষে সেই স্বপ্নটা নিজের মধ্যে সযত্নে ধারণ করে সন্তানের মধ্যে পরম মমতায় রোপণ করেন।

একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করছি, বাবা তাঁর দুই সন্তানের সঙ্গে মাঠে খেলা করছেন। একসময় মা লনে এসে বসলেন, বললেন, তুমি কী খেলা করছ, না মাঠের ঘাস উপড়ে ফেলছ। বাবা প্রত্যয়ের সঙ্গে বললেন, আমি ঘাস তুলছি না, সন্তানদের বড় করে তুলছি। প্রকৃতই একজন বাবা তাঁর সন্তানদের সাহসী ও শারীরিক-মানসিক বিকাশে বড় ভূমিকা রাখেন। মনীষী বারবারা কিং সিলভার যথার্থই বলেছেন, সন্তানের বড় হয়ে ওঠার কোনো একটা পর্যায়ে একজন বাবাকে হয়তো মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়তে হয়। কিন্তু সন্তানের বিকাশ থেমে গেলে তা তাঁকে আরো দ্রুত মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে যায়।

আদর্শ বাবার সংজ্ঞা আমার জানা নেই। নিজের জীবন দিয়ে বুঝতে পেরেছি, বাবাদের প্রথম চেষ্টা থাকে সন্তানকে সুশিক্ষিত করে এমনভাবে যাতে তারা সুসভ্য, ভদ্র আচরণ, বড়দের, বিশেষ করে মেয়েদের সম্মান করে। এই চিন্তা আমার মধ্যে এসেছে আমার বাবাকে দেখে। আমার চোখে আমার বাবাই শ্রেষ্ঠ মানুষ। মা-বাবা ছিলেন আমার জীবনের রোল মডেল। সন্তানদের মাথা ছোট হয়, এমন কোনো কাজ তাঁরা কখনোই করতেন না। আমার বাবার ছিল ছেলে-মেয়েদের উদার, প্রগতিশীল শিক্ষায় সুশিক্ষিত করার প্রবল ইচ্ছা। সীমিত সাধ্যের মধ্যেও আমাদের লেখাপড়া শিখিয়েছেন, তা তাঁর ভবিষ্যৎ স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য নয়, তাঁর সাধ ছিল ছেলে-মেয়েরা এমনভাবে শিক্ষিত হবে, যা দেখে তাঁদের গর্ব হবে। তিনি আমাদের দিয়েছেন স্বাধীনতা কিন্তু নিয়ন্ত্রিত। উচ্ছৃঙ্খলতার সার্টিফিকেট নয়। এসব যদি আদর্শ বাবার কাজ হয়, তাহলে আমার বাবাও আদর্শ। এ প্রসঙ্গে আব্রাহাম লিংকনের একটি কথা মনে পড়ছে। তিনি নাকি ছোটবেলায় তাঁর বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি বড় হয়ে কী হব বাবা? কী হবে সেটা তোমার ব্যাপার, কিন্তু তুমি যদি মাটি কাটার শ্রমিক হও, তাহলে তোমার চেয়ে ভালো মাটি কাটার শ্রমিক যেন আর কেউ না হতে পারে।

চীনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, ‘আমার বাবা বলতেন কৃতজ্ঞতা ও ঋণ শোধ করা মানুষের শ্রেষ্ঠ ধর্ম। তুমি যদি অন্যের জন্য ভাবো, তাকে দাও, জীবন তোমাকে পর্যায়ক্রমে তা ফিরিয়ে দেবে। তোমার কথা ভাববে। বাবার এই কথা আমি সারা জীবন মনে রেখেছি, মেনে চলেছি। সত্যি জীবন আমাকে বহুগুণ ফিরিয়ে দিয়েছে। আজ আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেটা জীবনের দান ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি বাবার বিচক্ষণতার কাছে কৃতজ্ঞ।’ এই প্রসঙ্গে ক্যাটরিনা কাইফের সম্প্রতি ফিল্ম ফেয়ার পত্রিকায় একটি সাক্ষাৎকারে দেওয়া কিছু বক্তব্য তুলে ধরছি। ক্যাটরিনা বলেছেন, ছোটবেলা থেকে বাবাকে একেবারে কাছে পাইনি। মা-বাবার বিচ্ছেদ আমার জীবনে একটি বড় প্রভাব ফেলেছে। পিতৃস্থানীয় কেউ পাশে না থাকলে প্রতিটি সময় শূন্যতা আর সংবেদনশীল অনুভূতি হয়। তাই আমি চাই আমার সন্তানরা যেন মা-বাবা দুজনকেই একসঙ্গে পায়। তিনি আরো বলেন, যতবার আমি কোনো সমস্যায় পড়েছি, বাবার মতো কেউ যিনি আমায় শর্তহীনভাবে ভালোবাসতে পারে তেমন কারো অভাব অনুভব করেছি। জীবন দিয়ে বুঝেছি সমস্যার সুরাহা করা অনেক সহজ হয়, যদি তেমন কেউ পাশে থাকেন।

আজকের সমাজের প্রেক্ষাপটে একক মায়েরাও তাদের সন্তানদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন, তবুও কোথায় যেন একটা ফাঁক এবং সন্তানদের মধ্যে একটা হাহাকার অদৃশ্যভাবে থেকে যায়। যে বিষয়টি আমরা ক্যাটরিনার বক্তব্যে উচ্চারিত হতে দেখেছি। এখন দিন বদলেছে, সমাজ বদলেছে, প্রযুক্তির কালো থাবার মধ্যেও সন্তানকে সুসংগত শিক্ষাই শুধু নয়, সামাজিক, মানবিক শিক্ষার আলোকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য মা-বাবা দুজনকেই বিচক্ষণতার সঙ্গে যথার্থ ভূমিকা রেখে চলতে হবে।

পরিবার ও স্কুল দুটিই শিক্ষার মূল কেন্দ্র। ভুলে গেলে চলবে না, শিক্ষা একধরনের সাংস্কৃতিক কাজ। সংস্কৃতির মাধ্যমে শেখানোটাও পরিবার এবং শিক্ষককে রপ্ত করতে হয়। শিশুর জন্য সামাজিকীকরণের জন্য দায়িত্ব নিয়ে স্কুল ও পরিবারের মধ্যে অনুকূল মেলবন্ধন গড়ে তুলতে হবে। তাদের সহজ ভাষায় কঠিন জিনিস পড়ানো, ভালো-মন্দের বোধ গড়ে তোলার চর্চা করতে হবে। এই বোধ জাগ্রত করার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে বাবা ও মায়ের। তার ভেতরে জীবন বোধকে তার মতো করে রোপণ করতে হবে। কঠিন হলেও এই কাজটি দায়িত্ব নিয়ে করা দরকার। বাড়ি এবং স্কুলে এমন পরিবেশই গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিশু-কিশোররা লেখাপড়া নিয়ে, স্কুল নিয়ে ভয় পাবে না। বাড়িতে মা-বাবা ও স্কুলে শিক্ষক তাদের বন্ধু হবে। প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে। আমের মুকুল এবং কোন ফল দেখতে কেমন এবং তার স্বাদ ও উপকারিতা সম্পর্কে জানাতে হবে। একেক গাছের পাতা একেক রকম। খোলা মাঠে, নদীর পারে নিয়ে তাদের আকাশ দেখাতে হবে। আকাশ যে কত বড় এবং উদার ওদের বোঝাতে চেষ্টা করুন। তা হলেই ওরা দেশ, মানুষ, প্রকৃতি, মুক্তিযুদ্ধ এবং দেশের লড়াকু মানুষের সঙ্গে নিজেদের পরিচিত করে সেই আলোকে নিজেদের যথার্থ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে। এই মহান দূরদর্শী কাজটির জন্য মা-বাবা এবং শিক্ষাকেন্দ্র সবার দায়িত্ব সমান। এই বোধ এবং ভালোবাসা শিশু-কিশোরদের সামনে সামাজিক সংকট ও প্রযুক্তির ক্ষতিকর দিকগুলো আসার ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হবে। অভিভাবকরা বাড়িতে শিশুকে সচেতন করার ব্যাপারে আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারলেই পরিবেশ ও প্রকৃতি সম্পর্কে তাদের গভীর প্রণোদনা তৈরি করবে। আমরা জানি শিশুদের জন্মের প্রথম দুই-তিন বছরেই শিশুর ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে। শিক্ষা এবং ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা পরিবার দিতে পারে। তাই অভিভাবকদের উপযুক্ত বই ও চলচ্চিত্র শিক্ষামূলক সেমিনার ও সভার মাধ্যমে নিজেদের অধিকতর সচেতন করতে হবে। তারা চাইলে সব সমস্যার মধ্যেও শিশুকে নিসর্গ সম্পর্কে কিছু ধারণা দিতে পারে। এমনকি টেলিভিশনে শুধু কার্টুন না দেখিয়ে ডিসকভারি বা ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ইত্যাদি চ্যানেলের প্রতি তাদের আগ্রহী করে তুলতে পারেন। যাদের কম্পিউটার আছে, তারা যদি নিসর্গের ওপর তৈরি বিভিন্ন সিডি এনে দিলে শিশুরা বুঝতে পারবে ইট-কাঠের বাইরেও তাদের জন্য একটা মজার পৃথিবী অপেক্ষা করে আছে।

দুঃখের সঙ্গে উল্লেখ করতে হচ্ছে, সুশাসনের অভাবে আমাদের সমাজ আজ প্রশ্নবিদ্ধ। অপরাধপ্রবণতা শুধু নয়, পরিবহনসহ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ বেড়ে গেছে। একবুক শঙ্কা নিয়ে মেয়ের ঘরে ফেরার অপেক্ষা করেন মা-বাবা। মেয়েদের সাহসী ও প্রতিবাদী হওয়ার শিক্ষাটা তাই পরিবারকেই দিতে হবে। আইনের শাসন যথাযথ না হওয়ার কারণে মাদক পাওয়া সহজলভ্য হয়েছে এই বিষয়টিকে সতর্কতার সঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে পরিবারকে। সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব না থাকলে এবং ভালোবাসার পরিমণ্ডল পোক্ত হলে এবং সঠিক শিক্ষা সন্তানকে দিতে পারলেই এই অবস্থা থেকে মুক্ত থাকা যাবে। সন্তানের নিশ্চিত ক্যারিয়ার ও বিপুল রোজগারের পাশ উন্মুক্ত করা শুধু নয়, সবচেয়ে বড় দানস্বত্ব হলো সন্তান আনুষ্ঠানিক সুশিক্ষার পাশাপাশি গভীর দেশপ্রেম ও মানবিক গুণাবলিতে ঋদ্ধ হয়ে বেড়ে উঠছে কি না, শারীরিক ও মানসিক উভয় দিকেই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে পারছে কি না সেটা নিশ্চিত করতে মায়ের পাশাপাশি বাবাকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে, নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
--> ১৭তম শিক্ষক নিবন্ধনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ - dainik shiksha ১৭তম শিক্ষক নিবন্ধনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা আগামী বছর থেকে - dainik shiksha বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা আগামী বছর থেকে সব মাদরাসায় বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা কর্নার স্থাপনের নির্দেশ - dainik shiksha সব মাদরাসায় বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা কর্নার স্থাপনের নির্দেশ এসএসসি পরীক্ষার সময় মোবাইল ব্যাংকিং নজরদারি করবেন গোয়েন্দারা - dainik shiksha এসএসসি পরীক্ষার সময় মোবাইল ব্যাংকিং নজরদারি করবেন গোয়েন্দারা শিক্ষক নিয়োগ : ই-রিকুইজিশনের সময় বাড়ল - dainik shiksha শিক্ষক নিয়োগ : ই-রিকুইজিশনের সময় বাড়ল আইডিয়াল স্কুল নিয়ে অপপ্রচারকারীদের সতর্ক করলেন শিক্ষা উপমন্ত্রী (ভিডিও) - dainik shiksha আইডিয়াল স্কুল নিয়ে অপপ্রচারকারীদের সতর্ক করলেন শিক্ষা উপমন্ত্রী (ভিডিও) এমপিওভুক্ত হলেন ৯৮০ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হলেন ৯৮০ শিক্ষক টাইমস্কেল পেলেন ৩৩ শিক্ষক - dainik shiksha টাইমস্কেল পেলেন ৩৩ শিক্ষক বিএড স্কেল পেলেন ২৫৮ শিক্ষক - dainik shiksha বিএড স্কেল পেলেন ২৫৮ শিক্ষক শিক্ষক নিবন্ধনের হালনাগাদ মেধাতালিকা প্রকাশ - dainik shiksha শিক্ষক নিবন্ধনের হালনাগাদ মেধাতালিকা প্রকাশ এমপিওভুক্ত হচ্ছেন মাদরাসার দুই শতাধিক শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন মাদরাসার দুই শতাধিক শিক্ষক ই-পাসপোর্টের আবেদন করার নিয়ম - dainik shiksha ই-পাসপোর্টের আবেদন করার নিয়ম দৈনিক শিক্ষার আসল ফেসবুক পেজে লাইক দিন - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষার আসল ফেসবুক পেজে লাইক দিন ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছুটির তালিকা ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা ২০২০ খ্র্রিষ্টাব্দে মাদরাসার ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০২০ খ্র্রিষ্টাব্দে মাদরাসার ছুটির তালিকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন - dainik shiksha শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন please click here to view dainikshiksha website