আমাদের সঙ্গে থাকতে দৈনিকশিক্ষাডটকম ফেসবুক পেজে লাইক দিন।


আমরা কি পারি না ক্লাসের পড়া ক্লাসেই শেষ করতে?

নিজস্ব প্রতিবেদক | ডিসেম্বর ৩০, ২০১৫ | বই

অনেক অভিভাবক বাচ্চার জন্য প্রচুর হোমওয়ার্ক দিতে বলেন। যে শিক্ষক সে কাজটি করেন, অভিভাবকদের কাছে তার কদর বেশি। তিনি ‘খুব ভালো শিক্ষক’ হিসেব পরিচিত পেয়ে যান। প্রশাসনও তাদের পছন্দ করে। ফলে চতুর শিক্ষকরা তাই করে থাকেন।

যেসব শিক্ষক ভাবেন, শিক্ষাকে শিক্ষার্থীদের কাছে আনন্দময় করে উপস্থাপন করতে হবে- তারা বাচ্চাদের ক্লাসের পড়া ক্লাসেই শেষ করেন।

হোমওয়ার্ক খুব একটা দেন না। দিলেও খুব সামান্য। ফলে অভিভাবক, বিদ্যালয় ও প্রশাসন মনে করে যে, এসব শিক্ষক ফাঁকিবাজ। তারা বেশি খাটতে চান না, শিক্ষার্থীকেও খাটাতে চান না।

এ বৈপরীত্যের মধ্যেই বেড়ে উঠছে আমাদের শিক্ষার্থী ও শিক্ষাব্যবস্থা।

কম বয়সের কিংবা উঠতি বয়সের শিক্ষার্থীদের এত কিসের পড়া? সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ক্লাসে পড়ছে। বাসায় নিজে অথবা টিচারের কাছে পড়ছে। ক্লাসের পর কোচিং সেন্টার কিংবা টিচারদের বাসায় পড়ছে সন্ধ্যা পর্যন্ত। কোনো বন্ধ নেই, অনুষ্ঠান নেই, পড়া আর পড়া। বেড়াতে যাচ্ছে- সঙ্গে বই নিয়ে যাচ্ছে, ক্লাসের বই।

একটি বিষয় সম্পর্কে পুরো বছর এভাবে পড়া হচ্ছে। কিন্তু আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি, শিক্ষার্থীরা বিষয়টি নিজের মতো বা নিজে বলার মতো আত্মস্থ করতে পেরেছে কিনা?

একটি বিষয় যদি আমরা লক্ষ্য করি, দেখব- শিক্ষার্থীরা বারবার পড়ছে না, কোচিংয়ে যাচ্ছে না, প্রাইভেট পড়ছে না অথচ তারা ক্রিকেট খেলা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানছে, কমেন্ট করছে, কী করলে ভালো হতো- বলে দিচ্ছে। তারা ক্রিকেটারদের নাম জানে, জীবনী জানে, তার ক্রিকেটের ক্যারিয়ার জানে।

একইভাবে সিনেমার বা নাটকের নায়ক-নায়িকাদের নাম, ক্যারিয়ার ছাড়াও কার কী পছন্দ, সবই জেনে যাচ্ছে। এটা কি সহজ কাজ? কীভাবে এসব হচ্ছে, আমরা কি কখনও চিন্তা করে দেখেছি? শিক্ষার্থীরা যে বিষয়ে কোচিং করেনি, ক্লাসে পড়েনি, ক্লাসের বইয়ে পড়েনি- অথচ নিজের বইয়ের চেয়ে অনেক বেশি জানে। তাহলে আসল ব্যাপারটি কোথায়?

পৃথিবীর বহু দেশেই শিক্ষার্থীরা বই নিয়ে বাড়িতে যায় না। এর পেছনে কয়েক ধরনের উপকারিতা ও কারণ নিহিত। এক, শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের চাপে থাকে না, ফলে তাদের মন থাকে সতেজ, মানসিকতা থাকে উন্নত।

পরীক্ষার কোনো টেনশনে তারা ভোগে না। এ সময়টিতে তারা অনেক প্রয়োজনীয় ও বাস্তব সামাজিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে। পরিবার ও প্রতিবেশীকে অনেক বেশি সময় দিতে পারে। নিজের ইচ্ছামতো পাঠ্যবইয়ের বাইরে অনেক কিছু পড়তে পারে, যা তার জ্ঞানের দিগন্ত বহুগুণ প্রসারিত করে।

বিভিন্ন মাধ্যমে- প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় চলমান অনেক অনুষ্ঠান তারা দেখতে পারে, যেগুলো বাস্তব জীবনের প্রতিফলন, সমাজের প্রতিফলন, বিশ্বের কোথায় কী ঘটছে- তার প্রতিফলন। বিদ্যালয় থেকে যে প্রজেক্ট ওয়ার্ক দেয়া হবে, সেগুলো সে মন দিয়ে করতে পারে এবং শিক্ষার্থী এতে প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ পায়। একজন শিক্ষার্থী যখন গণিতের কোনো সমস্যা সমাধান করতে পারছে না, তখন কি আমরা তাকে তার নিজের মতো সমাধান করার সুযোগ ও সময় দিই? দিই না। দিলে সে নিজেই পারত এবং এ পারাটা তার সারা জীবনের জন্য ‘পারা’ হতো।

সে মূল বইয়ের উদাহরণ দেখে, নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে সমস্যাটির সমাধান করতে পারে। কিন্তু আমরা করি কী- গণিতে কম নম্বর পেয়েছে, পাঠাও কোনো এক নামকরা (?) শিক্ষকের কাছে, যিনি পুরো অংকটি তার মতো করে সমাধান করবেন, অর্থাৎ এখানে শিক্ষার্থী নিজে চেষ্টা করার সুযোগ পেল না। যে বিষয়টি সে সহজেই নিজে করতে পারত, তা প্রমাণ করার সুযোগ পেল না।

যে কোনো খাবার খাওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন হয়, খাবারটি পরিপাকের জন্য। পরিপাকের পরেই সেটি শরীরের কাজে লাগে। পড়ার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। একজন শিক্ষার্থী যা পড়ছে, তা ডাইজেস্ট করতে, আত্মস্থ করতে সময়ের প্রয়োজন হয়। খাবার যদি সারা দিনই খাওয়া হয়, তা কিন্তু ঠিকমতো পরিপাক হয় না এবং শরীরেরও কাজে লাগে না।

একইভাবে বারবার কিংবা সারাদিন পড়তেই থাকলে তা কিন্তু শিক্ষার্থীরা ধরে রাখতে পারে না। আবার খাবার যদি উপাদেয় হয়, তাহলে সহজপাচ্য হয়। মূল খাবারের সঙ্গে আমরা লেবু, কাঁচামরিচ, লবণ, সালাদ- কত কী খাই।

আর আমাদের শিক্ষার্থীরা কোচিংয়ে, বাসায়, টিউটরের কাছে শুধু ক্লাসের পাঠ্যবই পড়ছে অর্থাৎ সালাদ, লেবু, কাঁচামরিচ কিছুই খাচ্ছে না। ফলে খাওয়া মজা হচ্ছে না। পড়া সহজপাচ্য করার জন্য সঠিক ধারণা দিতে হয়, আনন্দ দিতে হয়, সঙ্গে আরও মজার মজার বই পড়তে দিতে হয়। তাহলেই শিক্ষার্থীরা কোনো একটি বিষয় সহজে বুঝতে পারে, যা ভুলে যায় না। যেমন ইংরেজিতে যখন টেনস পড়ানো হয়, তখন যদি বাস্তব উদাহরণ দেয়া যায়- যেমন, তোমরা এখন ক্লাসের কাজে অংশ নিচ্ছ- এটি প্রেজেন্ট কন্টিনিউয়াস টেনস।

আগামীকাল যখন এ কাজই করবে, তখন সেটি হবে ফিউচার কন্টিনিউয়াস টেনস। আগামীকাল যখন আজকের কথা বলব- তোমরা গতকাল শ্রেণীকক্ষে কি করছিলে, সেটি হবে পাস্ট কন্টিনিউয়াস টেনস। গণিতে ক্ষেত্রে শ্রেণীকক্ষের, বিদ্যালয়ের কিংবা বাসার উদাহরণ টেনে নিলে শিক্ষার্থীরা সহজে বুঝতে পারে, যা তাদের হৃদয় থেকে সহজে মুছে যাবে না।

বিদ্যালয়ের সময় একটু বাড়িয়ে দিলে, প্রজেক্ট বেইজড ও কার্যাবলী সমৃদ্ধ অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা নিজেরাই করে করে শেখার ব্যবস্থা করতে পারলে প্রাইভেট, বিশেষ কোচিং, সময় নষ্ট, টেনশন, মানসিক রোগ ইত্যাদি থেকে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্ত থাকবে। তাতে দেশ হবে প্রকৃত অর্থে সমৃদ্ধ। তারাই পারবে দেশকে সঠিক নেতৃত্ব প্রদান করতে। কারণ তারা হবে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত।

প্রাইভেট বা কোচিং নয়, শিক্ষকদের অতিরিক্ত উপার্জন হবে সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে। এখন যেটি হচ্ছে তা হল, শিক্ষার্থীরা মাসের পর মাস, বছরের পর বছর শিক্ষকদের কাছে শিখছে ংঁনলবপঃ+াবৎন+ড়নলবপঃ. শিক্ষার্থী নিজে ইংরেজির চর্চা করার, লেখার বা বলার সুযোগ কোথাও পাচ্ছে না। ফলে ভাষা শিখছে না। শিখছে দু’একটি নিয়ম-কানুন, যা কয়েকদিন বা কয়েক মাসের তারা মধ্যে ভুলে যায়। এটি তো ভাষা শেখানোর প্রকৃত পন্থা নয়। একইভাবে গণিত, বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোও তাদের পড়ানো হচ্ছে। অথচ বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে শিক্ষার্থীদের আনন্দ দেয়ার মাধ্যমে কোনো বিষয় বোধগম্য করতে পারাটাই হচ্ছে আসল ক্রেডিট।

শিক্ষার্থীরা ক্লাসের বই ক্লাসেই রেখে যাবে, বাসায় নেবে না- এ বিষয়টি শুধু আইন করে করা সম্ভব নয়।

বিষয়টি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবাইকে গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে। দু’চারটি ভালো স্কুলে এর চর্চা শুরু হলে, তার ফলাফল যখন সবই জানবে, তখনই বিষয়টি সবাইকে আকৃষ্ট করবে।

বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থাই আমাদের অনুসরণ করতে হবে।

আপনার মন্তব্য দিন