আমাদের সঙ্গে থাকতে দৈনিকশিক্ষাডটকম ফেসবুক পেজে লাইক দিন।


ইংরেজি ভাষা শিক্ষা’র ভবিষ্যত

নিজস্ব প্রতিবেদক | জানুয়ারি ৭, ২০১৬ | মতামত

বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা। এটি কেবল মুখের নয়, আমাদের হৃদয়ের ভাষা ও বটে। এ ভাষায় আমরা স্বপ্ন দেখি,স্বপ্ন দেখাই। এ ভাষায়ই আমরা জীবনের জয়গান গাই,জীবনকে সাজাই,জীবনের সকল আনন্দ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করি। বাংলা আমাদের বিশ্ব সভায় পরিচয় করিয়ে দিয়েছে এক অনন্য, অসাধারণ জাতি রুপে-যে জাতি মায়ের ভাষাকে মায়ের ন্যায় ভালবেসে বুকের তাজা রক্ত রাজপথে ঢেলে দিতে ও কার্পণ্য করে নাই।

বর্তমানে বিশ্বায়নের যুগ।পৃথিবী আজ ‘গ্লোবাল ভিলেজ’। একদিন আমরা ‘গ্লোবাল ফ্যামিলি’র বাসিন্দা হবো। সে দিনটি আর খুব দূরে নয়।

ইংরেজ এক অতি চালাক ও বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন জাতির নাম। পৃথিবীতে এই একটি মাত্র জাতি, যাদের কোন স্বাধীনতা দিবস নেই। এর মানে কী?  এর মানে হচ্ছে, তারা কোনদিন কারো বশ্যতা স্বীকার করেনি। কেউ তাঁদের কোনদিন পরাধীনতার শৃংখল পরাতে পারেনি। বরং অর্ধেক পৃথিবীকে তারা একদিন শাসন করেছে। কথিত ছিল যে, বৃটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যেত না।

তারা তাদের শৌর্য-বীর্য ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এ পৃথিবীর বহু দেশকে শাসন করেছে। হাজার হাজার মাইল দূর থেকে ব্যবসা করতে এসে একদিন তারা এ উপমহাদেশে দন্ড-মুন্ডের কর্তা হতে পেরেছিল। বিনা রক্তপাতে ১৯৪৭ সালে তারা ভারতবর্ষ ছেড়ে দিয়ে চলে যায় বটে,কিন্তু আজো ভারত বর্ষের সব ক’টি দেশের অধিকাংশ আইন তাদেরই রচিত। তাদের রচিত আইন দিয়ে আমাদের দেশের কোর্ট-কাচারী এখনো চলে।

এক সময় বৃটিশরা সদর্পে প্রায় অর্ধেক দুনিয়া শাসন করেছে। আজ তাদের সেদিন অবশ্য নেই। তবে তাদের মেধা,বুদ্ধি,মননশীলতা, সাহিত্য,সংস্কৃতি এবংসর্বোপরি তাদের ভাষা দিয়ে আজো তারা এ পৃথিবী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

তাদের মাতৃভাষা ইংরেজি আজ সারা পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক ভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। অফিসিয়্যাল ভাষা হিসেবে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই এ ভাষার প্রচলন। আমাদের বাংলাদেশে ও এ ভাষার বহুল প্রচলন পরিলক্ষিত হয়।

আমাদের ভ্রমণের ক্ষেত্রে রেল ও বিমানের টিকেট,ব্যাংক বিবরণী,শিক্ষা বোর্ডের সার্টিফিকেট ওট্রান্সক্রিপ্ট,মামলার রায় ইত্যাদি ক্ষেত্রে ইংরেজির ব্যবহার অগ্রগণ্য। আন্তর্জাতিক সকল ব্যবসা বাণিজ্য, লেনদেন ইত্যাদি ইংরেজি মাধ্যমে চলে। বিশ্বের যতসব আবিস্কার,জ্ঞান- বিজ্ঞান সকলই ইংরেজি ভাষায় রচিত।

কিন্তু,আমাদের দেশে ইংরেজি ভাষার চর্চা কেমন হচ্ছে আজকাল?  আমাদের স্কুল,কলেজ কিংবা ভার্সিটি গুলোতে কেমন চলছে এ ভাষার পাঠদান?

আমাদের দেশে ইংরেজি বিষয়ের পাঠদানে যে সব পদ্ধতি গৃহীত হচ্ছে,তাতে কাজের কাজ কিছু হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। ইংরেজি শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে কেজি স্কুল,ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল সহ নানা ধরণের স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে ও ইংরেজি ভাষার উপর আমাদের জাতির দখলটা যেন দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। আজকাল শহরের অলিতে গলিতে ইংরেজি ভাষা শেখার নানাবিধ সাইনবোর্ড যেমন-IELTS,TOEFL,সাত -পাঁচ দিনে ইংরেজি ভাষা শিখিয়ে দেবার কতো যে অফার নজরে পড়ে,তার হিসেব কে রাখে ? বৃটিশ কাউন্সিল ও তো কম করছে না। তারপর ও এ বিষয়ে আমাদের এতটুকু উত্তরণ নেই। আর এ বিষয়ে আমাদের পারদর্শিতা যত হ্রাস পাচ্ছে, ততই আমরা বহির্বিশ্বে কোনঠাসা হয়ে যাচ্ছি। এমন ও দিন ছিল,আমাদের দেশে এন্ট্রান্স পাস করা লোক অনর্গল ইংরেজি বলতে পারতেন। এদের সাথে অনেক সময় খোদ ইংরেজরা ও কুলিয়ে উঠতে পারতো না।

কিন্তু এখন হলোটা কী ? আজকাল আমাদের অনেক বি,এ-এম,এ পাস করা ছেলে পিলেরা পর্যন্ত সুন্দর করে নিজে থেকে দু’ লাইন ইংরেজি বলতে কিংবা লিখতে পারে না।

আমাদের দেশে গত শতকের নব্বই-এর দশকে তৎকালীন সরকার ছাত্রদের নিজেদের ফায়দা হাছিলের লক্ষ্যে ব্যবহারের জন্য স্নাতক শ্রেণি থেকে ইংরেজি বিষয়টি এক রকম উঠিয়ে দেয়। তখন ডিগ্রি পর্যায়ে ইংরেজি আর বাধ্যতামূলক রাখা হয়নি। সেই থেকে ছাত্ররা ডিগ্রি পর্যায়ে আর ইংরেজি বিষয়টি পড়ার তেমন আর গরজ বোধ করে নি।পরবর্তিতে স্নাতক পর্যায়ে ১০০ নম্বরের ইংরেজি বিষয়টি আবশ্যিক করা হলে ও তাতে সিলেবাস বহুলাংশেই সংকুচিত মনে হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে যেখানে ইংরেজি ২০০ নম্বরের দু’টি পত্র আবশ্যিক, সেখানে ডিগ্রি লেভেলে কোন যুক্তিতে মাত্র ১০০ নম্বরের একটি পত্র আবশ্যিক করা হলো?  ডিগ্রি পর্যায়ে ইংরেজি শিক্ষা সংকুচিত করে আমাদের জাতিটার কী-ই না সর্বনাশ করা হলো! নব্বই-এর দশকে যারা লেখাপড়া করেছেন,তাদের বেশীর ভাগই আজ বিভিন্ন স্তরে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত। তারা তাদের ছাত্র ছাত্রীদের কতটুকু ইংরেজি শিক্ষা দান করতে পারছেন,সেটুকু তারা নিজেরাই ভাল বলতে পারেন।কাঠিন্যের বিষয়টি বিবেচনায় এনে থাকলে মাধ্যমিকে ১০০, উচ্চ মাধ্যমিকে ২০০ এবং ডিগ্রি স্তরে ৩০০ নম্বর আবশ্যিক হবার কথা। কিন্তু হলো এর উল্টো টা। এ ভাবে আমাদের শিক্ষায় ক্ষেত্র বিশেষে উল্টো চাকাটাই বেশী সক্রিয় বলে প্রতীয়মান হয়।

আমাদের প্রাথমিক স্তরে Competence -based এবং মাধ্যমিক স্তরে Communicative Approach নামে যে প্রশ্ন পদ্ধতি চালু করা হয়েছে,তা আমাদের এ সকল স্তরের শিক্ষার্থীগণের বয়স,মেধা ও রুচিকে কতটুকু প্রাধান্য দিয়ে করা হয়েছে, তা-ই আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছ।Translation বাদ দিয়ে কোন লাভ হয়েছে বলে তো মনে হয় না। আমাদের সময় আমরা তো Translation শিখে শিখে ইংরেজি অনেকটাই আয়ত্ব করতে চেষ্ঠা করেছি। Grammatical সব item -এর ব্যবহার বিধি,Pair of words,Phrase & idoms ইত্যাদি মুখস্তের সাথে সাথে ইংরেজি বিষয়ে Competence বৃদ্ধির যে সুযোগ ছিল,তা আজকাল আমাদের শিক্ষায় নেই।আমরা খুব সুন্দর করে Tense -এর নিয়ম কানুন যেভাবে শিখেছি,আজকাল সেভাবে শেখার সুযোগ নেই। NCTB থেকে ষষ্ঠ হ’তে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যের যে Grammar and Composition বই দেয়া হয়েছে,সে সব বই ইংরেজি মাধ্যমে লেখা। তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশী হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

প্রাথমিক পর্যায়ে এবং মাধ্যমিক স্তরে ইংরেজি বিষয়ে Unseen Passage থেকে শিক্ষার্থীদের উত্তর করার বিষয়টি কতটুকু সঙ্গত হয়েছে ? এ সব করে শিশু- কিশোরদের মনে কী ইংরেজি ভীতি সৃষ্ঠি করা হয় নাই ?

ইদানিং আবার Listening এবং Speaking -এর জন্য( ১০+১০) =২০ নম্বর বরাদ্দ করা হয়েছে। বাস্তবে এ সবের চর্চা কতোটুকু হয় বা হবে, তা আগেই ভেবে দেখা উচিত ছিল।

প্রকৃতপক্ষে আমাদের দেশে ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রে নানা অসঙ্গতি আমাদের নতুন প্রজন্মকে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার প্রতি দিনে দিনে ভীতশ্রদ্ধই করে তুলছে। এ সব দূর করা আমাদের শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

মুজম্মিল আলী : অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট।


আপনার মন্তব্য দিন