উপেক্ষিত গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের অসহায়ত্ব - মতামত - Dainikshiksha


উপেক্ষিত গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের অসহায়ত্ব

নিউটন মজুমদার |

আব্দুর রহিম- সদ্য এইচএসসি উত্তীর্ণ একজন শিক্ষার্থী। কিন্তু তার শিক্ষাজীবনের ইতিহাস আর পাঁচজন শিক্ষার্থীর মতো নয়। কারণ তাকে যে জীবনের সঙ্গে কঠোর সংগ্রাম করে এ পথ অতিক্রম করতে হয়েছে!

পোশাক শ্রমিক পিতাকে হারাতে হয়েছিল এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়, তখন সে সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া ছাত্র। পিতৃহারা চার ভাইবোন এবং মা, এই পাঁচজনের সংসার। কোথাও থেকে রহিমের পরিবার পায়নি এতটুকু সাহায্য। অগত্যা মায়ের সঙ্গে আব্দুর রহিমও নেমে পড়ে জীবনযুদ্ধে, পাশাপাশি পড়ালেখার প্রতি অদম্য স্পৃহা। মা গ্রামে মানুষের জমিতে কাজ করেন, আর রহিম পড়ালেখার পাশাপাশি ভ্যান চালায়, কখনো কাজ করেছে কোনো ওয়ার্কশপ কিংবা গ্যারেজে, আবার কখনোবা কোনো দোকান কিংবা রেস্তোরাঁয়। এভাবেই পাঁচ সদস্যের পরিবার এবং নিজের পড়ালেখা চালিয়েছে সে। এলাকার স্কুল-কলেজের সকল শিক্ষক-শিক্ষার্থী তার ব্যাপারে অবগত থাকার দরুন, সেসব প্রতিষ্ঠানে তাকে নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রহিমের জীবনের আসল গল্প শুরু হলো আজ। কারণ তার ছোট্ট আকাশে আজ ডানা মেলেছে এক বৃহত্ স্বপ্ন, আর তা হলো একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া। কিন্তু এ যুদ্ধে যে রসদ দরকার তা নেই আব্দুর রহিমের। সে জানতে পেরেছিল এ বছর নাকি সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা একসঙ্গে হবে, একটি ফরম পূরণ করলেই সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য হয়ে যাবে, একটি পরীক্ষা দিয়ে উর্ত্তীণ হতে পারলেই যেকোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হবে। আশায় বুক বেঁধে ছিল রহিম! কিন্তু এখন এত কষ্টের পর কাঙ্ক্ষিত ভালো ফলাফল করেও বিজয়ীর হাসি নেই তার রণক্লান্ত বদনে। কারণ এখন তাকে তার লক্ষ্যের মাইলফলক স্পর্শ করতে হলে শহরে যেয়ে ভর্তি হতে হবে কোচিং সেন্টারে, তারপর কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ লাভের জন্য আলাদা করে প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের জন্য উচ্চমূল্যে ফরম সংগ্রহ করতে হবে। তারপর তাকে ছুটতে হবে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। আর এ সবকিছুর জন্যে যেটি দরকার, তা হলো—টাকা!

হয়তো থমকে দাঁড়িয়েছে আব্দুর রহিমের স্বপ্ন। তারপরও হয়তো সে ছুটবে তার লক্ষ্যে সবটুকু শ্রম উজাড় করে, হয়তো তার মা নিজের শরীরের রক্ত বিক্রি করে হলেও ছেলের স্বপ্ন পূরণে সচেষ্ট হবেন। কিন্তু আমাদের দেশের যেসকল সুশীল সমাজের মহত্ ব্যক্তিগণ মহান ব্রত নিয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে লাখো শিক্ষার্থীদের ভাগ্যবিধান করেন, তারা কি একটিবার হলেও চিন্তা করে দেখেছেন এই আব্দুর রহিমের মতো স্বপ্নালু সন্তানদের কথা? হয়তো ভাবেননি! যদি ভাবতেন, তাহলে হয়তো আপনারা স্বয়ং মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুরোধ এভাবে অমান্য করতে পারতেন না। শিক্ষামন্ত্রীর আহ্বান ছুঁড়ে ফেলতে পারতেন না!

অবশেষে আপনাদের স্বার্থান্বেষী উচ্চাকাঙ্ক্ষার কাছে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর বিবেকের বরণ করতে হয় অসহায়ত্ব; সম্প্রতি তিনি মর্মাহত চিত্তে অকপটে বলতে বাধ্য হলেন- আগামী বছর হতে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হবে। তত্সঙ্গে তিনি অত্যন্ত পরিতাপের সহিত আপনাদের অনাগ্রহ এবং শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের অসহনীয় কষ্টের কথা বলে ব্যথিত হন। ‘বর্তমান দেশে ৪০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ১০৩টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট আসন সংখ্যা প্রায় ছয় লাখ ৫০ হাজার। এর বাইরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সারাদেশের ৫১৬টি কলেজে অনার্স-মাস্টার্স পড়ানো হয়। এখানে অনার্সে (স্নাতক) ভর্তিযোগ্য আসন রয়েছে চার লাখের বেশি। সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতেও আসন রয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার। শিক্ষা বিভাগ বলছে, দেশে সব মিলে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে আসন রয়েছে ১৩ লাখেরও বেশি (সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক)।’ তথাপি আপনাদের সামান্যতম ভুলের জন্য আজ লাখো গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন হয়তো আটকে যাবে পরীক্ষার ফরম কেনার টাকায়, ছুটতে ছুটতে অসুস্থতায়, হয়তো দেরিতে কেন্দ্রে আসায় হলে ঢুকতে না পারায়, পথে রাজনৈতিক কোনো অস্থিরতায় (কারণ নির্বাচনী বছর), কখনোবা পরীক্ষা কেন্দ্র হতে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে যানজটে! হয়তো আপনাদের সামান্যতম সদিচ্ছার অভাবই হবে এ সকল অগণিত শিক্ষার্থীর ভাগ্যের নির্মম পরিহাস!

লেখক: শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ

সৌজন্যে: দৈনিক ইত্তেফাক




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
করোনায় আরো ৩৫ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ২ হাজার ৪২৩ - dainik shiksha করোনায় আরো ৩৫ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ২ হাজার ৪২৩ চাষ না করে কৃষি জমি ফেলে রাখলে নিয়ে নেবে সরকার - dainik shiksha চাষ না করে কৃষি জমি ফেলে রাখলে নিয়ে নেবে সরকার পছন্দের শিক্ষকের পাঠদান পাওয়া যাবে মোবাইল ফোনে - dainik shiksha পছন্দের শিক্ষকের পাঠদান পাওয়া যাবে মোবাইল ফোনে লকডাউন উঠানো, না উঠানো নিয়ে যা বললেন এন আই খান (ভিডিও) - dainik shiksha লকডাউন উঠানো, না উঠানো নিয়ে যা বললেন এন আই খান (ভিডিও) শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের তথ্য চেয়েছে মন্ত্রণালয় - dainik shiksha শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের তথ্য চেয়েছে মন্ত্রণালয় নটরডেম কলেজে ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত - dainik shiksha নটরডেম কলেজে ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত জেডিসির রেজিস্ট্রেশনের সময় ফের বাড়ল - dainik shiksha জেডিসির রেজিস্ট্রেশনের সময় ফের বাড়ল কলেজে ভর্তি : দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha কলেজে ভর্তি : দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে ঘরে বসে পাঠদান: শিক্ষকদের জন্য ফ্রি অনলাইন কোর্স - dainik shiksha ঘরে বসে পাঠদান: শিক্ষকদের জন্য ফ্রি অনলাইন কোর্স ৮ জুনের মধ্যে শিক্ষক-কর্মচারীদের তালিকা চেয়েছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড - dainik shiksha ৮ জুনের মধ্যে শিক্ষক-কর্মচারীদের তালিকা চেয়েছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড দাখিলের ফল পুনঃনিরীক্ষার আবেদন যেভাবে - dainik shiksha দাখিলের ফল পুনঃনিরীক্ষার আবেদন যেভাবে এসএসসির ফল পুনঃনিরীক্ষার আবেদন ৭ জুনের মধ্যে - dainik shiksha এসএসসির ফল পুনঃনিরীক্ষার আবেদন ৭ জুনের মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া উপবৃত্তির টাকা মেরে দেয়ার অভিযোগে মাদরাসার অফিস সহকারীর গলায় জুতার মালা - dainik shiksha উপবৃত্তির টাকা মেরে দেয়ার অভিযোগে মাদরাসার অফিস সহকারীর গলায় জুতার মালা please click here to view dainikshiksha website