এইচএসসির ফল: তিন ধনাত্মক সূচকে অগ্রগতি - মতামত - Dainikshiksha


এইচএসসির ফল: তিন ধনাত্মক সূচকে অগ্রগতি

মাছুম বিল্লাহ |

বুধবার (১৭ জুলাই) প্রকাশিত হলো ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষার ফল। এবার ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের চেয়ে পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা বেড়েছে। মেয়ে শিক্ষার্থীদের পাসের হারও ছাত্রদের চেয়ে বেশি। এই তিনটি বৈশিষ্ট্যই এবারকার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলে লক্ষণীয়।

এবার ১ এপ্রিলে এইচএসসি ও সমমানের তত্ত্বীয় পরীক্ষা শুরু হয়ে শেষ হয় ১১ মে। এরপর ১২ মে থেকে ব্যবহারিক পরীক্ষা শুরু হয়ে ২ মে শেষ হয়। এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পরীক্ষার্থী ছিল ১৩ লাখ ৫৮ হাজার ৫০৫জন। এর মধ্যে ৮টি সাধারণ শিক্ষাবোর্ডের অধীনে এইচএসসিতে পরীক্ষার্থী ছিল ১১লাখ ৩৮ হাজার ৫৫০জন। এ বছর ৯ হাজার ৮১ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ৬লাখ ৬৪হাজার ৪৯৬জন ছাত্র ও ৬লাখ ৮৭হাজার ৯জন ছাত্রী উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেয়। মাদরাসা থেকে আলিমে ৮৮হাজার ৪৫১জন ও কারিগরিতে ১লাখ ২৪হাজার ২৬৪জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে।

এবারকার এইচএসসির ফল প্রকাশিত হলো ৫৫দিনের মধ্যে। এটিকে আমরা কি পজিটিভ সাইন বলবো? দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশিত হয়েছে বলে একদিকে পজিটিভ বলা যায়। এখন পাবলিক পরীক্ষার ফল দু’মাসে দেয়া হয়, যা আগে তিনমাসে দেয়া হতো। এবার দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশের কারণে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান এবং তিনি এতে খুশীও হয়েছেন। তবে, পরীক্ষার ফল তাড়াহুড়ো করে দেয়া মানে প্রচুর ভুল-ত্রুটিকে আশ্রয় দেয়া।

আর একটি বিষয় তো আমরা খেয়ালই করছি না। সেটি হচ্ছে, একজন শিক্ষার্থীর সারাজীবনের বিচার করছেন একজন শিক্ষক। তিনি অভিজ্ঞ হোক, অনভিজ্ঞ হোক, নতুন হোক পুরান হোক, খাতা মূল্যায়ণ করতে জানুক আর না জানুক। একজন শিক্ষকের কয়েক মিনিটের বিচার এবং রায় হচ্ছে একজন শিক্ষার্থীর বার বছরের সাধনার ফল এবং ভবিষ্যতের পথচলার নির্দেশক। এটি কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

একটি উত্তরপত্র বিশেষ করে এই ধরনের পাবলিক পরীক্ষার খাতা কমপক্ষে দু’জন পরীক্ষকের পরীক্ষণ করা উচিত। তা না হলে সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হয় না।  এরপর হাজার হাজার ভুল ত্রুটি ধরা পড়বে, সেখানে বোর্ড কিছু অর্থ উপার্জন করবে কিন্তু কাজের কাজ খুব একটা কিছু হবে না। কারণ খাতা তো পুনর্মূল্যায়ন হয় না। শুধুমাত্র উপরের নম্বর দ্বিতীয়বার গণনা করা হয়। আমরা একটি পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে এ ধরনের খেলা খেলতে পারি না। 

এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ৯০৯টি প্রতিষ্ঠানের সবাই পাস করেছে। এদের মধ্যে কলেজ মাত্র ১৭১টি, মাদরাসা ৬১৫টি ও ১২১টি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিজ্ঞান বিভাগে পাস করেছে ২ লাখ ২৫ হাজার ১২শিক্ষার্থী। এ বছর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২লাখ ৬২হাজার ৯৫২জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল। বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৮৫দশমিক ৫৭শতাংশ, আর জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৩হাজার ১৯২জন। এবার ৪১টি প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করেনি। এদের মধ্যে ৩৩টি কলেজ ও ৮টি মাদরাসা রয়েছে।  কিছু কিছু কলেজে দেখলাম মাত্র একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছিল, ঐ একজনই অকৃতকার্য হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান নিয়ে শিক্ষা প্রশাসন তথা সরকারের সিদ্ধান্ত কী? কেনই-বা একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারে না আবার একটি প্রতিষ্ঠান থেকে মাত্র একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেয়, এটিই বা কেমন প্রতিষ্ঠান?

কুমিল্লা বোর্ডে এবার এইচএসসিতে পাসের হার সবচেয়ে বেশি ৭৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অথচ এই শিক্ষার্থীরা ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে যখন এসএসসি  পাস করে তখন তাদের পাসের হার ছিল সর্বনি¤œ ৪৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। হঠাৎ করে এই পরিবর্তন কীভাবে হলো? শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন তারা হয়তো কোনো বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছেন তাই এরকম হয়েছে।

আমরা জানি, শিক্ষাবোর্ড একমাত্র পরীক্ষা গ্রহণ করা ছাড়া কীভাবে শিক্ষকরা পড়াবেন, কীভাবে শিক্ষার মান উন্নয়ন ঘটানো যায় ইত্যাদি নিয়ে তাদের তৎপরতা খুব একটা কখনও দেখা যায় না। একটি বোর্ডের অধীনে কয়েকটি জেলায় কয়েক হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকে। সেগুলোর শিক্ষাদান, শিক্ষক উন্নয়ন ও শিক্ষার্থী উন্নয়ন নিয়ে বোর্ডের কোনো তৎপরতা বা কাজ আমরা দেখি না। কিন্তু পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর বোর্ডগুলোর মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। কোনো বোর্ডে কত বেশি শিক্ষার্থী পাস করেছে। বোর্ড যেন এক ধরনের কৃতিত্ব দেখাতে চায়।

আসলে আমাদের দেশে শিক্ষাবোর্ডগুলো একমাত্র শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন আর খাতা মুল্যায়ন ছাড়া তেমন কোনো কাজ করে না। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা একটি জেলার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরীক্ষায় ভালো করলে তা ঐ প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারীদের এবং একই জেলার কিছু প্রতিষ্ঠান ভালো করলে শিক্ষা প্রশাসন কিছুট কৃতিত্ব নিতে পারে। বোর্ড কেন? বোর্ড কি শিক্ষকদের কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়? বোর্ড কি শিক্ষকদের ক্লাস পর্যবেক্ষণ করে? বোর্ড কি শিক্ষার্থীদের মানসম্মত পড়ালেখা করার জন্য কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে? এর কোনোটিই করে না। তাহলে তারা কৃতিত্ব দেখাতে চায় কেন? বিষয়টি আমার কাছে বোধগম্য নয়। 

পত্রিকায় দেখলাম যশোর বোর্ডে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে আছে। বোর্ডের ১৮টি কলেজের পাসের হার শতভাগ। এ বোর্ডে সামগ্রিক পাসের হার ৭৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ, আর মেয়েদের পাসের হার ৭৮দশমিক ৭৬শতাংশ। ছেলেদের পাসের হার ৭২দশমিক ৭৪ শতাংশ। দিনাজপুর বোর্ডেও ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে আছে। এ দু’টো বোর্ডে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা কি বেশি পড়াশুনা করেছে? নাকি অন্য কোনো কারণ আছে যেটি গবেষণার মাধ্যমে জানা প্রয়োজন।
ফলাফলের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে পাঁচ বছর যাবত ছাত্রীরা ধারাবাহিকভাবে ছাত্রদের চেয়ে বেশি পাস করে আসছে।  এবছর ছাত্রীদের পাসের হার ৭৬ দশমিক ৪৪শতাংশ আর ছাত্রদের ৭১দশমিক ৬৭ শতাংশ। অর্থাৎ ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের পাসের হার ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেশি। এটি যদিও আনন্দের সংবাদ; কিন্তু এর সঠিক কারণ জানা প্রয়োজন। 

লেখক: ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক।




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
গভর্নিং বডি-ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা সংশোধনের সিদ্ধান্ত বৃহস্পতিবার - dainik shiksha গভর্নিং বডি-ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা সংশোধনের সিদ্ধান্ত বৃহস্পতিবার সরকারি স্কুলের ৪৯ শিক্ষককে বদলি - dainik shiksha সরকারি স্কুলের ৪৯ শিক্ষককে বদলি সরকারিকরণ করলে সরকারেরই লাভ : শাব্বীর মোমতাজী (ভিডিও) - dainik shiksha সরকারিকরণ করলে সরকারেরই লাভ : শাব্বীর মোমতাজী (ভিডিও) প্রশ্নকর্তা ও মডারেটর খুঁজছে পিএসসি - dainik shiksha প্রশ্নকর্তা ও মডারেটর খুঁজছে পিএসসি ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা সংশোধনের সিদ্ধান্ত ২২ আগস্ট - dainik shiksha ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা সংশোধনের সিদ্ধান্ত ২২ আগস্ট কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে - dainik shiksha কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে ঢাবিতে ১ম বর্ষ ভর্তি বিজ্ঞপ্তি - dainik shiksha ঢাবিতে ১ম বর্ষ ভর্তি বিজ্ঞপ্তি শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন - dainik shiksha শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website