আমাদের সঙ্গে থাকতে দৈনিকশিক্ষাডটকম ফেসবুক পেজে লাইক দিন।


একাদশের এত বই কেন অনুমোদন দেয় এনসিটিবি?

সামসুল ইসলাম টুকু | ডিসেম্বর ৩০, ২০১৫ | এইচএসসি/আলিম

এইচএসসি বিজ্ঞান বিভাগের ৪টি বিষয়ের প্রত্যেকটির জন্য অন্ততপক্ষে ২৫ জনের লেখা ৮/১০টি করে বইয়ের অনুমোদন দিয়েছে এনসিটিবি। বইগুলোয় তত্ত্বীয় বিষয় এক হলেও প্রয়োগ পদ্ধতি, লিখন পদ্ধতি ও ব্যাখ্যা ভিন্ন ভিন্ন।

ফলে শিক্ষার্থীদের একটি বিষয়ের জন্য অন্ততপক্ষে ৫/৭টি বই কিনতে হয় এবং প্রয়োগ লিখন ও ব্যাখ্যা পড়তে গিয়ে তারা হোঁচট খায়, হতবুদ্ধি ও অপ্রতিভ হয়ে পড়ে। তখন গাইডের শরণাপন্ন হয়ে উপায় থাকে না।

দুই ডজন লেখকের এক ডজন বই অনুমোদন দেয়ার ব্যাপারে এনসিটিবির অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকলেও থাকতে পারে, তবে এইচএসসি শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়ন বা পণ্ডিত বানানোর জন্য নয়- তা হলফ করে বলা যায়।

শিক্ষার্থীদের পণ্ডিত বানানোর বিষয়টি শুরু হতে পারে অনার্স ক্লাস থেকে, যা মূলত গবেষণা কর্মে কাজে লাগবে।

এ ব্যাপারে শিক্ষকদের মতামত হচ্ছে- এসএসসি বিজ্ঞানে যেমন একটি করে বই অনুমোদন দেয়া হয়, তেমনি এইচএসসিতেও একটি বইয়ের অনুমোদন দেয়া হোক। শিক্ষার্থীদের ওপর অনর্থক বইয়ের বোঝা চাপিয়ে ক্ষতি ছাড়া লাভ হবে না।

কোচিং-বাণিজ্য বন্ধের লক্ষ্যে ২০১২ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ১৫টি নীতিমালা গ্রহণ করেছিল, যার একটিও কার্যকর হয়নি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সরকার তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রচলিত ব্যবস্থার কাছে হার মেনেছে। এই নীতিমালায় ছিল- ক্লাস চলাকালীন কোনো শিক্ষক কোচিং করাতে পারবেন না। তবে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিষ্ঠান প্রধান অভিভাবকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।

মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত ফির বিনিময়ে সর্বাচ্চে ৪০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে কোচিং করতে পারবেন। কোনো শিক্ষক বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গড়ে ওঠা কোচিং সেন্টারে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হতে পারবেন না।

কোচিংয়ের জন্য কোনো শিক্ষার্থীকে উদ্বুদ্ধ করতে পারবেন না এবং শিক্ষার্থীর নাম ব্যবহার করে কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারবেন না। কোচিং সেন্টারের নামে বাসা ভাড়া নিয়ে কোচিং-বাণিজ্য করতে পারবেন না।

সরকারের এমপিওবিহীন কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কোচিং-বাণিজ্যে যুক্ত হলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে ইত্যাদি।

স্পষ্টই বলা যায়, মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত এসব নীতিমালা পদদলিত করে কোচিং-বাণিজ্য অব্যাহত গতিতে চলছে।

এ নীতিমালা শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের উৎসাহিত করতে বা আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। আজকাল দেখা যায় প্রাথমিক স্তর থেকে এইচএসসির শিক্ষার্থীরা সকাল ৬টায় বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমে দু’একটি কোচিং ক্লাস করে তারপর স্কুল-কলেজের ক্লাস করে।

বিকাল ৪টায় আবার অন্ততপক্ষে দুটি কোচিং ক্লাস করে সন্ধ্যা ৬/৭টায় বাড়ি ফেরে। শিক্ষার্থীরা যদি কোচিংয়ে এত সময় দিতে পারে, তবে সংশিষ্ট স্কুলের শিক্ষকদের কাছে কোচিংয়ে কেন সময় দিতে পারবে না? নিশ্চয়ই পারবে। নিশ্চয় সেখানে কোনো সমন্বয়হীনতা রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে শক্ত ভূমিকা নিতে হবে।

শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও অর্থের সমন্বয় ঘটলেই সেটা সম্ভব। এবং সেটা করতে পারলেই কোচিং-বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব হবে।

সচেতন হওয়ার পর থেকেই শুনে আসছি, প্রত্যেক অভিভাবক চান ছেলেমেয়েরা ভালো স্কুল-কলেজে ভর্তি হোক।

এজন্য অভিভাবকরা ভীষণ তৎপর হয়ে ওঠেন, বিশেষ করে সামর্থ্যবান অভিভাবকরা।

তাদের আশা, ছেলেমেয়েরা ভালো স্কুল-কলেজে পড়বে, ভালো রেজাল্ট হবে, ভালো চাকরি করবে। কিন্তু ভালো স্কুল-কলেজের সংজ্ঞা কী, এ বিষয়টি আমাকে অহরহ পীড়িত করে।

ঝকঝকে তকতকে ভবন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, পর্যাপ্ত শিক্ষক- এমন হলেই কি সেটা ভালো স্কুল? না সেই স্কুলের শিক্ষার্থীদের রেজাল্ট ভালো তাই ‘ভালো স্কুল’? প্রথম প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ না হলেও দ্বিতীয় প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।

আসলে শহরের ভালো নামক স্কুল ও সরকারি স্কুল-কলেজে বেছে বেছে মেধাবী ছাত্রদের ভর্তি করা হয়। আর এ কারণে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর রেজাল্ট ভালো হয়। এজন্য কৃতিত্বের দাবিদার ওই মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা।

এখানে ভালো স্কুলগুলোর কোনো কৃতিত্ব নেই, এমনকি শিক্ষকদেরও না। কারণ মেধাবী শিক্ষার্থীরা পড়ে বলেই রেজাল্ট ভালো করে। এসব শিক্ষার্থী কোনো গ্রামের কোনো স্কুল থেকে পরীক্ষা দিলেও একই ফল পাওয়া যেত। সুতরাং ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ভালো এমন বলার কোনো যুক্তি খুঁজে পাই না। আসলে ‘ভর্তি কৌশলে’ ‘ভালো প্রতিষ্ঠান’ তৈরি করা হয়।

যেহেতু সৃজনশীল প্রশ্নেই পরীক্ষা চলছে, সেহেতু প্রশ্ন যেমন সহজ হয় না- তেমনি উত্তরদানও সহজ হয় না। শিক্ষার্থীকে টেক্সট বই দিলেও তা দেখে সহজে উত্তর দিতে পারবে না। উত্তর দিতে হলে শিক্ষার্থীকে টেক্সট বই অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে পড়তে হবে এবং মর্মার্থ উদ্ধার করতে হবে, তবেই উত্তর দেয়া সম্ভব হবে। তাই টেক্সট বই দেখে পরীক্ষা দেয়ার পদ্ধতি প্রচলন করলে শিক্ষার্থীরা নোট বই, গাইড বই পড়বে না বরং টেক্সট বই পড়তে মনোযোগী হবে।

অন্যদিকে এমসিকিউ প্রশ্নের নম্বর ৫০-এর স্থলে ২০-এ নামিয়ে নিয়ে আসতে হবে, যেন এমসিকিউ প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের পাস করার সিঁড়ি না হয়। এতে নোট বই ও গাইড বই বাণিজ্য কমে যাবে।

গত কয়েক বছরে শিক্ষা বোর্ডের অলিখিত নির্দেশ এবং সরকারের শিক্ষার হার বাড়ানোর অপকৌশলে জিপিএপ্রাপ্তদের সংখ্যা ও পাসের হার গাণিতিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এর ফলে মানহীন বেকার যুবকের সংখ্যাই কেবল বৃদ্ধি পেয়েছে। এরা না পারবে কুলি-মজুর হতে, না পারবে ভালো কোনো চাকরি করতে। এ অবস্থা জাতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। তাই এ প্রবণতা চিরতরে বন্ধ করাই হবে শিক্ষিত জাতি গঠনের সহায়ক।

লেখক ও সাংবাদিক

আপনার মন্তব্য দিন