আমাদের সঙ্গে থাকতে দৈনিকশিক্ষাডটকম ফেসবুক পেজে লাইক দিন।


একীভূত শিক্ষা : প্রতিবন্ধী শিশুদের কথা

উৎপল মল্লিক | ডিসেম্বর ২৯, ২০১৫ | প্রতিবন্ধী

‘একীভূতকরণ : সক্ষমতার ভিত্তিতে সব প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়ন’- এ প্রতিপাদ্য নিয়ে ৩ ডিসেম্বর-২০১৫ পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস। মানুষ হিসেবে সমাজে পরিপূর্ণ অংশগ্রহণ তথা ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে শিক্ষাই অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি একথা অনেকেই জানেন। আর সব শিশুর জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রতিটি রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্বও বটে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী/বিশেষ শিশুদের স্থানীয় (তাদের বাড়ির নিকটবর্তী) বিদ্যালয়ে আনার ব্যাপারে কিছু দৃশ্যমান অগ্রগতিও হয়েছে। ফলে প্রতিবন্ধী অনেক শিশু ও তাদের পরিবার সুফল পেতে শুরু করেছে। যদিও এসব কর্মকাণ্ডকে পুরোপুরি সন্তোষজনক বলার সময় এখনও হয়নি। বিশেষ করে শহর ও গ্রামের বিদ্যালয়ের মধ্যে অগ্রগতির তারতম্য বিদ্যমান। যা হোক, প্রাথমিক শিক্ষায় প্রতিবন্ধী শিশুদের অন্তর্ভুক্তির হার যখন বাড়ছে তখন এর গুণগত মান বৃদ্ধি এবং যেসব শিশু এখনও আসতে পারছে না, তাদের জন্য শিক্ষকদের সম্ভাব্য করণীয় নিয়েই এ লেখা।

নিজ বুদ্ধি ও সচেতনতার কারণে অনেক অভিভাবক যেমন তাদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুকে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসছেন, তার থেকে অনেক বেশিসংখ্যক অভিভাবক এখনও এ প্রক্রিয়ার বাইরে রয়ে যাচ্ছেন। তাদের অনেকেই এখনও সন্তানের প্রতিবন্ধিতাকে তাদের পাপের ঐশ্বরিক শাস্তি বলে মনে করেন এবং এমন শিশুর পক্ষে লেখাপড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। এমন বাস্তবতা মাথায় রেখে শিক্ষকদের উচিত বছরের শুরুর দিকে অন্তত একটি অভিভাবক সভা ডেকে প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে তাদের সচেতনতা বাড়ানো এবং সব শিশুকে একসঙ্গে একীভূত শিক্ষা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা, যাতে করে সব অভিভাবকই প্রতিবন্ধী শিশুর শিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। প্রথমত, তাদের বোঝাতে হবে যে শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুকে বাড়ির বাইরে না নিলে বা কোনো রকম নড়াচড়া করতে না দিলে তাদের শারীরিক সক্ষমতা আরও খারাপের দিকে যায়। যেমন- হাত-পা পুরোপুরি অচলসহ চিকিৎসাসংক্রান্ত নানা জটিলতায় তারা পড়তে পারে। তাছাড়া প্রতিদিন এক জায়গায় আটকে থাকতে থাকতে এদের কেউ কেউ বিরক্ত হয়ে নিজেই নিজেকে নির্যাতন করতে শুরু করে। যেমন- দেয়ালে মাথা ঠোকা, নিজেকে কামড়ানো অথবা নিজের চোখে আঘাত করা। কিছু পরিবার এ সময় শিশুদের বিছানায় আটকে রাখে বা ঘরে কিছুর সঙ্গে বেঁধে রাখে। এসব অভিভাবককে বোঝাতে হবে, বিদ্যালয়ে নতুন পরিবেশে এ শিশুরা বাড়িতে আটকে থাকার চেয়ে শারীরিক নড়াচড়ার বেশি সুযোগ পাবে এবং কিছু না হোক শারীরিকভাবে ভালো অনুভব করবে। তাছাড়া অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে, তারা যেন প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এ শিশুদের যথাসম্ভব স্বাধীনভাবে বাস করতে দেন এবং যাতে তারা বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে জীবন সংগ্রামের দক্ষতা অর্জন করতে পারে। আর পরিবারগুলো যখন তাদের প্রতিবন্ধী শিশুকে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসতে শুরু করবে, তখন তারা অন্যদের দেখাদেখি খাপ খাইয়ে নেয়ার উপায় খুঁজে পাবে। এভাবে সামাজিক কর্মকাণ্ড যেমন- বিয়ে, মেলা, সার্কাস, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এ শিশুদের অংশগ্রহণের ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে। এসব শিশুর অনেকেই নৃত্য, সঙ্গীত ও চিত্রকলায় বিশেষভাবে সফল হতে পারে। সব পরিবারের উচিত অন্তত সেই সম্ভাবনাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা। অল্প বয়সেই তাদের বিদ্যালয়ে নিয়ে আসা উচিত, কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সমস্যাও বাড়তে থাকে এবং অন্য কোনো সম্ভাবনা বিকশিত হওয়ার সুযোগটাও নষ্ট হয়ে যায়।

এটি সহজেই অনুমান করা যায় যে, অন্য অনেকের মতোই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও সমাজে প্রচলিত দীর্ঘদিনের ধ্যান-ধারণার কারণে প্রতিবন্ধী শিশুদের কাছ থেকে বেশি কিছু প্রত্যাশা করেন না। আমাদের শিক্ষকদের বুঝতে হবে, প্রতিবন্ধী শিশুদের কেউ কেউ হয়তো পড়াশোনায় খুব বেশি অগ্রগতি নাও দেখাতে পারে; কিন্তু তারা বিদ্যালয়ে আসার কারণে চলাফেরা, যোগাযোগ ও সর্বোপরি সামাজিকতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে। এসব শিশু নিয়ে যে পাঠ কিংবা কর্মপরিকল্পনাই শিক্ষকরা নেন না কেন, যে বিষয়টা কখনও ভুলে গেলে চলবে না তা হল, এসব শিশুর প্রতিবন্ধিতার ধরন ও প্রয়োজনীয় চাহিদা বিবেচনায় রেখে অন্য শিশুরা যেসব সুবিধা পায়, সেসব সুবিধা পাওয়ার অধিকার এ প্রতিবন্ধী শিশুদেরও আছে এবং তারা সেগুলো নিশ্চিত করছেন।

দেশের বেশিরভাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হুইল চেয়ার নিয়ে প্রবেশ করা যায় এমন ঢালু রাস্তা বা র‌্যাম্প তৈরি করা হয়েছে, নবনির্মিত ঘরগুলোর দরজাও আগের চেয়ে চওড়া করা হয়েছে। ব্ল্যাকবোর্ডগুলো সব শিশুর দৃষ্টিসীমার মধ্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। শহরে কিংবা গ্রামের সব বিদ্যালয়ে ঢোকার রাস্তাগুলো বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উদ্যোগে ও স্বেচ্ছাশ্রমে সমাজের মানুষের মাধ্যমেই আরেকটু ভালো করা যায়, যাতে যে কোনো হুইল চেয়ার বা এরকম সহায়ক কিছু নিয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশু একাই যাওয়া-আসা করতে পারে। শহরকেন্দ্রিক কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতল ভবন আছে, যেখানে শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুর পক্ষে ওঠা মুশকিল কিংবা একেবারেই অসম্ভব। শিক্ষকদের উচিত যে ক্লাসে এমন শিশু আছে সেই ক্লাসটি নিচতলায় সরিয়ে নেয়া, যাতে সবাই সহজে অংশগ্রহণ করতে পারে। তাছাড়া সব ধরনের বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটু বিশেষ নজর দিতে হবে, যেন প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য সহজে বিশুদ্ধ খাবার পানি ও নিরাপদে পায়খানা ব্যবহারে কোনো সমস্যা না হয়।

শিশুদের জন্য খেলাধুলা বিদ্যালয়ের দিনগুলোর অন্যতম ভালো অভিজ্ঞতা। সুযোগ পেলে প্রতিবন্ধী শিশুও খেলা, বন্ধুত্ব, সহযোগিতা থেকে আনন্দ নিতে পারে এবং এতে তারা বিদ্যালয়ে আসতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠবে। শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে কিছু সময়ের জন্য সব শিশুর অংশগ্রহণে যৌথ খেলাধুলার ব্যবস্থা করা হলে তাতে ভালো ফল মিলতে পারে। শিক্ষকদের উচিত এ শিশুদের সঙ্গে আলোচনা করে খেলাধুলায় তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং তারা যেন তাদের পছন্দ-অপছন্দ প্রকাশের সুযোগ পায় সেদিকে লক্ষ রাখা। অন্য শিশুদের বলতে হবে তারা যেন তাদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বন্ধুদের সঙ্গে একটু ধৈর্য সহকারে ভালো আচরণ করে, তাদের খেলতে সাহায্য করে এবং একসঙ্গে সময় কাটায়। তাদের বোঝাতে হবে তারা যেন সবার মতামতের প্রতি সম্মান দেখায় এবং প্রতিবন্ধী বন্ধুর ভালো কিংবা খারাপ লাগার প্রতি সংবেদনশীল হয়। অন্য শিশুদের আচরণের এটুকু পরিবর্তনই প্রতিবন্ধী শিশুর আÍবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দেবে। সব শিশুরই জানা উচিত যে, একে অপরের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগের মাধ্যমে প্রত্যেকেই উপকৃত হবে। তাছাড়া তাদের বোঝাতে হবে, আমরা প্রত্যেকেই একে অপরের থেকে কোনো না কোনোভাবে ভিন্ন; কিন্তু সেজন্য আমরা কাউকে অবহেলা করি না, কষ্ট দিই না। শিক্ষকদের পক্ষে স্বাভাবিকভাবেই খেলার মাঠে সবকিছু খেয়াল রাখা সম্ভব নয়। নিজের ক্লাসের বন্ধুদেরসহ বড় ক্লাসের সব শিশুকে মনে করিয়ে দিতে হবে যে, বিশেষ শিশুদের সুরক্ষায় তাদের দায়িত্ব আছে এবং তাদের উপস্থিতিতে এ শিশুগুলো যেন কোনো ঝুঁকিতে না পড়ে অথবা তারা নিজেরাই যেন কোনো রকম নির্যাতন না করে।

এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের বেশিরভাগ পরিবারের পক্ষে প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য বাড়তি খরচ বহন করা সম্ভব নয়। আবার এমনও দেখা যায়, প্রতিবন্ধী শিশুর পিতামাতা/আভিভাবক অনেক সময় জানে না সরকারের সমাজকল্যাণ অধিদফতরের জেলা শাখায় নথিভুক্তি সাপেক্ষে এ শিশুরা মাসিক প্রতিবন্ধী ভাতা পেতে পারে। উপজেলা/জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উচিত ওই ভাতা পেতে সব শিশু ও তাদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া। ভাতার পরিমাণ অল্প হলেও বিদ্যালয়ে যাওয়ার ফলে তারা এ সুবিধা পাচ্ছে- সমাজে এ ধারণা দেয়া গেলে অন্যরাও এতে উৎসাহিত হতে পারে।

এসব শিশুর প্রতি সমতা ও সুবিচার প্রতিষ্ঠায় শিক্ষকদের পুনঃপুনঃ অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে হবে। তাই তাদের মনোভাব পাল্টানো এ মুহূর্তের একটা বড় কাজ। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দেখা গেছে উপযুক্ত প্রশিক্ষণে শিক্ষকদের দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে বদলে যায় এবং তারা কীভাবে সফলতার সঙ্গে শ্রেণীকক্ষের কার্যক্রম সমন্বয় করে সব শিশুর জন্য শিক্ষণীয় ও আনন্দদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হন। আমাদের মনে রাখা উচিত, এটা কোনোমতেই সরকার কিংবা শ্রেণী শিক্ষকদের একার দায়িত্ব নয়। এক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাগুলো নতুন পরিকল্পনা প্রণয়ন করে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারে। এরকম সফল কর্মসূচি এদেশেই বিদ্যমান আছে। সরকারের উচিত তাদের আরও উৎসাহিত করা ও অন্য সংস্থাগুলোকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একীভূত শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ অনুরোধ করা। সুশীলসমাজ, দেশী-বিদেশী সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ শিক্ষা বিভাগ- সবাইকে আরও বেশি করে জনমত গঠন, শিক্ষা কর্মসূচি প্রণয়ন ও একীভূত শিক্ষাসহায়ক পরিবেশ তৈরিতে সরাসরি ভূমিকা রাখতে হবে।

লেখক: উৎপল মল্লিক, শিক্ষা গবেষক।

আপনার মন্তব্য দিন