এমপিও জালিয়াত চক্রের হাতে জিম্মি বলরামপুর স্কুলের শিক্ষকরা, উদ্ধার করবে কে? - এমপিও - দৈনিকশিক্ষা


এমপিও জালিয়াত চক্রের হাতে জিম্মি বলরামপুর স্কুলের শিক্ষকরা, উদ্ধার করবে কে?

যশোর প্রতিনিধি |

একটি জালিয়াত চত্রের কাছে জিম্মি হয়েছে পড়েছেন যশোর সদর উপজেলার বলরামপুর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মচারীরা। দীর্ঘ ২৩ বছর পর এপ্রিল মাসে প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হলেও শিক্ষক-কর্মচারীরা এমপিওভুক্তির আবেদন করতে পারছেনা। এমপিওভুক্তি আবেদনের পাসওয়ার্ডসহ সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কুক্ষিগত রাখার অভিযোগ উঠেছে চক্রটির বিরুদ্ধে। একইসাথে জালিয়াতি করে ১১ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে৷ তাই এমপিওবঞ্চিত হচ্ছেন আগে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরা। এই চক্রের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে সদর উপজেলার বলরামপুর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। স্কুলটির এসএসসি, জেএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করছে। এমপিওভুক্তর জন্য সব যোগ্যতা অর্জন করে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট কতিপয় ব্যক্তির অসৎ উদ্দেশ্যে হাসিল করার জন্য নানা রকম ফন্দি ফিকির করতে থাকে। তারা জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নেয়।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ মতে, বিদ্যালয়ের সভাপতি এম এম আকরাম হোসেন ওরফে খিদির বিশ্বাস এবং সদর উপজেলার মাহিদিয়া আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ ফারুক হোসেন অবৈধভাবে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে এমপিওভুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে সহায়তা করার অভিযোগ যশোর সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরে বিরুদ্ধে। আর এই তিনজনের যৌথ প্রযোজনায় প্রকৃত শিক্ষক-কর্মচারীরা এমপিওভুক্তি হতে পারছেন না। অথৈ বিপদ থেকে তাদেরকে কে উদ্ধার করতে পারবেন তা খুঁজে খুঁজে হয়রান শিক্ষকরা। 

ভুক্তভোগী শিক্ষক-কর্মচারিরা দৈনিক শিক্ষাডটকমকে বলেন, অভিযুক্তরা ১১জন শিক্ষক-কর্মচারীকে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ দিয়ে এমপিওভুক্তি করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এই ১১জনের নিয়োগের জন্য কোন বোর্ড করা হয়নি। এমনকি জাল স্বাক্ষর দিয়ে কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছে। যে কারণে বৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত সাত শিক্ষকও এমপিওভুক্ত হতে পারেনি। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৩জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ পান। কিন্তু বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ চারজনকে বরখাস্ত করেন। বরখাস্ত হওয়া ওই চার শিক্ষক যশোর সদর সহকারী জজ আদালতসহ উচ্চ আদালতে (হাইকোটে) রিট পিটিশন দাখিল করেন। বাকী নয় জনের মধ্যে দুই জন অন্য বিদ্যালয়ে চাকরি নিয়ে চলে যান। অবশিষ্ট সাত জন শিক্ষক বিদ্যালয়টিতে নিয়মিত ক্লাস করাতেন। এ বছর স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী এবং পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে এমপিওভুক্তর জন্য সকল যোগ্যতা অর্জন করে। নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্তির তালিকাভুক্তও হয়। কিন্তু ওই জালিয়াতি চক্রটি অসৎ উদ্দেশ্যে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার জন্য বিচারাধীন পদসহ শূন্য ও সৃষ্ট পদে ১১জনকে নিয়োগ দেয়। জালিয়াত চক্রটির কারণেই বিধিসম্মতভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত সাত শিক্ষক এমপিওভুক্ত হতে পারেননি।

শিক্ষকরা দৈনিক শিক্ষাডটকমকে আরও বলেন, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের সব জাল-জালিয়াতির কাগজপত্র তৈরি করে দেন সদর উপজেলার মাহিদিয়া আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ ফারুক হোসেন। তাকে সহযোগিতা করেন সভাপতি এম এম আকরাম হোসেন ওরফে খিদির বিশ্বাস। চক্রটি জালিয়াতি করে অলিউল্লাহকে প্রধান শিক্ষক, একেএম সামসুল আলমকে সহকারী শিক্ষক (বাণিজ্য), মনিরুজ্জামানকে সহকারী শিক্ষক (গণিত), আরিফ হোসেনকে সহকারী শিক্ষক (ইসলাম শিক্ষা), বিধান কুমার দত্তকে সহকারী শিক্ষক (হিন্দু ধর্ম), আবু সাঈদকে সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার), চেহেলা জান্নাতকে অফিস সহকারী, ফরহাদ হাসানকে দপ্তরী, সাজ্জাদ হোসেনকে নৈশ প্রহরী ও আব্দুল মাজেদকে পিয়ন পদে নিয়োগ দিয়েছেন। 

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে ফারুক হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দৈনিক শিক্ষাডটকমকে বলেন, আমার প্রতিষ্ঠান থেকে বলরামপুর বিদ্যালয়ের দূরত্ব ২০ কিলোমিটার। আমি ওই প্রতিষ্ঠানের কেউ না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, আমি এমপিওভুক্তির জন্য সহযোগিতা করেছিলাম। তবে নিয়োগ-বাণিজ্যের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।

জানা গেছে, বিদ্যালয়ের সভাপতি এম এম আকরাম বিশ্বাস ওরফে খিদির বিশ্বাস তার পুত্রবধূকে বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী ও ছেলেকে পিয়ন পদে নিয়োগ দিতে এসব জাল-জালিয়াতি করেছেন। আর বিদ্যালয়ের কেরানি নূর ইসলামকে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ দিয়েছেন। সভাপতি আকরাম বিশ্বাস ও সহকারী প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান চাচা-ভাইপো মিলে এসব করেছেন।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে এম এম আকরাম বিশ্বাস ওরফে খিদির বিশ্বাস দৈনিক শিক্ষাডটকমকে বলেন, আমি ডায়াবেটিক রোগী। আমি অসুস্থ মানুষ। আমার বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ করা হচ্ছে সব মিথ্যা বলে তিনি ফোন কেটে দেন।

শিক্ষক নিয়োগের দুর্নীতি সম্পর্কে জানতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর সাথে দৈনিক শিক্ষাডটকমের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, এমপিওভুক্তির জন্য কেউ আমার কাছে কোন কাগজপত্র পাঠায়নি। আমার বিরুদ্ধে একটি গ্রুপ আছে। তারা আমার নামে এসব বলে বেড়াচ্ছে। আমি কোন অন্যায়ের সাথে নেই। আমার কোন স্বাক্ষর কিম্বা কোন রেকর্ড নেই। আমি এ জেলায় ২৪ বছর ধরে চাকরি করছি।

জেলা শিক্ষা অফিসার এ এস এম আব্দুল খালক এ বিষয়ে দৈনিক শিক্ষাডটকমকে বলেন, বলরামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় নিয়ে অভিযোগের বিষয়টি আমরা জানি। লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত চলছে। তদন্তে সত্য উঠে আসবে। বৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রকৃত শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তি করা হবে। কেউ অবৈধভাবে এলে তাদের এমপিও তালিকায় নাম দেয়া হবে না। অভিযোগ তদন্তে ইতমধ্যে কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তদন্ত কমিটির সভাপতি জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক এ কে এম গোলাম আযম দৈনিক শিক্ষাডটকমকে বলেন, সব কাগজপত্র দেখে প্রকৃত শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির জন্য সুপারিশ করা হবে। অবৈধভাবে কাউকে শিক্ষক-কর্মচারী তালিকায় রাখা হবে না। তদন্ত শুরু হয়েছে। আশা করা যায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাচাই করে দ্রুত রিপোর্ট দেয়া সম্ভব হবে।

তবে, প্রথমে গঠিত তদন্ত কমিটিকে বাদ দিয়ে নতুন কমিটি করার পেছনেও  এ চক্রটির হাত রয়েছে বলে জানা যায়। তিন সদস্যের নতুন তদন্ত কমিটির অন্তত একজনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এবং তার সঙ্গেই উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সখ্য রয়েছে বলে যশোরের সবাই জানেন। তাছাড়া প্রথম গঠিত তদন্ত কমিটি কেন বাদ দেয়া হলো তাও এক রহস্য। একটা ডিও লেটারের নানামূখী ব্যবহার করেছে এ চক্রটি।  




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram - dainik shiksha Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে - dainik shiksha একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে please click here to view dainikshiksha website