আমাদের সঙ্গে থাকতে দৈনিকশিক্ষাডটকম ফেসবুক পেজে লাইক দিন।


কমছে গবেষণা বাড়ছে ব্যয়

রাকিব উদ্দিন | ডিসেম্বর ৫, ২০১৭ | পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়

দেশে উচ্চ শিক্ষায় গত আট বছরে একাডেমিক গবেষণা কমেছে। তবে এ খাতে বেড়েছে ব্যয়। ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের গবেষণা বিষয়ক প্রকল্প ও এ খাতে ব্যয় সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
একই বছর কলা ও মানবিক, সামাজিক বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞান ও কারিগরিতে একাডেমিক গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) মোট প্রকল্প ছিল ৩৭০টি। এর মধ্যে অর্থপ্রাপ্ত প্রকল্প (গবেষণার বিষয়) ছিল ২৩১টি। ২০১০ সালে কলা ও মানবিক, সামাজিক বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞান ও কারিগরি উচ্চ শিক্ষায় গবেষণায় মোট ব্যয় হয়েছিল ৭২ লাখ ৩৩ হাজার ৯৭১ টাকা। এর মধ্যে বিশেষজ্ঞদের সম্মানী ছিল ৯ লাখ ৪৯ হাজার টাকা।

সম্প্রতি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে দেয়া ইউজিসির একটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞান ও কারিগরিতে একাডেমিক গবেষণায় চলমান প্রকল্প ছিল ২২০টি। নতুন কিছু প্রকল্পসহ গত বছর অর্থ পাওয়া যায় ২৭৯টি প্রকল্প থেকে। ২০১৬ সালে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞান ও কারিগরি গবেষণায় মোট ব্যয় হয় দুই কোটি ২১ লাখ ৪৪ হাজার ১৭৩ টাকা। এর মধ্যে বিশেষজ্ঞ সম্মানী দেয়া হয় ১২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা।

ইউজিসির গত ৫ নভেম্বরের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১১ সালে প্রকল্পের অনুকূলে ইউজিসির গবেষণা খাতে মোট ব্যয় হয় ৭১ লাখ ২২ হাজার ১৯৭ টাকা। এর মধ্যে বিশেষজ্ঞদের সম্মানী ভাতা ছিল আট লাখ ৬৮ হাজার টাকা। ২০১১ সালে কমিশনের চলতি প্রকল্প ছিল ৩৬৪টি, যেগুলোর মধ্যে অর্থপ্রাপ্ত প্রকল্প ছিল ২২৬টি।

২০১২ সালে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে ইউজিসির একাডেমিক গবেষণায় ব্যয় হয় ৮০ লাখ ৬০ হাজার ৬৩০ টাকা। এর মধ্যে বিশেষজ্ঞদের সম্মানী ভাতা ছিল ৯ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। ওই বছর চলতি প্রকল্প ছিল ৩৫২টি এবং অর্থপ্রাপ্ত প্রকল্প ছিল ২২৯টি।
২০১৩ সালে কমিশনের প্রকল্পের বিপরীতে একাডেমিক গবেষণায় ব্যয় হয় মোট এক কোটি ৫৯ লাখ তিন হাজার ২৫৮ টাকা, যার মধ্যে বিশেষজ্ঞদের সম্মানী ভাতা ছিল আট লাখ ২২ হাজার টাকা। ওই বছর চলতি প্রকল্প ছিল ৩১৯টি এবং নতুন গৃহীত প্রকল্পসহ অর্থপ্রাপ্ত প্রকল্প ছিল ৩২৫টি।

২০১৪ সালে কমিশনের একাডেমিক গবেষণায় মোট ব্যয় হয় এক কোটি ৬৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬৮১ টাকা। এর মধ্যে বিশেষজ্ঞ সম্মানী ছিল পাঁচ লাখ ৪১ হাজার টাকা। ওই বছর চলতি প্রকল্প ছিল ৩৩২টি এবং অর্থপ্রাপ্ত প্রকল্প ছিল ২৪৩টি।
২০১৫ সালে কমিশনের একাডেমিক গবেষণায় মোট ব্যয় হয় ৮৪ লাখ ৮৮ হাজার ৫৮৩ টাকা। এর মধ্যে বিশেষজ্ঞ সম্মানী ছিল দশ লাখ ১৪ হাজার টাকা। ২০১৫ সালে চলতি প্রকল্প ছিল ২০৯টি এবং অর্থপ্রাপ্ত প্রকল্প ছিল ১৬৮টি।

এভাবে ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতি বছরই প্রকল্পের সংখ্যা কমেছে। কমেছে গবেষণার ক্ষেত্রও। কিন্তু বেড়েছে ব্যয়। এজন্য গবেষণার মান, আদৌ গবেষণা হয়েছে কি না এবং ব্যয় বৃদ্ধির কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষাবিদরা। দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার জন্য মঞ্জুরি কমিশনের কাছ থেকে খুব একটা অনুদান পাচ্ছে না বলে জানা গেছে।

প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গবেষণায় ‘চলতি প্রকল্প’ ২০১০ সালের চেয়ে ২০১৬ সালে ১৫০টি কম ছিল। তবে অর্থপ্রাপ্ত প্রকল্প ২০১৬ সালে ৪৮টি বেশি ছিল। কিন্তু সাত বছরে অর্থ ব্যয়ের ব্যবধান অনেক। ২০১০ সালের চেয়ে গত বছর গবেষণায় মোট ব্যয় প্রায় দেড় কোটি টাকা বেশি ব্যয় হয়েছে। এছাড়া বিশেষজ্ঞ সম্মানীও ব্যয় হয়েছে তিন লাখ ২৪ হাজার টাকা বেশি। ২০১০ সালের পর প্রায় প্রতি বছরই একই চিত্র দেখা গেছে।

এই প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, ‘২০১০ সালের চেয়ে এই সময়ে সরকারি-বেসরকারি বেশ কয়েকটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এজন্য গবেষণায় ব্যয় বেড়েছে। আর কিছু ইউনিভার্সিটির গবেষণা শেষ হয়েছে, তারা আবার তা শুরু করছেন। কেউ কেউ নতুন গবেষণায় কাজ করছেন। এই কার্যক্রমও পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

এই প্রতিবেদনটি পূর্ণাঙ্গ নয়- জানিয়ে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবদুল মান্নান আরও বলেন, ‘আমরা উচ্চ শিক্ষায় গবেষণার ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করব।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউজিসি’র সাবেক একজন চেয়ারম্যান বলেন, ‘পছন্দের শিক্ষকদের দিয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ, সভা-সেমিনার ও কর্মশালার নামেই সিংহভাগ অর্থ ব্যয় হয়। দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতাও এখন আর থাকে না। এজন্য যথাযথ গবেষণা হচ্ছে না। কিন্তু সম্মানী নেয়া হচ্ছে, দেয়া হচ্ছে।’

সাবেক চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘অনেক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার জন্য ইউজিসির কাছ থেকে অর্থ নিয়ে যথাযথভাবে কাজ করেন না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও একই কাজ করছে। এই ধরনের কাজ ভালোভাবে তদারকি করা প্রয়োজন।’

গবেষণার জন্য সরকারের অনুদান পাচ্ছেন কী না জানতে চাইলে শিক্ষাবিদ ও দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ‘নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি’র (এনএসইউ) উপাচার্য প্রফেসর ড. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘গবেষণার জন্য ইউজিসির কাছ থেকে আমরা কোন অনুদান পাচ্ছি বলে আমার জানা নেই। যদি পেয়েও থাকি সেটা একেবারে ন্যূনতম। কারণ আমরা নিজস্ব অর্থেই যাবতীয় গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করি। আমাদের গবেষণাও হয় সর্বোচ্চ মানের।’

উচ্চ শিক্ষার প্রকল্পে অনিয়ম : খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইউজিসির নিজস্ব কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন বেসরকারি ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়/প্রতিষ্ঠানের জনবলের দক্ষতা বৃদ্ধি ও বিভাগীয় কাজে গতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে কমিশনের আইএমসিটি বিভাগের উদ্যোগে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৬৭৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। তবে উচ্চ শিক্ষায় গবেষণা ক্রমশ কমতে থাকায় ওই প্রশিক্ষণের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বরাদ্দকৃত অর্থের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে ইউজিসির অধীনে বাস্তবায়ন হওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যাপারে সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘প্রকল্পের অর্থ যে অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ থাকবে সেই অর্থবছরেই ব্যয় করতে হবে। ব্যয় করতে অপারগ হলে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের আওতাধীন সব প্রকল্পের অব্যয়িত অর্থ প্রতি অর্থবছর শেষে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়। কিন্তু অনেক প্রকল্পে এ আর্থিক বিধি প্রতিপালিত হচ্ছে না।’
জানা গেছে, ইউজিসি নিজস্ব বাজেট এবং দাতা সংস্থার ঋণের টাকায় বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় আর্থিক সহায়তা করে। এই সহায়তার একটি বড় অংশ করা হয় ‘হায়ার এডুকেশন কোয়ালিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট’র (হেকেপ) অধীনে বিভিন্ন উপ-প্রকল্পের মাধ্যমে।

কিন্তু কেনা কাটায় গুরুতর অনিয়মের কারণে গত ফেব্রুয়ারি ‘হেকেপ’র আওতায় ব্যয়িত চার হাজার ২৭৩ ইউএস ডলার (প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা) অননুমোদন যোগ্য হিসেবে ঘোষণা করে ওই অর্থ ফেরত চায় বিশ্বব্যাংক। ‘হেকেপ’ প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কিত তথ্যাদি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে নিয়মিত প্রেরণ করা হয় না বলেও মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে ইউজিসি মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, মূল প্রকল্পের আওতায় গৃহীত বিভিন্ন উপ-প্রকল্প বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হচ্ছে। এসব উপ-প্রকল্প থেকে নিয়মিত তথ্যাদি ইউজিসিকে দেয়া হচ্ছে না। এর ফলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নিয়মিত তথ্য অবহিত করা সম্ভব হয় না।

ইউজিসির প্রকল্পগুলোর ব্যাপারে গত ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘প্রকল্পের কার্যক্রমের যথাযথ মনিটরিং না হওয়ার ফলে বাস্তবায়ন বিঘিœত হচ্ছে। প্রতিটি প্রকল্পের আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) এবং প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি (পিএসসি) গঠিত হলেও এ সকল কমিটির সভা নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয় না। ফলে প্রকল্পের প্রকৃত আর্থিক ও ভৌত অগ্রগতি এবং উদ্ভূত বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সবাই অবহিত থাকে না।’

সর্বশেষ গত ২৫ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়, ‘গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মঞ্জুরি কমিশনের বিভিন্ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি মাত্র ৫ শতাংশ।’

জানা গেছে, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে মঞ্জুরি কমিশনের অধীনে বাস্তবায়নাধীন সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি হলো- ‘হেকেপ’। ২০০৯ সালে বাস্তবায়ন শুরু হওয়া এই প্রকল্পের এখন তৃতীয় পেইজ বাস্তবায়ন হচ্ছে, যা ২০১৮ সাল নাগাদ শেষ হবে। এই প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় দুই হাজার ৫৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা, যার ৮৭ শতাংশ অর্থের যোগান দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক এবং বাকি ১৩ শতাংশ দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। মূলত এই প্রকল্পের অর্থায়নেই সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা চলছে।

দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেশি। বেসরকারিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেশি। নতুন ও পুরনো মিলে বর্তমানে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৯৫টি এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ৪০টি।

 

সূত্র: সংবাদ

আপনার মন্তব্য দিন