কুমিল্লায় ঈগল গ্রুপের বখাটেরা বেপরোয়া - বিবিধ - Dainikshiksha


কুমিল্লায় ঈগল গ্রুপের বখাটেরা বেপরোয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক |

কুমিল্লা নগরীতে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা কিশোর গ্যাং 'ঈগল' বাহিনীর হাতে প্রাণ গেছে মডার্ন স্কুল থেকে এ বছরই এসএসসি পাস করা আজমাইন আদিলের। ১৪ মে রাতে নগরীর মোগলটুলি এলাকায় মোটরসাইকেলে ধাক্কা লাগাকে কেন্দ্র করে বাগ্‌বিতণ্ডার একপর্যায়ে ওই গ্যাংয়ের সদস্যদের ছুরিকাঘাত ও দায়ের কোপে খুন হয় সে। এ ঘটনার ২২ দিন আগে শবেবরাতের রাতে মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে নগরীর ঠাকুরপাড়া এলাকায় স্কুলের সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বের জেরে ছুরিকাঘাতে খুন হয় একই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির মুমতাহিন হাসান মিরন। বুধবার (৮ আগস্ট) সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

আর ২০১৮ সালের ১১ জুলাই প্রেম-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে ধর্মসাগরপাড়ের নগর উদ্যানে ছুরি দিয়ে খুন করা হয় কুমিল্লা অজিত গুহ মহাবিদ্যালয়ের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিহাব উদ্দিন অন্তুকে। এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরা সবাই কিশোর। তারা কোনো না কোনো গ্যাংয়ের সদস্য। এরা নিজেদের 'গ্যাং' বলেই ভাবতে চায়। এসব গ্রুপের অধিকাংশ কিশোর জড়িয়ে পড়ছে ছিনতাইসহ নানা অপরাধে, মাদকের নেশা ও ব্যবসায়।

নগরীতে নানা নামে এরা বেপরোয়া। ঈগল, ব্ল্যাক ড্রাগন, ডি-ডব্লিউ, নাইট ডেভিলস, বিডি, সিজেএম-২, কেডি, ব্যাক রেঞ্জারস, ব্ল্যাক সেডো, কেএনএক্সটি, আরজিএস, র‌্যাক্স, এলআরএন, সিএমএইচ, মডার্ন, বক্সার, ডিস্কো বয়েজ, বসসহ ২০টির অধিক গ্যাং রয়েছে এ নগরীতে। 

এসব গ্রুপের সদস্যরা তুচ্ছ ঘটনায় বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। আর এতেই ঘটছে একের পর এক প্রাণহানির মতো ভয়ঙ্কর ঘটনা। এরা বয়সে সবাই কিশোর-তরুণ। একই স্কুলে লেখাপড়া, একই পাড়া-মহল্লায় বসবাস। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সূত্রে এরা গ্রুপ তৈরি করে। গড়ে তোলে ভিন্ন ভিন্ন বাহিনী। যাকে বলা হচ্ছে গ্যাং। নিজেদের মধ্য থেকেই এসব গ্রুপের লিডারও রয়েছে। তারা কমবেশি সবাই ফেসবুকে আসক্ত। মাদকের নেশার মধ্যে গাঁজা, ইয়াবা ও ধূমপানেই বেশি আসক্তি। এসব গ্যাংয়ের মধ্যে ঈগল ও আরজিএস সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। কার চেয়ে কে বেশি শক্তিশালী বা প্রভাবশালী, তা প্রমাণ করতে তারা মুহূর্তেই জড়িয়ে পড়ে বিরোধে। আর প্রতিযোগিতা চলে সদস্য বাড়ানোর। নগরীর মোগলটুলি এলাকার ঈগল গ্যাং সদস্য দুইশ'রও বেশি। এদের আচার-আচরণও উগ্র প্রকৃতির। কুমিল্লা হাই স্কুল ও জিলা স্কুলের অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির ছাত্র সদস্যই বেশি।

কেউ বাহিনীতে যোগ না দিলে মোবাইল কেড়ে নেওয়া, টিফিনের টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেওয়া, টিফিন ছিনিয়ে খেয়ে ফেলাসহ শারীরিক নির্যাতন চালায় বাহিনীর সদস্যরা। কুমিল্লা মডার্ন হাই স্কুলের শিক্ষার্থীরা আরজিএস গ্যাং গড়ে নগরীর নজরুল এভিনিউ, তালপুকুর এলাকা, বাগিচাগাঁও, কান্দিরপাড়, ঝাউতলা, ঠাকুরপাড়ায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে কাজ করছে। কুমিল্লা কালেক্টরেট স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের গ্যাং গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে রাজগঞ্জ ও উজির দীঘিরপাড় এলাকা। এদের অনেক সদস্যেরই স্কুলব্যাগে ধারালো ছুরি থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। সঙ্গে গাঁজা ও সিগারেটও। চায়ের দোকান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনের সড়ক, বিভিন্ন শপিংমলের আশপাশে এরা ঘোরাঘুরি করে। চায়ের দোকানগুলোয় বিকেল থেকে রাত অবধি চলে আড্ডা। নগরীর প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড়, টাউনহল মাঠ ও এর আশপাশের বিভিন্ন চা দোকান ও হোটেলজুড়েই তাদের আধিপত্য। মেয়েদের স্কুল ছুটির সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে উত্ত্যক্ত করা এদের নিয়মিত রুটিন কাজ। ইবনে তাইমিয়া স্কুল ও কুমিল্লা কমার্স কলেজের শিক্ষার্থীদেরও রয়েছে নিজস্ব গ্যাং। 

এসব গ্রুপের মধ্যে বিভিন্ন বিরোধে গত দুই বছরে খুন হয়েছে ছয় কিশোর। আহত হয়েছে অন্তত ৫০ জন। তিনটি খুনের অন্যতম হচ্ছে- এ বছরের ১০ মার্চ নগরীর দিশাবন্দ এলাকায় ক্রিকেট খেলায় তর্ক-বিতর্কের জের ধরে সাজ্জাতুল ইসলাম (১৬) নামের এক কিশোরকে নগরী চর্থা এলাকার অপর এক কিশোর ইউসুফ স্টাম্প দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। নিহত সাজ্জাতুল নেউরা হাই স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র। ২১ এপ্রিল নূরপুর এলাকায় দুই কিশোর ছাত্রের ছুরিকাঘাতে গুরুতর জখম হয়ে ২৩ এপ্রিল মারা যান অটোরিকশাচালক শাহজাহান। সামান্য ভাড়া নিয়ে বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটে। ২০১৭ সালের ২৭ মে নগরীর নজরুল এভিনিউ এলাকায় ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ প্রথম বর্ষের শাহাজাদা ইসলামকে কুপিয়ে জখম করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। পরে তিনি মারা যান। আসামিদের সবাই স্কুলছাত্র। ঘটনার পরদিন মডার্ন হাই স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র অপর্ণ আশ্চার্য্য দীপসহ কয়েকজন স্কুলছাত্রকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

এ বছরের শবেবরাতের রাতে মডার্ন হাই স্কুলের মিরন হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কিশোর গ্যাং গ্রুপগুলোর উৎপাত আমলে নেয় পুলিশ; তৎপর হয়। স্কুলে স্কুলে পুলিশের পক্ষ থেকে সচেতনতা সভা, অভিভাবক সমাবেশ করা হয়। এত কিছুর পরও ২২ দিনের মাথায় একই স্কুলের আদিল হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এর ভয়াবহতা প্রকাশ পায়। পুলিশ ও রাজনৈতিক মহল নড়েচড়ে বসে। শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়। এরই মধ্যে অবশ্য সবক'টি খুনেরই আসামিদের ধরে ফেলে পুলিশ। আদিল হত্যার পর কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) তানভির সালেহীন ইমন জানান, নিহত কিশোর আদিল মোটরসাইকেল আরোহী হয়ে আসছিল। আসার পথে তিন-চারজন কিশোরের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। একপর্যায়ে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে তারা। আদিলকে ছুরিকাঘাত করা হয়। এরপর মাথায় দা দিয়ে আঘাত করা হয়। তিনি আরও জানান, কিশোর অপরাধ দমনে নগরীর জিলা স্কুল ও মডার্ন স্কুলসহ একাধিক স্কুলের অভিভাবকদের সঙ্গে সচেতনতামূলক মতবিনিময় করেছে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। কিশোরদের অবাধে চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়েছে। 

এত কিছুর পরও থেমে নেই কিশোর অপরাধ গ্যাংয়ের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। সম্প্রতি আলোচিত দুটি হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশি তৎপরতায় কিছুটা নিশ্চুপ হয়ে আছে বাহিনীর কার্যক্রম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক অভিভাবক লিখেছেন, 'কুমিল্লা এখন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে এই কিশোর গ্যাংয়ের কারণে। রাত ১০টার পর, আঠারো বছরের কম বয়সের ছেলেরা বেপরোয়া গতিতে বাইক নিয়ে টাউনহল, ধর্মসাগরপাড়, নজরুল ইনস্টিটিউট, রানীর কুটির ও রানীর দীঘিরপাড়ে আড্ডা জমাচ্ছে; সিগারেটের ধোঁয়া ওড়াচ্ছে, কেউ কেউ গাঁজাও খাচ্ছে প্রকাশ্যে। প্রচণ্ড বেগে পিকআপ তুলে শহর কাঁপিয়ে মোটরসাইকেল দৌড়াচ্ছে। অভিভাবকরা সচেতন হবেন বলে আমার বিশ্বাস।' আরেকজন লিখেছেন, 'আসুন, গ্যাং কালচারের বিরুদ্ধে একটা সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি, যে যার অবস্থান থেকে। যেভাবে হোক, তাদের সর্বনাশা পথ থেকে ফেরাতে হবেই।'

অধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট আনিছুর রহমান মিঠু বলেন, স্মার্টফোন, মোটরসাইকেলসহ বিলাসী জীবনযাপনে সন্তানদের প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। বাবা-মা-অভিভাবকরা অনেকটা উদাসীন। সন্তান কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে কি-না, প্রাইভেট টিউটর/কোচিংয়ে যাচ্ছে কি-না, তা অবশ্যই খোঁজ নিতে হবে। অভিভাবকদের দায়িত্ব বেড়ে গেলেও তা পালন করতে হবে, মনোযোগ বাড়াতে হবে সন্তানদের প্রতি।

কুমিল্লা কালেক্টরেট স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ নার্গিস আক্তার বলেন, স্কুল ও কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীদের নিয়মিত উপস্থিতির বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। অনিয়মিত হলে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। ছাত্রদের সচেতন করা হচ্ছে। স্কুলের নিয়মকানুন পালনে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। 

কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সালাউদ্দিন বলেন, গ্যাং কালচারের লাগাম টেনে ধরতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি, সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালাচ্ছি। অভিভাবকদেরও ভালো ভূমিকা নিতে হবে। সন্তান কোথায় যায়, কী করে, কার সঙ্গে মেলামেশা করে, নিয়মিত স্কুল-কলেজে যায় কি-না সে বিষয়ে অভিভাবকদের তদারক করার আহ্বান জানান তিনি। 

কুমিল্লা-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার বলেন, কুমিল্লার শান্তি নষ্ট হয় এমন কোনো গ্যাং সৃষ্টি হতে দেওয়া হবে না। কিছু কিছু স্কুলের বখাটে শিক্ষার্থীর গ্যাং তৈরি করে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার খবর উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা যাতে কোনোরকম রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় না পায়, সেদিকে আমাদের নজর রয়েছে। ঘটনার শুরু থেকেই আমরা প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকা নিতে নির্দেশ দিয়েছি। এখন এরা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সব সময় যাতে নিয়ন্ত্রণে থাকে, সে ব্যাপারে পুলিশ সজাগ রয়েছে। অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। 




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
মাদরাসা শিক্ষকদের নতুন এমপিওভুক্তির কার্যক্রম স্থগিত - dainik shiksha মাদরাসা শিক্ষকদের নতুন এমপিওভুক্তির কার্যক্রম স্থগিত প্রাথমিকের বেতন বৈষম্য : প্রধানমন্ত্রীই একমাত্র ভরসা - dainik shiksha প্রাথমিকের বেতন বৈষম্য : প্রধানমন্ত্রীই একমাত্র ভরসা বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা ১৪ অক্টোবর - dainik shiksha বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা ১৪ অক্টোবর এইচএসসি পরীক্ষার সূচি প্রকাশ - dainik shiksha এইচএসসি পরীক্ষার সূচি প্রকাশ কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে - dainik shiksha কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন - dainik shiksha শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website