আমাদের সঙ্গে থাকতে দৈনিকশিক্ষাডটকম ফেসবুক পেজে লাইক দিন।


ছাত্র রাজনীতির সুফল পেতে করণীয়

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান | জানুয়ারি ৪, ২০১৬ | ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি

সম্প্রতি কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ঘটনা ছাত্র এবং শিক্ষক রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এ অবস্থায় ছাত্র রাজনীতি বন্ধ কিংবা শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসার বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা যাবে না।

এক্ষেত্রে যথাযথ সুফল পেতে ছাত্র রাজনীতিকে সঠিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনতে হবে।

ছাত্র রাজনীতি অনেক জায়গায় বন্ধ রয়েছে। ঢাকা শহরের নামী-দামী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি নেই।

ছাত্র রাজনীতি বন্ধ বলতে সেখানে কোনো ছাত্রলীগ নেই, ছাত্রদল কিংবা সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট নেই। তাহলে সেখানে আছে কী? আছে ছাত্রশিবির এবং হিযবুত তাহরীর।

রাজীব হত্যা মামলার ১২ আসামি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আইন করে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করতে পারে। কিন্তু এর পরিণতি হবে ছাত্রশিবির, হিযবুত তাহরীর তথা আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টিগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে জোরালো অবস্থান।

আশির দশকে মাসের পর মাস বিশ্ববিদ্যালয় অনির্ধারিতভাবে বন্ধ থাকতো। ক্যাম্পাসে গোলাগুলিসহ নানা প্রতিকূল অবস্থা থেকে আমরা পরিত্রাণ পেয়েছি। ষাট এবং সত্তর দশকে রাজনীতিতে আদর্শিক একটি বিষয় ছিলো।

সে সময় গোটা বিশ্ব দু’ভাবে বিভক্ত ছিলো। একটি ধনবাদী সমাজ ব্যবস্থা। শোষণহীন সমাজ বিনির্মাণসহ নানা মতাদর্শ চর্চা হতো।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর থেকে শুরু করে ইরানের ইসলামী বিপ্লব, আফগানিস্তানের তালেবান উত্থান-পতন, আল-কায়েদা, আইএস ইত্যাদি ছাড়া আদর্শভিত্তিক কোনো আলোচনা আর নেই। ছাত্র রাজনীতিকে উদ্বুদ্ধ করার মতো কোনো আদর্শ আমাদের সামনে নেই।

বলা হয়ে থাকে, ছাত্র রাজনীতি মূল রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করে। বৈষম্যহীন ন্যায়ভিত্তিক সমাজ কায়েম হবে- এমন আদর্শ ছাত্রদের সামনে উপস্থাপন করা গেলে; ডিজিটাল, মধ্যম এবং ধনী রাষ্ট্রে বাংলাদেশকে পরিণত করার দিকে ছাত্র রাজনীতিকে ধাবিত করলে, তাদের সামনে এক ধরনের আদর্শ কাজ করতো।

কেবল ছাত্রদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমাদের ভবিষ্যত্ কী হবে সে বিষয়ে আমরা সুনাগরিক, সুশীল সমাজ এবং রাজনীতিবিদরা এক হতে পারেনি। ’৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ছিলো।

২০০৭-০৮ সালে গোটা জাতিকে পুন:পাকিস্তানিকরণ বা সামরিক যাঁতাকল থেকে ছাত্র-শিক্ষকরা বাঁচিয়েছে। এদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে দোদুল্যমানতা বা প্রত্যাশিত রায় না পাওয়ার অবস্থা দেখা দেয়, তখন কিন্তু এই ছাত্রসমাজই ‘গণজাগরণ মঞ্চে’র মাধ্যমে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন গড়ে তুলে জাতিকে দিক-নির্দেশনা দিয়েছে। আমি আশাকরি, ভবিষ্যতে দেশের দুর্দিনে এই ছাত্রসমাজই গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করবে। তাদের উপরই আমাদের ভরসা রাখতে হবে।

 

’৯০-এর দশকের পর থেকে ছাত্র রাজনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে- এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। বর্তমানে ছাত্র রাজনীতি অনেক খারাপ পর্যায়ে রয়েছে এমনটি বলা যাবে না। ছাত্র রাজনীতিতে এখন যেসব ঘটনা ঘটছে তা অতীতের ধারাবাহিকতা মাত্র। তবে রাতের পর রাত গোলাগুলি, মাসের পর মাস ক্যাম্পাস বন্ধ থাকার মতো ঘটনা এখন ঘটছে না। কোনো অবস্থাতেই ছাত্রদের রাজনীতিবিমুখ করা যাবে না।

যদি ছাত্ররা নিজেরাই রাজনীতিবিমুখ হয়ে যায়, তাহলে আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম নেতৃত্ব সংকটে পড়বে। রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করতে হবে। সুশীল সমাজ থেকে অনেক কথাই বলা হয়ে থাকে। এমনকি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাজনীতিবিদদের দোষারোপ করা হয়।

শেষ পর্যন্ত আমাদের এটা স্বীকার করতেই হবে, দেশের রাজনৈতিক সমস্যাগুলো রাজনৈতিভাবেই সমাধান করতে হবে এবং রাজনীতিবিদরাই সমাধান করবেন। এজন্য আমাদের তরুণ প্রজন্মদের রাজনৈতিক অনুশীলন বন্ধ করা যাবে না। সঠিক ছাত্র রাজনীতি করার জায়গা তৈরি করে দিতে হবে।

এব্যাপারে ছাত্র রাজনীতি সঠিক নিয়মনীতির মধ্যে আনয়ন করতে হবে। যেমন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, ২৯ বছরের বেশি কেউ ছাত্র রাজনীতি করতে পারবে না।

এ বিধানটি অন্য সংগঠনগুলো অনুসরণ করলে আমরা গুণগত পরিবর্তন পেতাম। এক সংগঠনে ২৯ বছর এবং অন্য সংগঠনে ৪৯ বছরের কেউ সভাপতি— এমন হতে পারে না। কেবল প্রকৃত ছাত্ররা

ছাত্র রাজনীতিতে থাকলে বিশৃঙ্খলা কমতো। ছাত্র রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছাত্র সংসদ। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো আমরা ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে পারিনি।

জাতীয়, স্থানীয় এবং শিক্ষক নির্বাচন হলেও ছাত্র সংসদ নির্বাচন করা হয়নি। ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলে আমরা জাতীয় পর্যায়ে অনেক ভালো নেতৃত্ব পেতাম। এই নেতৃত্বের ফলে আমাদের জাতীয় সংসদের চেহারা পাল্টে যেতো।

এখন রাজনীতিতে শতকরা ৮০ ভাগ ব্যবসাসহ অন্যান্য পেশার লোক। বলা যেতে পারে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গেছে।

ছাত্রদের বয়সসীমা নির্ধারণ, প্রকৃত ছাত্রদের দিয়ে কমিটি গঠন, নিয়মিত কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি বদল হওয়াসহ শৃঙ্খলার মধ্যে ছাত্র রাজনীতিকে আনতে হবে। এখন যার দাপট বেশি সেই দাবি করেন তিনি সংগঠনের হর্তাকর্তা।

নেতারা যদি সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটিতে আসতেন- তাহলে তিনি ভাবতেন, নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, এবছর খারাপ করলে পরের বছর কেউ ভোট দিবে না। তাহলে ছাত্র রাজনীতি ভারসাম্যের মধ্যে আসতো।

যেসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা রয়েছে- আমাদেরকে সেদিকে দ্রুত অগ্রসর হতে হবে। ছাত্ররাই আমাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ বিনির্মাণ করবে এবং ভবিষ্যত্ নেতৃত্ব দিবে- কাজেই একথা চিন্তা করে ছাত্র রাজনীতি করার জায়গা আমাদেরকেই করে দিতে হবে। দলাদলির বিষয় শুধু শিক্ষক এবং ছাত্রদের মাঝে নয়, পেশাজীবী সংগঠন এমনকি সংসদেও আছে।

শুধু ছাত্রদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা ফেরেস্তার মতো হবেন- বাকিরা যার যার মতো থাকবেন এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী আমরা অনেক কিছু দিতে পারছি না। এজন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

কেবল ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বা সরকারের পক্ষে ছাত্র রাজনীতিতে দুর্বৃত্তপনা বন্ধ করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে বিরোধী দলকেও ভূমিকা পালন করতে হবে।

যখন ছাত্রলীগ করার বয়সসীমা ২৯, অবিবাহিতসহ নানা সিদ্ধান্ত নেয়া হলো তখন সব রাজনৈতিক দল একই সিদ্ধান্ত নিলে ছাত্র রাজনীতির চেহারা পাল্টে যেতো। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার চাইলেই পারবে না, এক্ষেত্রে সর্বস্তর থেকে সমর্থন থাকতে হবে।

 

লেখক : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

আপনার মন্তব্য দিন