দেশের উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষা - মতামত - Dainikshiksha


দেশের উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষা

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী |

মানুষের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য যেমন খাদ্যের দরকার, তেমনই সৃষ্টিশীল মনোভাব গড়ে তুলতে প্রয়োজন শিক্ষার। তবে শিক্ষার স্বরূপটি কেমন হলে তা মানুষের কল্পনাশক্তি বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তার বাস্তব জীবনে প্রয়োগের উপযোগী হবে, সেটি নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। আমরা কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে কর্মমুখী শিক্ষার বিষয়টি বলে থাকি। কিন্তু এই কর্মমুখী শিক্ষা কখন থেকে শুরু করা দরকার? হার্ভার্ড গ্রাজুয়েট স্কুল অফ এডুকেশনের অধ্যাপক ননিয়েলেসাউক্স ওস্তেফানিয়েজোন্স ও অন্যান্য গবেষকগণ বলছেন, বিজ্ঞান বা কারিগরি শিক্ষার পরিবেশ শৈশব থেকে শুরু করা দরকার। কেমন হতে হবে এই কারিগরিজ্ঞান। খুব সহজ, জীবনমুখী আর আনন্দের হতে হবে।

আমাদের দেশে জনসংখ্যাকে একসময় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও বর্তমানে বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে জনসংখ্যাকে বলা হচ্ছে জনসম্পদ। এই জনসম্পদ তৈরি হতে পারে কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে। এই বিষয়টি বিবেচনা করে দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে আগামী বছর অষ্টম শ্রেণি থেকে বাধ্যতামূলক কারিগরি শিক্ষা চালু হতে যাচ্ছে। তবে শুরু করার আগেই এর বিভিন্ন দিক বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে। আরেকটি বিষয় আমাদের ভাবতে হবে, কারিগরি শিক্ষায় যারা শিক্ষিত হচ্ছেন, তারা কাজ করার ক্ষেত্রে দক্ষ হয়ে উঠছেন কিনা। এক্ষেত্রে দেশে ও বিদেশে যে শিল্প-কারখানাগুলো রয়েছে সেগুলোর নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করে কী ধরনের কারিগরি শিক্ষার প্রচলন করা হলে তা শিল্পে প্রয়োগযোগ্য হবে, সেটা জানতে হবে।

চলতি বছরের শুরু থেকেই বাড়ছে প্রবাসী আয়। গত মে মাসে দেশের ১৪৮ কোটি ২৮ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ কোটি ৫২ লাখ ডলার বা প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি। তবে সব সংস্থাই একমত যে, ৭০ লাখ প্রবাসীর কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশই নিয়ে যাচ্ছেন বিদেশিরা। এর কারণ হচ্ছে অনেক দক্ষ বিদেশি শ্রমিক উচ্চবেতনে কাজ করছেন বাংলাদেশে। প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে স্বল্প দক্ষ ৫২ শতাংশ, ৩১ শতাংশ দক্ষ, ১৪ শতাংশ আধা-দক্ষ ও মাত্র ২ শতাংশ পেশাজীবী। এই পরিসংখ্যান থেকে একটি বিষয় খুব সহজে বলা যায় তা হলো এই স্বল্পদক্ষ বা আধাদক্ষ শ্রমিকদের যদি আমরা দক্ষ জনগোষ্ঠী হিসেবে বিদেশে পাঠাতে পারতাম, তবে এই রেমিট্যান্স আরও বেড়ে অর্থনীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলত। পৃথিবীর অন্য দেশগুলো যেমন ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন কারিগরি জ্ঞানে দক্ষ করেই জনশক্তি রপ্তানি করছে। ফলে তাদের দক্ষ জনগোষ্ঠীর চেয়ে আমাদের অদক্ষ জনগোষ্ঠী কমপরিমাণে আয় করে। এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কারিগরি শিক্ষাকে বিনিয়োগের একটি মুখ্য উপাদান হিসেবে দেখা দরকার।

আমাদের জিডিপির ১৫ শতাংশ কৃষি নির্ভর। শিল্পায়নে এ হার ২৮ শতাংশ আর সার্ভিস সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে এটি ৫৬ শতাংশ। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ১০ বছরে শিল্পায়নে জিডিপির হার হবে ৩৫ শতাংশ। তবে যদি কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার ও প্রয়োগ যথাযথভাবে ঘটানো যায় তবে তা এ হারকেও ছাড়িয়ে যাবে। একটি কথা বলা হয়- আমরা অর্থনীতিতে ৪৬ তম, কিন্তু কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে ১১৪ তম। বিষয়টি নিয়ে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমান সরকার অনেক বেশি কাজ করছে, যা আশাব্যঞ্জক। কারিগরি শিক্ষায় ইতিবাচক মনোভাব গড়ে না ওঠায় এক্ষেত্রেও শ্রেণিগত নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা কারিগরি শিক্ষাকে সেভাবে গ্রহণ করছে না। ফলে বেকারত্ব বাড়ছে ও সামাজিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। এক সমীক্ষায় জানা যায়, বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৪৭ শতাংশ। অন্যদিকে ২৫-৫৪ বছর বয়সের ৮২ শতাংশ মানুষ কর্মে নিয়োজিত থাকলেও এর মধ্যে মাত্র ৬.৩ শতাংশ উচ্চদক্ষতা সম্পন্ন, ৫৩ শতাংশ মাঝারি দক্ষ এবং ৪০.৭ শতাংশ অদক্ষ। অথচ উন্নত দেশে এ হার ২৫-৭৫ শতাংশ। তবে আনন্দের বিষয় হলো, সরকার কর্মমুখী শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে ৫টি টাস্কফোর্স গঠন করেছে যা হলো- পলিসি ও প্রজেক্ট ফর্মুলেশন টাস্কফোর্স, ইন্ডাস্ট্রি ও ইন্সটিটিউট লিংকেজ টাস্কফোর্স, টিভিইটি এনরোলমেন্ট টাস্কফোর্স, কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট টাস্কফোর্স এবং জবমার্কেট অ্যাসেসমেন্ট ও এমপ্লয়মেন্ট টাস্কফোর্স। যদি এ মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি মানুষকে আগ্রহী করা যায় তবে এ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘একটি বাড়ি, একটি খামার’ প্রকল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের একটি মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এই বিষয়টিকে অন্যভাবেও ভাবা যেতে পারে। যেমন- আমরা একটি বাড়ি ও একটি শিল্পকারখানা এই ধারণা শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিভিন্নস্তরে প্রয়োগ করতে পারি। আমাদের দেশে মোট ৭ লক্ষ থেকে ৮ লক্ষ কুটির শিল্প রয়েছে। এই কুটির শিল্পগুলোকে আধুনিক ধারণায় এনে গ্রামের প্রতিটি মানুষকে কারিগরিজ্ঞানে দক্ষ করে গড়ে তোলা যেতে পারে।

২০০৯ সাল পর্যন্ত আমাদের দেশের ১% লোক কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত ছিল। এখন তা ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আশা করা হচ্ছে, সরকারের কারিগরি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে এই সংখ্যা ২০২০ সালে ২০%, ২০৩০ সালে ৩০% ও ২০৪১ সালে ৫০ শতাংশে রূপান্তরিত হবে। উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার ক্ষেত্রে এটিও একটি অন্যতম উপাদান হিসেবে কাজ করে। আবার একই সঙ্গে নতুন নতুন শিল্পধারণা সৃষ্টি করে সেই শিল্পে মানুষের দক্ষতা তৈরির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে হবে। সারাদেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টি ভাবা হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠলে তা দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে কারিগরি শিক্ষা ও এর মাধ্যমে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

বিভিন্ন পেশায় বর্তমানে ৮৫ হাজার ৪৮৬ জন বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশে কর্মরত রয়েছেন। প্রায় দুই লাখ বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ৪০ হাজার কোটি টাকা নিজ দেশে নিয়ে যাচ্ছেন। এর প্রধান কারণ আমাদের শিল্প উদ্যোক্তাদের কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ দেশীয় জনগোষ্ঠীর উপর আস্থাহীনতা। এই আস্থাহীনতা কিভাবে দূর করা যায়- এই বিষয়টি নিয়েও ভাবতে হবে। একই সঙ্গে ইউরোপ, আফ্রিকাসহ যে দেশগুলোতে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করা যেতে পারে তা খুঁজে বের করতে হবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ, কলামিষ্ট ও ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

 

সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
নভেম্বরের এমপিওর সাথেই ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেয়া হতে পারে - dainik shiksha নভেম্বরের এমপিওর সাথেই ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেয়া হতে পারে এমপিও বাতিল হচ্ছে ১২ শিক্ষক-কর্মচারীর - dainik shiksha এমপিও বাতিল হচ্ছে ১২ শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিওভুক্ত হচ্ছেন কারিগরির ২২৮ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন কারিগরির ২২৮ শিক্ষক বেসরকারি স্কুলে ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ - dainik shiksha বেসরকারি স্কুলে ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ স্ত্রীর মৃত্যুতে আজীবন পেনশন পাবেন স্বামী - dainik shiksha স্ত্রীর মৃত্যুতে আজীবন পেনশন পাবেন স্বামী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website