নিলামে শিক্ষা প্রশাসনের পাঁচ উপপরিচালকের পদ! - কলেজ - Dainikshiksha


নিলামে শিক্ষা প্রশাসনের পাঁচ উপপরিচালকের পদ!

নিজস্ব প্রতিবেদক |

নিলামে উঠেছে শিক্ষা প্রশাসনের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ উপপরিচালকের পদ! নিলামে অংশগ্রহণকারী সবাই বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত সরকারি কলেজ ও মাদরাসা শিক্ষক। কাস্টমার ধরে আনার কাজে গোটা দুয়েক বদলি দালালও রয়েছে। পাঁচটি পদের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের ঢাকা ও রাজশাহী অঞ্চলের উপপরিচালকের ‍দুটি শূন্য পদের দাম উঠেছে সবচেয়ে বেশি। বাদবাকী তিনটি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক শারীরিক শিক্ষা, বিশেষ ও প্রশিক্ষণ শাখার। যা তুলনামূলক কম। এই পদগুলোতে বসতে পারলে রাতারাতি টাকার মালিক হওয়ার নজির রয়েছে। পদগুলোর প্রধান আকষর্ণ বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে ঘুষ পাওয়া। 

শিক্ষাখাতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের মতে, চারটি উপপরিচালকের পদ দীর্ঘদিন পদায়ন না দেয়ায় এখন সর্বোচ্চ দর উঠেছে। শীঘ্রই এ পদগুলোতে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদায়ন দেয়া হবে। এর মধ্যে ডিআইএ হিসেবে পরিচিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের ঢাকা ও রাজশাহী দুটি উপপরিচালক। এই দুটি পদে গত কয়েকবছর যাবত বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের মো: রাশেদুজ্জামানকে রাখা হয়। ৩১ জুলাই তাকে রাঙামাটি সরকারি কলেজে বদলি করা হলেও ১৮ আগস্ট পর্যন্ত নতুন কর্মস্থলে তার যোগদানের খবর পাওয়া যায়নি। তিনি সরকারের দুইজন প্রভাবশালী মন্ত্রীকে দিয়ে তদবির করিয়ে রাঙামাটির আদেশ বাতিল করিয়ে সরকারি মডেল স্কুল ও কলেজ স্থাপন প্রকল্পের উপপরিচালক হিসেবে বদলি হতে চান বলে খবর চাউর হয়েছে। এই প্রকল্পের কার্যালয় শিক্ষা ভবনে। এছাড়া শিক্ষকতা ছেড়ে তিনি উপসচিব হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। সরকারি কলেজ ও মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করার জন্য সরকার তাকে নিয়োগ দিলেও গত ২২ বছরে মাত্র একদিন তিনি শ্রেনিকক্ষে গিয়েছিলেন। বাকী পুরো সময়টাই অফিসে অফিসে কাটিয়েছেন।  ডিআইএত তিনি নতুন ধরণের দুর্নীতির প্রবর্তন করেন মর্মে তারই সহকর্মীরা দৈনিক শিক্ষার কাছে অভিযোগ করেছেন। 

ডিআইএর ঢাকা অঞ্চলের উপপরিচালক পদে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের একজনকে ২৫ লাখ টাকায় চুক্তিবদ্ধ করা হয়েছে মর্মে খবর পাওয়া গেছে। এই পদটিতে শিক্ষা প্রশাসনের বহু বিতর্কিত পদায়নের নেপথ্য নায়ক ‘মোল্লার’ লোক পদায়ন দেয়ার সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত হলেও শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষকর্তাদের কাছে প্রার্থীকে ভিন্ন পরিচয়ে পরিচিত করিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদেরকে বলা হয়েছে, ফরিদপুর অঞ্চলের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর ডিও লেটার ও তদবির রয়েছে এই প্রার্থীর পক্ষে। তাছাড়া প্রার্থী ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের মিছিল করেছ। যদিও তা অসত্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, বাস্তবে রাজেন্দ্র কলেজের এই প্রার্থী ‘কালেকটেড বাই বাড়ৈ এন্ড লাইকলি টু বি পোস্টেড বাই ‘মোল্লা’ ইন গাইজ অব “অ্যা ক্যান্ডিডেট অব অ্যা পাওয়ারফুল মিনিস্টার অব গ্রেটার ফরিদপুর”।’ ‘বাট অ্যাকচুয়ালি, মিনিস্টার ইজ ইন দ্যা ডার্ক এ্যাবাউট দিস পোসিটং, ইনকামটা মোল্লা ও তার দালালদের মধ্যে সমান দুইভাগ হবে,’ যোগ করেন তিনি। একই পদ্ধতি অববলম্বন করে গতমাসে ডিআইএতে একজন সাবেক ছাত্রদল নেতাকে পদায়ন দেয়া হয়েছে যিনি যোগদান করে দিনমান শুধু আওয়ামী লীগ বন্ধনা করেন। বাস্তবে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের নেতা ছিলেন। তার নাম ওয়াদুত। নিজের পরিচয় দিতেও দশবার মুক্তিযুদ্ধ ও  আওয়ামী লীগের নাম উচ্চারণ করেন। এতে ইতিমধ্যে বিরক্ত তার সহকর্মীরা। 

জানা যায়, ডিআইএর রাজশাহী অঞ্চলের ডিডি হওয়ার জন্য মরিয়া ডিআইএরই তিনজন কর্মকর্তা। তাদের কাছ থেকে অন্যান্য মাসের তুলনায় একটু মোটা খাম নিয়ে তিনজনকেই কথা দিয়ে ‘ঘুম পাড়িয়ে’ রাখা হয়েছে বলে জানা যায়। বাস্তবে এই পদের জন্য বাগেরহাটের একজনের সঙ্গে ত্রিশ লাখে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে বলে জানা যায়। ১০ লাখ টাকা অগ্রীম দেয়া হয়েছে। বাদবাকী দুই কিস্তিতে। শেষ কিস্তি যোগদানের ছয় মাস পরে। এই প্রার্থীকে মন্ত্রণালয়ের বড় কর্তাদের কাছে উপস্থাপন করা হবে অন্যভাবে। বাগেরহাটে জন্মানো বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সাবেক নেতার ‘লোক’ হিসেবে তাকে উপস্থাপন করা হবে এই প্রার্থীকে। বাস্তবে ব্যক্তিগতভাবে সৎ হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত ওই ছাত্রলীগ নেতা এই পদায়নের লাভের সঙ্গে জড়িত নন। এমনকি টাকার চুক্তির বিষয়ে তিনি কিছু জানেনও না। এই পদায়নের নেপথ্যেও মন্ত্রণালেয়র সেই অতিরিক্ত সচিব। যিনি ওই ছাত্রলীগ নেতার সুপারিশে ৩৬তম বিসিএসের প্রভাষকদের পদায়নে মাত্র দুইজনকে পছন্দমতো পদায়ন দিয়েছেন গত বৃহস্পতিবার। ছাত্রলীগের এই সাবেক কেন্দ্রীয় নেতাকেই কয়েকবছর যাবত ‘ইসকাপনের টেক্কা’ হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন আলোচিত অতিরিক্ত সচিব। একই পদ্ধতি অবলম্বন করে গত ছয়মাসে কুমিল্লাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শাখায় দুইজনকে পদায়ন দিয়েছেন আলোচিত অতিরিক্ত সচিব। লেনদেন হয়েছে প্রায় ২০ লাখ টাকা।

শিক্ষা অধিদপ্তরের শারীরিক শিক্ষা শাখার উপপরিচালকের পদে প্রায় ৯ বছর ছিলেন একজন বিতর্কিত সরকারি কলেজ শিক্ষক। জানুয়ারি মাসে তিনি কোটায় উপসচিব পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর থেকেই ওই পদটি শূন্য। পদটিতে যাওয়ার জন্য সাবেক ডিডির পছন্দের দুই নারী কর্মকর্তা কয়েকমাস যাবত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কয়েকবার দেখা করেছেন অতিরিক্ত সচিবের সঙ্গে। খেলাধুলার নামে সারাদেশ সফর ও উপহার সামগ্রী কেনায় পুকুরচুরির সুবিধা রয়েছে এই পদে। সেকায়েপে কর্মরত একজন বিএনপিপন্থী বিতর্কিত নারী কর্মকর্তাকে পদায়ন দেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন সেকায়েপ প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব।গত সপ্তাহে ওই নারী কর্মকর্তাকে ব্যানবেইসের উপপরিচালক পদে পদায়ন দেয়া হয়েছে। এই নারী কর্মকর্তার কারণে শহীদ লতিফ ও বেবীর মধ্যকার কলহ চিরস্থায়ী হয়েছে বলে শিক্ষা প্রশাসনের সবাই বলাবলি করেন। গত বৃহস্পতিবার শারীরিক শিক্ষা বিভাগের উপপরিচালক পদটির নিলাম চূড়ান্ত হয়। নোয়াখালী অঞ্চলের একজন সহযোগী অধ্যাপক সেরা দরদাতা হয়েছেন। তার জন্য কুমিল্লা-নোয়াখালী অঞ্চলের দুইজন মন্ত্রীর সুপারিশ জোগাড় করা হয়েছে। শিক্ষা অধিদপ্তরের ড্রাইভার আলাউদ্দিনের সঙ্গে বৃহস্পতিবার ঘুরতে দেখা গেছে শিক্ষা ক্যাডারের ওই প্রার্থীকে। অধূনা শিক্ষা প্রশাসনে নোয়াখালী অঞ্চলের টান বেড়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই।

অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ শাখার উপপরিচালকের পদটি দশ লাখে নিলাম হয়েছে বলে জানা যায়। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কড়া নির্দেশে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিতাড়িত হওয়া বাড়ৈর স্থলাভিষিক্ত হওয়া বিশ্বজিৎ জড়িত এই নিলামের সঙ্গে। বিশ্বজিৎ নিজেকে ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে দাবি করলেও তাকে ছাত্রলীগের শীর্ষ বা মাঝারি বা পাতিনেতাদের কেউ চেনেন না। বিশ্বজিৎকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরকারি কলেজ শাখা ও ডিআইএ এবং শিক্ষা অধিদপ্তরের কেনাকাটার কাজে নিয়োজিত উপপরিচালক (ফিন্যান্স ও প্রকিউরমেন্ট) আনিছুর রহমান ও নিগার সুলতানার কক্ষে দেখা যায়। 

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের বিশেষ শাখাও কোনও কাজ না থাকলেও পদটিতে যেতে চান অনেকেই। ওই পদটিও নিলামে উঠেছে। ঈদের আগের শেষ কর্মদিবসের শেষ সময়ে আদেশ জারি হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।এই পদের জন্য দালালি করছেন মফিজুল ইসলাম নামের একজন শিক্ষা ক্যাডারের বদলি দালাল। যদিও এই দালালেরর বিজনেস কার্ডে তানভীর মোহাম্মদ দীপু নাম লেখা রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সরকারি কলেজ শাখায় তাকে প্রায়ই দেখা যায়। এছাড়া শিক্ষা ভবনের একজন পরিচালকের কক্ষেও দেখা যায়। দীপুর মাধ্যমে গত দুই বছরে অন্তত দুই শতাধিক শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা পছন্দের পদায়ন বাগিয়েছেন মর্মে চাউর রয়েছে। 

পরবর্তী প্রতিবেন: এক অতিরিক্ত সচিবের রোষানলে  শিক্ষা ক্যাডারের ৭ম ব্যাচ। 




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে - dainik shiksha ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে দাখিল আলিম পরীক্ষায় বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ - dainik shiksha দাখিল আলিম পরীক্ষায় বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ মাস্টার্সের সমমর্যাদা পেল দাওয়ারে হাদিস - dainik shiksha মাস্টার্সের সমমর্যাদা পেল দাওয়ারে হাদিস এইচএসসি প্রাইভেট পরীক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশনের বিজ্ঞপ্তি - dainik shiksha এইচএসসি প্রাইভেট পরীক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশনের বিজ্ঞপ্তি এমপিও কমিটির সভা ২৪ সেপ্টেম্বর - dainik shiksha এমপিও কমিটির সভা ২৪ সেপ্টেম্বর তেরো এগারোর বাদপড়া শিক্ষকদের হইচই (ভিডিও) - dainik shiksha তেরো এগারোর বাদপড়া শিক্ষকদের হইচই (ভিডিও) দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website