আমাদের সঙ্গে থাকতে দৈনিকশিক্ষাডটকম ফেসবুক পেজে লাইক দিন।


প্রধানমন্ত্রী-অর্থমন্ত্রীর ফর্মুলাও অগ্রাহ্য বেতন স্কেলে

আশরাফুল হক রাজীব | জানুয়ারি ৮, ২০১৬ | বিবিধ

Secaretory-2বেতন স্কেল নিয়ে চলমান আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সমস্যা সমাধানের একটি ফর্মুলা বের করেছিলেন। তাতে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের বিকল্প হাজির করা হয়েছিল।

এই ফর্মুলা বাস্তবায়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবি অনেকটাই পূরণ হয়ে যেত। চিকিৎসক, কৃষিবিদ, প্রকৌশলীসহ ২৬ ক্যাডারের অসন্তোষও মিটত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সেই ফর্মুলা অগ্রাহ্য করেই নতুন পে স্কেলের গেজেট জারি করা হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বর্জনের কর্মসূচি দিয়েছেন।

চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদসহ ২৬ ক্যাডার সমন্বয়ে গঠিত প্রকৃচি বিসিএস সমন্বয় কমিটিও সেই পথে হাঁটছে।

এ ছাড়া গণছুটির কথা বলেছেন ব্যাংক কর্মকর্তারাও। সব কিছু মিলে সরকারি চাকরি ক্ষেত্রে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে।

প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর ফর্মুলায় বলা হয়েছিল, নবম গ্রেড থেকে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে (চতুর্থ গ্রেড পর্যন্ত) পদোন্নতি হবে চাকরিকাল পূর্ণ ও সন্তোষজনক কাজ করার শর্তে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। নবম থেকে অষ্টম গ্রেডে পদোন্নতি পেতে হলে তিন বছর পূর্ণ করতে হবে। একইভাবে সপ্তম গ্রেডে পদোন্নতি পেতে হলে চার বছর, ষষ্ঠ গ্রেডে যেতে হলে পাঁচ বছর, পঞ্চম গ্রেডে ১০ বছর, চতুর্থ গ্রেডে ১২ বছর, তৃতীয় গ্রেডে ১৪ বছর, দ্বিতীয় গ্রেডে ১৭ বছর এবং প্রথম গ্রেডে পদোন্নতি পেতে হলে ২০ বছর চাকরি পূর্ণ করতে হবে।

অর্থমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলেন, টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দেওয়ার ফলে অনেকেই শুধু পদোন্নতি নয়, উচ্চতর বেতন থেকেও বঞ্চিত হবেন। এটা মোটেই কাম্য নয়। এ কারণেই তিনি বিকল্প ফর্মুলা বের করেছিলেন এবং তাতে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি নিয়েছিলেন। এই প্রস্তাব নিয়ে অর্থমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন গত ১৮ নভেম্বর।

এর চার দিন পর ২২ নভেম্বর আবদুল মুহিত ফর্মুলাটি লিখিতভাবে সারসংক্ষেপ আকারে শেখ হাসিনার কাছে পাঠান। এতে প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষর করেন ২৭ নভেম্বর। সেদিন শুক্রবার থাকায় ২৯ নভেম্বর তা অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরদিন ৩০ নভেম্বর অর্থমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের কপি পেয়েই তা বাস্তবায়নের জন্য অর্থসচিবের কাছে পাঠান। এ সময় তিনি অর্থসচিবকে বলেছিলেন, জনপ্রশাসন ও অর্থ বিভাগ আলোচনা করে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরিত সারসংক্ষেপ বাস্তবায়ন করবে এবং অর্থমন্ত্রীকে জানাবে। কিন্তু গত ১৪ ডিসেম্বর রাতে পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়, যেখানে তাঁদের দুইজনের সিদ্ধান্তের প্রতিফলন নেই।

প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য স ম গোলাম কিবরিয়া বলেন, অর্থমন্ত্রীর ফর্মুলাটি কার্যকর হলে সমস্যার সমাধান শতভাগ না হলেও তা কমে যেত। কারণ নির্দিষ্ট সময় পরে সবাই উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার সুবিধা পেতেন। আমরা টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পুনর্বহাল চাচ্ছি, কারণ আমাদের সময়মতো পরবর্তী গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ নেই। অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবে সবার মর্যাদা সমুন্নত থাকত। প্রস্তাবটি এতাটাই সহজ ছিল যে, বর্তমানে ডিপিসি করে যেভাবে পদোন্নতি নিতে হচ্ছে সেই পদ্ধতিটিরও দরকার ছিল না। অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাব অনুযায়ী নবম থেকে চতুর্থ গ্রেড পর্যন্ত পদোন্নতি হতো স্বয়ংক্রিয়ভাবে। প্রধানমন্ত্রী-অর্থমন্ত্রীর ফর্মূলা কেন মানা হলো না-এ বিষয়ে জানার জন্য গতকাল অফিস সময়ে একাধিক সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। রাতে টেলিফোনেও তাঁরা কোনো বক্তব্য দেননি। এই সচিবদের কেউই এককভাবে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর ফর্মূলা অগ্রাহ্য করার দায় নিতে চাননি।

প্রধানমন্ত্রী অনুমোদিত অর্থমন্ত্রীর ফর্মুলায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সমস্যা সমাধানের পথও খোলা ছিল। সারসংক্ষেপে বলা হয়েছিল, মন্ত্রিপরিষদসচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব পদ দুটি বিশেষ পদ হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত।

সিনিয়র সচিবের পদ নিয়মিতভাবে সৃষ্টি এবং তাঁদের অতিরিক্ত কিছু বেতন প্রদান করা হয়েছে। এতে আপত্তি তুলেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। বিষয়টির সমাধানে অর্থমন্ত্রীর ফর্মুলা ছিল সিনিয়র সচিবের পদ মাত্র ১০টি, যা এখানেই সীমিত রাখা হবে। ১২ লাখ সরকারি কর্মচারীর মধ্যে মাত্র ১০ জন সিনিয়র সচিব সামান্য উচ্চ হারে বেতন পাচ্ছেন। একজন শিক্ষক এবং একজন বিচারককে সমমানের পদ দেওয়ার প্রস্তাব ছিল অর্থমন্ত্রীর।

সুপ্রিম কোর্টের দুটি বিভাগ থাকায় বিচারকরা পদোন্নতির যথেষ্ট সুবিধা পান। কিন্তু শিক্ষকদের সে সুযোগ নেই। এই অবস্থায় মুহিতের প্রস্তাব ছিল জাতীয় অধ্যাপকদের সিনিয়র সচিবের সমান বেতন দেওয়ার।

অর্থমন্ত্রী তাঁর প্রস্তাবে আরো বলেছিলেন, যেসব ক্যাডারে শতাধিক সদস্য রয়েছেন সেগুলোতে অন্তত একটি প্রথম গ্রেডের পদ সৃষ্টি করতে হবে। এতে পরিবার পরিকল্পনা, কারিগরি শিক্ষা, সমবায়, ইকনোমিক, পরিসংখ্যান এবং টেলিকমে ছয়টি পদ সৃষ্টি হবে। এর ফলে প্রথম গ্রেডের ৩০টি পদের অতিরিক্ত আরো ছয়টি পদ থাকবে।

একইভাবে আনসার, সড়ক ও জনপথ, সাধারণ শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, ডাক, গণপূর্ত, খাদ্য, বন ক্যাডারে একটি করে দ্বিতীয় গ্রেডের মোট ১০টি পদ সৃষ্টি করা হবে। একমাত্র বাণিজ্য ছাড়া প্রত্যেক ক্যাডারেই দ্বিতীয় গ্রেডের পদ থাকবে। তেমনিভাবে সমবায় ও পরিসংখ্যান ক্যাডারে একটি করে তৃতীয় গ্রেডের মোট দুটি পদ সৃষ্টি করা হবে। তৃতীয় গ্রেডে ২৪টি পদ রয়েছে। চতুর্থ গ্রেডে বর্তমানে বিভিন্ন ক্যাডারের যে পদ আছে সেখানে আরো ৩ শতাংশকে পদোন্নতি দেওয়া হবে। এতে প্রশাসন ক্যাডারে পঞ্চম গ্রেড থেকে ৪৫টি পদ চতুর্থ গ্রেডে আসবে।

কৃষি ক্যাডারের মোট সংখ্যা পরিবর্তন না করে ৩৬টি পদ চতুর্থ গ্রেডে রাখা হবে। চতুর্থ গ্রেডে বর্তমানে পদসংখ্যা দুই হাজার ২৫২টি। তা বেড়ে দাঁড়াবে দুই হাজার ৪২৭টিতে। এসব সংস্কার আগামী ছয় মাসের মধ্যে ক্যাডারভুক্ত করা হবে।

অর্থমন্ত্রী সারসংক্ষেপে আরো বলেছেন, সন্তোষজনক চাকরি করার বিভিন্ন শর্ত পূরণ করলে যেকোনো কর্মচারী ১০ বছর পর পরবর্তী গ্রেডে উন্নীত হবেন এবং সেই উন্নত গ্রেডে ছয় বছর পূর্ণ করার পর তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী গ্রেডে যেতে পারবেন। এই ব্যবস্থায় প্রত্যেকে জীবনে দুটি পদোন্নতি সম্বন্ধে নিশ্চিত হবেন।

পে স্কেল নিয়ে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে ফরাসউদ্দিন কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই। সেখানেই টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এরপর সচিব কমিটি হয়ে সেটি যখন মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয় তখন থেকেই বিভিন্ন সেক্টর নানা ধরনের কর্মসূচি ঘোষণা করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পূর্ণ কর্মবিরতিতে গেছেন। একই পথে গেছে প্রকৃচি বিসিএস সমন্বয় কমিটিও। সংগঠনটি এরই মধ্যে দুই ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করছে।

কিভাবে সেই কর্মবিরতি আরো জোরদার করা যায় তা নিয়ে আজ বিভিন্ন ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে মতবিনিময় অনুষ্ঠান হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারীরা তাঁদের দাবিদাওয়া নিয়ে সরকারের প্রভবশালী মন্ত্রীদের কাছেও ধরনা দিচ্ছেন। এর প্রভাব পড়েছে মন্ত্রিসভার বৈঠকে।

গত সোমবারের মন্ত্রিসভা বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী নরুল ইসলাম নাহিদের নেতৃত্বে চার মন্ত্রী পে স্কেলের বৈষম্য নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে জানান, বেতন বৈষম্য নিরসন কমিটিতে যেভাবে আলোচনা হয়েছে তার প্রতিফলন নেই পে স্কেলের গেজেটে।

এ সময় আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও বলেন ভেটিং যেভাবে হয়েছে গেজেট সেভাবে জারি হয়নি।


আপনার মন্তব্য দিন