আমাদের সঙ্গে থাকতে দৈনিকশিক্ষাডটকম ফেসবুক পেজে লাইক দিন।


প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার নেপথ্যে যারা

তানজীবা চৌধুরী ও রিফাত আফরোজ | জানুয়ারি ৭, ২০১৬ | প্রাথমিক সমাপনী

২০০৯ সালে শুরু হওয়ার পর অনেকেই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষাকে আখ্যায়িত করেন শিশুদের এসএসসি পরীক্ষা হিসেবে।

এই পরীক্ষার প্রভাব কেবল যে শিক্ষার্থী বা অভিভাবকদের ওপরই পড়ছে তা নয়, বরং তা সমভাবে প্রভাব ফেলছে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও তার সংলগ্ন শিক্ষা অফিসগুলোতেও।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে গিয়ে শিক্ষকদের ব্যস্ততা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাপনীর জন্য উপযুক্ত শিক্ষার্থী বাছাই করা শুরু হয় মূলত চতুর্থ শ্রেণী থেকেই। পঞ্চম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী সংখ্যা এবং সমাপনী পরীক্ষার জন্য রেজিস্ট্রেশন করা শিক্ষার্থীর সংখ্যায় যেন পার্থক্য না থাকে সে জন্য দুর্বল শিক্ষার্থীদের চতুর্থ শ্রেণীতেই পুনরাবৃত্তি করতে হয়।

বছরের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের বিশেষ প্রস্তুতির জন্য বিদ্যালয়ের নিয়মিত সময়ের বাইরে কোচিং ও অতিরিক্ত ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়। আদতে কোচিং হলেও সরকারি নিষেধ থাকায় স্কুলগুলোর এই উদ্যোগকে অতিরিক্ত ক্লাস হিসেবেই অভিহিত করা হয়।

দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার পর থেকে বিশেষ কোচিং ক্লাস শুরু হয়। এসব ক্লাসে মূলত ইংরেজি আর গণিতের ওপর জোর দেয়া হয় বেশি, পাঠ্যবইয়ের চেয়ে গাইড বই বেশি অনুসরণ করা হয়। সাধারণত এই কোচিং বাধ্যতামূলক, সবাইকে এর জন্য ফি দিতে হয়।

স্কুল ছুটির সময়েও (যেমন গ্রীষ্মকালীন/রোজার ছুটি) কোচিং করানো হয়। এই কোচিংয়ের জন্যও ফি নির্ধারিত করা থাকে।

ভালো ও দুর্বল সব ধরনের শিক্ষার্থীর চাহিদার কথা মাথায় রেখেই যেগুলো বেশি প্রয়োজনীয়, কোচিংয়ে সেগুলোই পড়ানো ও যাচাই করা হয়।

সমাপনীর প্রশ্নের আদলে প্রশ্ন তৈরি করে পরীক্ষা নেয়া হয়। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো জেনে পরীক্ষার উপযোগী করে তোলার জন্য তাদের প্রতি বিশেষ নজর দেয়া হয়, যদি শিক্ষার্থী না পারে, সে ক্ষেত্রে তাকে সাজেশন দেয়া হয়।

যদি এতেও কাজ না হয় তবে শেষ চেষ্টা হিসেবে পরীক্ষার সময় ভালো ছাত্রের পাশে দুর্বল ছাত্রকে বসানো হয়।

একজন প্রধান শিক্ষকের ভাষায়- ‘প্রশ্নগুলো এমনই, একটা ভালো ছাত্র যদি পাশে থাকে তাহলে একটা গাধা ছাত্রও পাস করে যাবে, তবে আমরা তাকে বলে দিই ভালো ছাত্রটিকে বেশি ডাকাডাকি না করতে, তাহলে আবার তাকে পাস করাতে গিয়ে

A+ কমে যাবে।’

বিদ্যালয়ের দক্ষ শিক্ষকরাই কোচিং ক্লাস নিয়ে থাকেন। একজন প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘যেসব স্কুল ভালো করেছে সবগুলো কোচিং করেই ভালো করেছে, কারণ ৩৫ মিনিটের ক্লাসে সব ধরে ধরে শেখানো যায় না।

আর স্কুলগুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় এটি অতিরিক্ত চাপ হয়ে যাচ্ছে। উপর থেকে চাপ দেয়া হয়, শিক্ষার্থীদের ভালো করে প্রস্তুত করতে হবে, বাধ্য হয়ে তাই কোচিং করাতেই হয়।’

অভিভাবকরা বলেন, শিক্ষকরা পরীক্ষার ফলাফল তৈরি করে কার সন্তানের কী অবস্থা তা জানিয়ে দেন।

অনেক অভিভাবক নিজে থেকে আসেন, আবার অনেককেই খবর দিয়ে আনতে হয়। সন্তানের পড়াশোনার উন্নতি কিভাবে করা যায় তা নিয়ে তারা আলোচনা করেন এবং শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেন।

সামর্থ্য থাকলে বাসায় শিক্ষক রাখতে বলেন এবং কাকে শিক্ষক হিসেবে নিলে বেশি উপকার পাবেন সে ব্যাপারেও পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

সমাপনীর ফলে শিক্ষকদের জবাবদিহিতা বাড়ছে বলেও জানা যায়।

শিক্ষকরা সাক্ষাৎকারে জানান, কোনো শিক্ষার্থী যদি ফেল করে তবে শিক্ষা অফিস থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ আসে।

একজন প্রধান শিক্ষক জানান, ইতিপূর্বে তাদের স্কুলে শিক্ষার্থী ফেল করায় লিখিতভাবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বরাবর তাদের কারণ দর্শাতে হয় এবং ভবিষ্যতে তাদের আরও ভালো যত্ন নেয়ার অঙ্গীকার করতে হয়।

এখন কোনো শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হলে যেমন ওই বিদ্যালয়ের প্রধানকে জবাব দিতে হয়, তেমনি কোনো শিক্ষার্থী প্রথম শ্রেণী থেকে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পরপর দুইবার অকৃতকার্য হলেও তাকে জবাবদিহি করতে হয়।

শুধু বিদ্যালয় নয়, উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মকর্তাদের মধ্যে জবাবদিহিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে বলেও একজন শিক্ষা অফিসার উল্লেখ করেন।

তিনি মনে করেন, বর্তমানে স্কুলগুলো অনেক সচেতন। যেহেতু জিপিএ ৫ থেকে স্কুলের মান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, তাই স্কুল প্রধানরা শিক্ষা অফিসের সুনজরে আসার জন্য শিক্ষার্থীদের বেশি যত্ন নিয়ে থাকেন।

তবে একজন প্রধান শিক্ষক বলেন, প্রশাসন চায় শতভাগ ছাত্র পাস করবে, তাই তারা বেশি দুর্বল ছাত্রকে আরেক বছর পঞ্চম শ্রেণীতে রেখে দেন।

আবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কিছু নির্দেশও তাদের জন্য বিভ্রান্তিকর। যেমন- একবার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের ডেপুটি ডিরেক্টর এসে বলেন, তারা কোয়ান্টিটি চান না, কোয়ালিটি চান। কিন্তু শতভাগ ছাত্রকে একই সঙ্গে মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করা যায় না বলে তিনি মনে করেন।

পঞ্চম শ্রেণীর জন্য বিস্তৃত প্রস্তুতি নিতে গিয়ে অন্যান্য ক্লাসে মাঝে মধ্যে সমস্যা দেখা দেয়।

শিক্ষক স্বল্পতা থাকায় ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর ক্লাস মাঝে মাঝে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে শিক্ষকরা জানান।

শিক্ষক কম থাকলে একজন শিক্ষকই একসঙ্গে দুইটি ক্লাস নেন, এক ক্লাসে কিছু লিখতে দিয়ে এসে তিনি আরেক ক্লাসে পড়ান। এভাবে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি উদ্যোগগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা তাদের পক্ষে কষ্টসাধ্য হলেও কেউ অকৃতকার্য হলে বাড়তি প্রশাসনিক ঝামেলা এড়ানোর জন্য অন্য শ্রেণীর কার্যক্রম বন্ধ রেখে হলেও পঞ্চম শ্রেণীর সব কাজ চালিয়ে নেয়া হয়।

এছাড়া যারা দক্ষ শিক্ষক তারাই মূলত সমাপনী পরীক্ষায় পরিদর্শন, খাতা মূল্যায়নসহ নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন, আবার ওই সময়ই স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষার শেষ প্রস্তুতি চলতে থাকে। ফলে ১ম থেকে ৪র্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা তাদের দক্ষ শিক্ষকদের কাছ থেকে শিক্ষালাভ থেকে বঞ্চিত হয়।

এই পরীক্ষাকে সামনে রেখে কোনো কোনো উপজেলায় বছরে তিনটি মডেল টেস্টও নেয়া হয়ে থাকে, কোনোটিতে শিক্ষা অফিস থেকে প্রশ্ন দেয়া হয় আর শিক্ষার্থীরা খাতা নিয়ে আসে।

আবার কোনোটিতে সমাপনীর মডেলে কেন্দ্রীয়ভাবে ফাইনাল মডেল টেস্ট নেয়া হয় যেখানে অন্য একটি কেন্দ্র ঠিক করা হয়, খাতা সরবরাহ করা হয় এবং এই পরীক্ষার জন্যও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি নেয়া হয়।

শিক্ষা অফিসগুলোয় জানুয়ারি মাস থেকেই বিভিন্ন রকম কার্যক্রম শুরু হয়।

শিক্ষকদের নিয়োগ নিয়ে স্কুল কমিটিগুলোর সঙ্গে মিটিং, শিক্ষার্থীদের সাপ্তাহিক ও মাসিক পরীক্ষা, শিক্ষকদের নিয়ে বিষয়ভিত্তিক ট্রেনিং, দুর্বল ছাত্রদের অতিরিক্ত সময় দেয়ার নির্দেশনা ইত্যাদি। তবে জুন/জুলাই মাস থেকে কাজের চাপ বেশি থাকে।

পাশাপাশি সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক সব শিক্ষার্থীর নামের তালিকা নেয়া হয়। এ সময়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা নিজেদের ক্লাস্টারের মধ্যে বিদ্যালয়গুলোতে পরিদর্শনের মাত্রা বাড়িয়ে দেন। একজন শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার মূল কাজটা করে থাকে শিক্ষক ও অভিভাবক। আমাদের কাজ হল তার তদারকি করা।’ এ লক্ষ্যে তিনি শিক্ষকদের মধ্যে একটি গার্ডিয়ানশিপ তৈরি করে দেন, প্রতিটি ক্লাসে ১০-১২ জন করে শিক্ষার্থী নিয়ে কয়েকটি গ্রুপ করে গ্রুপ প্রতি একজন শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল করানোর দায়িত্ব দেয়া হয়।

সহকারী শিক্ষা অফিসার বলেন, তারা শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে তৈরি, অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং মডেল টেস্টের ফলাফল মূল্যায়নের ভিত্তিতে আরও ভালোভাবে পরিচর্যা করতে বলেন।

তবে এসব ক্লাসের জন্য অতিরিক্ত অর্থ নেয়া হয় এমন অভিযোগ তারা পাননি।

অতিরিক্ত ক্লাসের জন্য অভিভাবকরা যদি গোপনে টাকা দেন এবং অভিযোগ না করেন তবে এ প্রসঙ্গে শিক্ষা অফিসের কোনো করণীয় নেই বলে তিনি জানান।

সমাপনী পরীক্ষার কেন্দ্র নির্বাচন, কর্মকর্তা ও পরিদর্শক নিয়োগ এবং আসন ব্যবস্থা শিক্ষা অফিসের তত্ত্বাবধানে করা হয়।

এছাড়া পরীক্ষা শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ আগে নেপ থেকে উপজেলায় প্রশ্ন আসে যা উপজেলা শিক্ষা অফিসের লকারে বা থানায় রাখা হয় এবং পরীক্ষা শুরু হওয়ার ১৫ মিনিট আগে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে কেন্দ্রে পৌঁছে দেয়া হয়।

পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য মূল্যায়নকারী নিয়োগ ও তাদের মূল্যায়নের ওপর বিশেষ ট্রেনিং- ‘মার্কার ট্রেনিং’ দেয়া, এক উপজেলার খাতা আরেক উপজেলায় পৌঁছে দেয়া এবং তার আগে খাতা কোডিং ও কাটিংয়ের দীর্ঘ কাজ তাদেরই করতে হয়।

এখানেও কর্মীস্বল্পতা লক্ষণীয়। যেমন- একজন শিক্ষা অফিসার জানান, তাদের উপজেলায় সহকারী শিক্ষা অফিসার থাকার কথা ৬ জন, কিন্তু বর্তমানে আছেন দু’জন।

নিয়মিত দায়িত্বের বাইরে তাদের অন্যান্য অনেক কাজ করতে হয় যা তাদের করার কথা নয় এবং এর ফলে মূল দায়িত্ব পালন করতে অসুবিধা হয়। যেমন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর না থাকায় তাদেরই ডিআর ফরমের ডাটা এন্ট্রি করতে হয়। অনেক সময় ম্যাজিস্ট্রেটের বিকল্প হিসেবে তাদের পরীক্ষা হলেও থাকতে হয়।

অনেকেই মনে করেন, শিক্ষার্থী আগের চেয়ে বেশি শিখছে, শিক্ষককেও বেশ পরিশ্রম করতে হচ্ছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নিয়মিত স্কুল মনিটরিং, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন রকমের কর্মশালা অনুষ্ঠিত হতে দেখা যাচ্ছে।

পাশাপাশি স্কুলের নিজস্ব পরীক্ষা যেমন- ৪র্থ শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলকে গুরুত্ব দেয়া, অভিভাবকদের সঙ্গে বিভিন্ন প্রকার মিটিং করা, সর্বোপরি শিক্ষা বিষয়ে সচেতনতা বাড়তে দেখা যাচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এই কর্মদক্ষতাকে মাথায় রেখে সাত বছরব্যাপী যে ব্যবস্থা চলমান রয়েছে তার মূল লক্ষ্য পরীক্ষা না করে শ্রেণীকক্ষে যথাযথ পাঠদান করা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের জন্য নির্ধারিত শিক্ষাক্রমকে কাটছাঁট করে সিলেবাস কমিয়ে সাজেশনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়।

এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ওপর আরোপিত অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ যেমন কমবে, তেমনি শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষা অফিস তথা সমগ্র স্টেকহোল্ডাররা হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার সুযোগ বাড়বে বলে ধারণা করা যায়।

আপনার মন্তব্য দিন