বই হচ্ছে মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় স্তম্ভ : ড. জাফর ইকবাল - মতামত - দৈনিকশিক্ষা


বই হচ্ছে মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় স্তম্ভ : ড. জাফর ইকবাল

মুহম্মদ জাফর ইকবাল |

পৃথিবীতে যত দৃশ্য আছে, তার মাঝে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হচ্ছে- একটি ছোট শিশু পা ছড়িয়ে সাইজে তার চেয়ে বড় একটি বই খুলে খুব মনোযোগ দিয়ে সেটির দিকে তাকিয়ে আছে। শিশুটি পড়তে শেখেনি, ভালো করে কথাও বলতে শেখেনি, কিন্তু তার পরও বইয়ের কোনো একটি ছবির দিকে সে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে, নিশ্চয়ই তার মাথার মাঝে তখন কল্পনার বিশাল এক জগৎ খেলা করে যাচ্ছে। ঠিক সে রকম, পৃথিবীর যত দৃশ্য আছে তার মাঝে সবচেয়ে আতঙ্কের, সবচেয়ে ভয় জাগানিয়া দৃশ্য হচ্ছে, যখন ছোট একটি শিশু স্মার্টফোনে দ্রুতলয়ের কোনো বাজনা শুনতে শুনতে সেটির স্ট্ক্রিনে দ্রুত পরিবর্তনশীল কোনো ভিডিওর দিকে সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে আছে। আমার বুকে তখন কাঁপুনি হয়। আমার মনে হয়, সারাদিনে কতক্ষণ ওই শিশুটি স্মার্টফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে? ওই শিশুটি স্বাভাবিকভাবে বড় হবে তো? আরেকটু বড় হতে হতে হঠাৎ করে তার আধো আধো বুলি থেমে তার ভেতর অটিস্টিক শিশুর লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করবে না তো?

আমি জানি আমি নেহাতই প্রাচীনপন্থি মানুষ। আমি এখনও বিশ্বাস করি স্মার্টফোন ছাড়াই কাজ চলে যায়। বিশ্বাস করি ফেসবুক না করেও জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়। শুধু তাই নয়, মনে হয় ওসব না করেই আমি ভালো আছি। রুচিশীল ভদ্রলোকদের ভেতর যারা ওইপথে পা বাড়িয়েছেন, আজকাল তারা ফেসবুকের অশালীন কাঁচা খিস্তি, নোংরা গালাগাল দেখে তীব্র জ্বালা অনুভব করে তড়পাতে থাকেন, অনেকটা আগুন খেয়ে অঙ্গার বাহ্যি করার মতো! আমার কখনও সেই যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় না। শুধু তাই নয়, আমি এখনও বিশ্বাস করি ফেসবুক নয়, বুক বা বই হচ্ছে মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় স্তম্ভ।

একটি ছোট শিশু যখন প্রথম স্কুলে যায়, তখন আমরা সবার আগে আশা করি সেখানে সে পড়তে শিখবে। একটি শিশুকে পড়তে শেখানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে তাকে বই পড়ে শোনানো। আমার দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে- একটি ছোট শিশু যে অক্ষরগুলো চেনে না, কিন্তু গড়গড় করে বই পড়ে যাচ্ছে। (আমার কথা বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই, মোটামুটি তিন থেকে চার বছরের একটি বাচ্চাকে নিয়মিত বই পড়ে শোনালে সেই বাচ্চা পড়তে শিখে যায়, যাদের এই বয়সী বাচ্চা আছে, তারা ইচ্ছা করলেই সেটি পরীক্ষা করে দেখতে পারেন!) আমাদের দেশের বেশিরভাগ শিশুর বাবা-মায়ের সেই সামর্থ্য বা সুযোগ নেই। তাই তাদের স্কুলে গিয়ে প্রথমবার এই পড়া শিখতে হয়। এখন যেহেতু সচ্ছল বাবা-মায়েরা তাদের ছেলেমেয়েদের সরকারি প্রাইমারি স্কুলে দিতে চান না, তাদের জন্য সারাদেশে অসংখ্য কিন্ডারগার্টেন তৈরি হয়েছে, সেখানে টাই পরে ফিটফাট হয়ে যাওয়া যায়, ইংরেজিতে কথা বলা যায়, তাই সবাই সেখানেই যায়। সরকারি প্রাইমারি স্কুলগুলো মোটামুটিভাবে দরিদ্র কিংবা নিম্নমধ্যবিত্তদের স্কুল হয়ে গেছে। সেখানে যথেষ্ট শিক্ষক-শিক্ষিকা নেই, যারা আছেন তাদের খুব একটা সম্মান নেই। সব শিক্ষক শহর এলাকায় চলে আসতে চান, তাই গ্রামের দিকে একজন শিক্ষক পুরো একটি স্কুল চালাচ্ছেন- সে রকম উদাহরণও আছে। বাচ্চাদের দুই ব্যাচে পড়াতে হয়, শিক্ষকদের নিঃশ্বাস ফেলার সময় থাকে না। কাজেই যখনই লেখাপড়ার অবস্থার ওপর একটি জরিপ নেওয়া হয়, তখন সবাই দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।


স্কুলে গিয়ে আর কিছু শিখুক আর নাই শিখুক, সবাইকে পড়তে শিখতে হয়। যে যত ভালো পড়তে শিখবে, সে তত ভালো লেখাপড়া করবে। ভালো পড়তে শেখার একটি মাত্র উপায়, সেটি হচ্ছে অনেক বেশি করে বই পড়া। কিন্তু বাচ্চারা স্কুলের গুটিকতক পাঠ্যবইয়ের বাইরে আর কোনো বই পড়ার সুযোগ পায় না। পাঠ্যবইগুলো যত না পড়ে, তার চেয়ে বেশি মুখস্থ করে, কাজেই সেটিকেও ঠিক সত্যিকারের পড়া বলা যায় না। যদি দেশের প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চারা পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি তাদের উপযোগী অন্য অনেক বই পড়তে পারত, তাহলে তাদের ভালো করে পড়তে শেখার একটি সুযোগ থাকত। কিন্তু সেই সুযোগ নেই। এই খুবই সহজ বিষয়গুলোও কেউ খেয়াল করেন বলে মনে হয় না। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়- ছোট বাচ্চাদের জন্য কারও মায়া নেই! আমি নিজের কানে একবার একজন মন্ত্রীকে প্রকাশ্য মিটিংয়ে বলতে শুনেছি, স্কুলে ছোট বাচ্চাদের পিটুনি দেওয়া তুলে দেওয়াটা ঠিক হয়নি। স্কুলের ছেলেমেয়েদের মার খাওয়া উচিত, তাহলে তারা 'টনটনে' হয়ে বড় হবে। 'টনটনে' বিষয়টি কী আমি জানি না, আমি শৈশবে স্কুলে মার খেয়ে বড় হয়েছি; কিন্তু সে জন্য আমি নিজেকে এখনও টনটনে মনে করতে পারি না। বরং স্কুলে মার খাওয়ার প্রত্যেকটি ঘটনা এখনও মনে আছে, সেই শৈশবেই আমার কাছে সেগুলো শারীরিক যন্ত্রণা ছিল না, সেগুলো ছিল তীব্র অপমানের বিষয়। আমি আমার সেই শিক্ষকদের কাউকে কখনও ক্ষমা করিনি। একটি শিশুর গায়ে যে হাত তুলতে পারেন, তাকে আমি শিক্ষক দূরে থাকুক মানুষ বলতেও রাজি নই।

আমাদের দেশে শিক্ষার পেছনে যথেষ্ট টাকা খরচ করা হয় না। কাজেই সরকার দেশের ৬৬ হাজার প্রাইমারি স্কুলের সব বাচ্চাকে পড়ার জন্য ঝলমলে বই কিনে দেবে সেটি আমি আশা করি না। সরকারি প্রাইমারি স্কুলে আলাদা লাইব্রেরি নেই, তাদের বই কেনার জন্য আলাদাভাবে টাকা দেওয়া হয় না। তাই যখন দেখেছি সব প্রাইমারি স্কুলে বঙ্গবন্ধু কর্নার করে সেখানে বাচ্চাদের বই কেনার জন্য ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, আমি যথেষ্ট অবাক হয়েছি। অবাক হওয়ার সঙ্গে খুশিও হতে পারতাম, যদি দেখতাম খবরের কাগজে এই খবরটি ইতিবাচক খবর হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। তা হয়নি, খবরটি প্রকাশিত হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা দিয়ে অস্বচ্ছ পদ্ধতিতে বই কিনে কিছু মানুষকে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ হিসেবে। অন্য যে কোনো অভিযোগ হলে অভিযোগটা সত্যি না মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য নানা ধরনের গবেষণা করতে হতো। এই প্রথম একটি অভিযোগের কথা পাওয়া গেল যেটি সত্যি না মিথ্যা বের করার জন্য কোনো গবেষণা করতে হবে না। যে বইগুলো কেনা হয়েছে কিংবা কেনা হবে, সেগুলোর দিকে শুধু একনজর তাকাতে হবে। বইগুলো কেনা হয়েছে প্রাইমারি স্কুলের ছেলেমেয়েদের জন্য। প্রাইমারি স্কুলের একজন শিশু কী ধরনের বই পড়তে চায় কিংবা কী ধরনের বই পড়তে পারে, আমরা মোটামুটি সবাই এটি জানি। যদি দেখা যায় বইগুলো সে রকম নয়, তাহলে বুঝে নেব বইগুলো ঠিকভাবে কেনা হয়নি। (তবে যারা ওই বইগুলো কিনছেন, তারা যদি যথেষ্ট চালাক-চতুর হয়ে থাকেন, তাহলে তারা সেই বইয়ের তালিকায় এমন কিছু বইয়ের নাম দিয়ে রাখবেন যে, তখন কারও সেই তালিকা নিয়ে প্রশ্ন করার দুঃসাহস হবে না!)

এই খুঁটিনাটি আলোচনা করার আগে আমরা একটি অন্য বিষয় বিবেচনা করতে পারি। ১৫০ কোটি টাকার পরিমাণ কত, এই পরিমাণ টাকা যদি অপচয় হয়েও যায় সেটি নিয়ে আমাদের কি খুব বেশি হা-হুতাশ করতে হবে? কারণ আমার মনে আছে একবার দেশের চার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে যাওয়ার পর আমাদের বলা হয়েছিল, একটি দেশের হিসাবে চুরি হয়ে যাওয়ার জন্য এই পরিমাণ টাকা কোনো টাকাই নয়! কাজেই হয়তো এই 'মাত্র' ১৫০ কোটি টাকা নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলে! কিন্তু আমি ছোট একটি হিসাব করে দেখেছি- ১৫০ কোটি টাকা ৬৬ হাজার সরকারি প্রাইমারি স্কুলের মাঝে বিতরণ করে দিলে প্রত্যেকটি স্কুল প্রায় ২০ হাজার টাকা করে পায়। তখন একশ' টাকা দাম দিয়ে একটি বই কেনা হলে প্রত্যেকটি স্কুল দুইশ'টি করে বই কিনতে পারবে। (যতদূর জানি, একসঙ্গে অনেক বই কেনা হলে অনেক কম খরচে বই ছাপানো যায়।) প্রত্যেকটি প্রাইমারি স্কুলে যদি দুইশ'টি করে বই থাকে, তাহলে সেই স্কুলের সব ছেলেমেয়ে পাঠ্যবইয়ের বাইরে আরও দুইশ'টি বই পড়তে পারবে! যদি সত্যি সত্যিই একটি শিশু এতগুলো বই পড়ে ফেলে, তাহলে তার ভেতরে কি একটি ম্যাজিক ঘটে যাবে না? যেহেতু মুজিববর্ষকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু কর্নারের জন্য বইগুলো কেনা হবে, কাজেই বইয়ের একটি বড় অংশ হবে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ এবং অসাম্প্রদায়িকতা নিয়ে; কিন্তু অবশ্যই সেগুলো হতে হবে বাচ্চাদের জন্য উপযোগী করে লেখা। যদি তা না হয়, তাহলে যত ভালো বই-ই কেনা হোক না কেন একটি ছোট শিশু সেই বই কোনোদিন খুলে দেখবে না। স্কুলের শেলফে সেই বই দিনের পর দিন সাজানো থাকবে, যদি স্কুলে বই রাখার শেলফ থেকে থাকে। আমরা কি সেটিই করতে চাই?

যারা ফেব্রুয়ারিতে বইমেলায় গিয়েছেন, তারা সবাই নিশ্চয়ই শিশু কর্নারটি দেখেছেন। শিশুদের আনন্দ-উল্লাসে মুখরিত সেই অংশটিতে যারা একবার গেছেন কিংবা দূর থেকে যারা সেটি একবার দেখেছেন, তারা সবাই জানেন ঝলমলে বই দেখে একটি শিশু কতটা আনন্দিত হয়। প্রত্যন্ত একটি গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের যে শিশুটি সরকারি প্রাইমারি স্কুলে পড়ে এবং যে জীবনেও সুন্দর কোনো বই স্পর্শ করারও সুযোগ পায়নি, সে রকম কোনো শিশু যদি একটি নয় দুটি নয়, দুইশ'টি বই স্পর্শ করতে পারে, পড়ার জন্য বাসায় নিয়ে যেতে পারে, এর চেয়ে চমৎকার ব্যাপার আর কী হতে পারে? আমরা কি আমাদের সরকারের কাছে সেটি আশা করতে পারি না? বঙ্গবন্ধুকে সম্মান দেখানোর এর চেয়ে সুন্দর আয়োজন আর কী হতে পারে? সবাই জানেন কিনা জানি না, মুজিববর্ষ উপলক্ষে এর মাঝে অসাধারণ কিছু কাজ হয়েছে, স্কুলের পোশাক কেনার জন্য প্রত্যেক শিশুর মায়ের মোবাইল ফোনে এক হাজার করে টাকা পাঠানো হয়েছে (বাবার মোবাইল ফোনে নয়, মায়ের মোবাইল ফোনে!)। সরকারি প্রাইমারি স্কুলে একটি শিশু যদি শতকরা ৮৫ ভাগ দিন স্কুলে আসে, তাহলেই তাদের উপবৃত্তি দেওয়া হয়। সেটিও সরাসরি মায়ের মোবাইল ফোনে! কী চমৎকার একটি বিষয়। আমরা সবসময় শুধু নেতিবাচক দিকগুলো খুঁজে বের করে সেটি নিয়ে অভিযোগ করি। কিন্তু এই দেশে সীমিত বাজেটের ভেতর যে কিছু অসাধারণ ব্যাপার ঘটে যাচ্ছে, কতজন তার খবর রাখি?

কাজেই কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, আরও একটি অসাধারণ কাজ করুন, বইগুলো সঠিকভাবে নির্বাচন করুন। প্রাইমারি স্কুলের একটি বাচ্চাকে অনেকগুলো বই দেখিয়ে যদি জিজ্ঞেস করা হয়- তারা কোন বইটি পড়তে চায়, তাহলে তারা কিন্তু সঠিক বইগুলো দেখিয়ে দেবে। একটি শিশু যে কাজটা করতে পারে, বড় মানুষেরা কেন সেই কাজটি করতে পারবেন না?

২২ জুলাই ২০২০

লেখক : মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কথাসাহিত্যিক, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram - dainik shiksha Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে - dainik shiksha একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে please click here to view dainikshiksha website