বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় কেন বিশ্বর‌্যাংকিং-এ স্থান পায় না? - মতামত - Dainikshiksha


বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় কেন বিশ্বর‌্যাংকিং-এ স্থান পায় না?

শিশির ভট্টাচার্য |

প্রথমেই প্রশ্ন করি: বিশ্ববিদ্যালয় যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অংশ তার চতুরঙ্গের কোনো একটি ক্ষেত্র কি র‌্যাংকিং-এ স্থান পাবার যোগ্য? শাসন বিভাগ, আইন প্রণয়ন বিভাগ, বিচার বিভাগ, দেশরক্ষা, কৃষি, শিল্প (উভয়ার্থে), সাহিত্য, প্রকাশনা, চিকিৎসাব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র, ক্রীড়া, সেনাবাহিনী, পুলিশবাহিনী, বিচারবিভাগ, সংসদ...  কি কোনো বিচারেই বিশ্বমানের? আমাদের কৃষি সেকেলে; শিল্পজাত দ্রব্য আমরা প্রধানত আমদানিই করি; হুমায়ুন আহমেদ গত হবার পর সাহিত্যও আমরা অনেকটাই ভারত থেকে আমদানি করি; আমাদের শিল্পকর্ম বিশ্বমানের নয়। ভাস্কর্য, বিশেষ করে ঢাকা শহরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মৃণালহকীয় ভাস্কর্যগুলোর সিংহভাগ অতি কদর্য। চিকিৎসার জন্যে ক্ষমতা থাকলে আমরা সিঙ্গাপুর আর অক্ষম হলে ভারতে চলে যাই। আমলাদের ঘনঘন, কারণে-অকারণে বিদেশ পাঠাই প্রশিক্ষণের জন্যে; কিন্তু আমলাতন্ত্রের অবস্থা যে কে সেই। বিচার বিভাগ কপি-পেস্ট করে অবোধ্য-দুর্বোধ্য ইংরেজি ভাষায় যে রায় দেয় তা দেশের লোকের মাথায় ঢোকে না। বিচারে রয়েছে দীর্ঘসূত্রিতা আর টাকার খেলা। আমাদের বেশির ভাগ বুদ্ধিজীবী যে মানের প্রবন্ধ লেখে পত্রপত্রিকায়, যে মানের আলোচনা করে দৃশ্য-শ্রাব্য মিডিয়ায়, সেগুলো পড়ে-শুনে-দেখে মনে হয়, লিখবে বা বলবে কী, এরা তো এখনও চিন্তাই করতে শেখেনি। আমাদের পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা। আমাদের সমাজে হয় ঘুস, নয় ঘুষিতেই বেশির ভাগ কাজ হয়। যে পদ্মা সেতু বানাচ্ছি ভেবে আমরা আহ্লাদে অষ্টখ- হই, সেই পদ্মা সেতুও বানাচ্ছে আসলে চীনারা, আমরা শুধু টাকার যোগান দিচ্ছি। ‘অধিক আর কী বলিব’, আমরা হচ্ছি পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে ট্রাফিক সিস্টেমের লাল-সবুজ আলো নিজের মতো জ্বলে, গাড়ি ইচ্ছেমতো চলে এবং কেউ কখনও কিছু বলে না।

কোনো কিছুই যেখানে কোনো প্রকার র‌্যাংকিং-এ পড়ে না, সেখানে গত কয়েক বছর ধরে সামাজিক ও প্রথাগত গণমাধ্যমে ক্রমাগত হা-হুতাশ করা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং নিয়ে। বিশ্ব-র‌্যাংকিং দূরে থাক, এশীয় র‌্যাংকিং-এও নাকি বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নামগন্ধ নেই। চরিত্র কিংবা অর্জনের দিক থেকে প্রাইভেট হোক বা পাবলিক, বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই আসলে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ হয়ে ওঠেনি। এগুলো বড়সড় কলেজ মাত্র এবং সে কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং-এ এগুলোর কোনোটিরই থাকার কথা নয়। কিন্তু আমজনতাকে সে কথা বোঝাবে কে, বিশেষত এই আওয়াম এবং আমের মৌসুমে? আঙ্গুল তোলা হচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে, প্রধানত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে, যেটি দেশের প্রাচীনতম এবং সম্ভবত প্রধানতম বিশ্ববিদ্যালয়। যেহেতু সরকার তথা জনগণের টাকায় এই বিশ্ববিদ্যালয় চলে, সেহেতু কিছুটা জবাবদিহিতা তো থাকেই। ভাত দেবার ভাতার যদি উচিৎ সার্ভিস না পেয়ে কিল দেবার গোঁসাই হয়ে উঠে, তবে আপত্তিই বা করবেন কোন মুখে?

২০১৯ সালের সেরা ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি তালিকা রয়েছে অন্তর্জালে। তার অন্তত একটিতে দেখলাম, ১০০টির মধ্যে ৮০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়। বাকি ২০টি বিশ্ববিদ্যালয় চীন, জাপান, কোরিয়া আর সিঙ্গাপুরে অবস্থিত। এশিয়ার সেরা ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি তালিকায় এক আইআইটি ছাড়া ভারতের আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। পাকিস্তান, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড এসব দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ও নেই সেই তালিকায়। আপনি বলতে পারেন, পাকিস্তান বা থাইল্যান্ডের সঙ্গে কেন আমরা নিজেদের তুলনা করবো? করবো এ কারণে যে তুলনীয় দুই বস্তুর মধ্যেই তুলনা চলে। ইংল্যান্ড কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করলে কিছুই বোঝা যাবে না। ফিলিপাইন কিংবা ব্রাজিলের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থানটা বোঝা গেলেও যেতে পারে।

র‌্যাংকিং-এ সেরা একশতে থাকার যে শর্তগুলো রয়েছে সেগুলো পূরণ করা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল বা গরীব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে অসম্ভব না হলেও কঠিন তো বটেই। যে কোনো বিচারে অক্সফোর্ড কিংবা এম.আই.টি. সেরা বিশ্ববিদ্যালয়। এর প্রথম কারণ, এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের মধ্যে একাধিক নোবেল পুরস্কারধারী রয়েছেন। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মধ্যে কোনো নোবেল পুরস্কারধারী নেই শুধু নয়, কেউ ভুল করে ঢুকে পড়লেও নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অমর্ত্য সেনের মতো নাজেহাল হয়ে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হবেন। নোবেল পুরস্কার পেতে গেলে বিদ্যাচর্চার যে দীর্ঘকালীন পরিবেশ-মানসিকতা লাগে, সে পরিবেশ পূর্ববঙ্গে নেই, ছিল না কোনো কালে। ভাটি বা ব-দ্বীপ অঞ্চলে চাষবাস হতে পারে, কিন্তু জ্ঞানচর্চা হয় কি? সেই পরিবেশ সৃষ্টির সামর্থ্য আমাদের নেই, কখনও ছিল না। যারা এক সময় বাংলাদেশে বিদ্যাচর্চা হতো বলে দাবি করেন, তারা মূলত ‘শোনার বাংলা’ রোগে ভুগছেন। এই রোগ সংক্রামক, সুতরাং সাধু সাবধান! 

র‌্যাংকিং-এ সেরা একশতে থাকার আরেকটি শর্ত মাথাপিছু প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। প্যারিসের সর্বোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি তালিকায় স্থান পেয়েছে। আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। ছাত্রাবাসে আমার একান্ত নিজস্ব কক্ষ ছিল। আমি একা থাকতাম সেই কক্ষে। চেয়ার ছিল, টেবিল ছিল, বইয়ের তাক ছিল, বেসিন ছিল। পরিচ্ছন্ন গণবাথরুম, বিশ্রামাগার ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে আমার কক্ষের সমান ক্ষেত্রফলের একটি কক্ষে জনা দশেক শিক্ষার্থী গরু-ছাগলের মতো পরস্পরের গায়ে লেগে শোয়। মেঝেতে পাতা থাকে ক্যাম্পাসের এখান-ওখান থেকে না বলে খুলে আনা (‘চুরি করা’ বলছি না চক্ষুলজ্জাবশত) প্লাস্টিকের ব্যানার। ঘাম আর অনুরূপ একটি গন্ধে নরক গুলজার। বইপত্রের বালাই নেই, নোট বা গাইডবই সম্বল। সেগুলো আবার স্তুপ করে রাখা আছে বারান্দায়, পায়াভাঙা একটি প্লাস্টিকের শেলফে। টয়লেট যদিও জঘন্য রকম নোংরা, তা নিয়ে কারও অভিযোগ নেই, না হাউজ টিউটর বা প্রভোস্টের, না শিক্ষার্থীদের। হতে পারে, এর চেয়ে পরিষ্কার টয়লেট তারা জীবনে দেখেইনি। এ ধরনের কক্ষকে বলা হয় ‘গণরুম’। অনেকের কাছে এমন নরককুণ্ডও সোনার হরিণ। এখানে থাকতে গেলে দলের বড় ভাইয়ের নির্দেশে রাত-বিরাতেও মিছিলে যেতে হয়। কারণে-অকারণে চড়-থাপ্পড়-লাত্থি খেয়ে হজম করতে হয়। শাস্তিস্বরূপ গণরূম থেকে বহিষ্কৃত হয়ে শীতের রাতে বারান্দায় শুতে বাধ্য হয়ে নিউমোনিয়ায় মারা যাওয়ার মতো ঘটনা একাধিক ঘটেছে।

প্যারিসে মাত্র ৫ ফ্রাঁতে আমি পাঁচ পদ সুস্বাদু খাবার দিয়ে পেট ভরে খেতাম। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কী খায় সাধারণ ছাত্রেরা? ছাত্রাবাসে যে সুখাদ্য পরিবেশন করা হয় না তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হোস্টেলের ডালের গল্প কে না জানে! ছাত্রনেতারা ফাউ খাবার কারণে খাবারের মান ভালো হয় না, নাকি এর অন্য কোনো কারণ আছে জানি না। সম্প্রতি নাকি একটি হল থেকে ক্যান্টিন-পরিচালকেরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে, কারণ ছাত্রনেতারা নাকি তাদের কাছে অসহ্য রকম চাঁদা দাবি করেছে। এই মাৎস্যন্যায় পরিবেশ, অখাদ্য খাবার, মাথাপিছু এই মানের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আপনি সেরা একশ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান পাবার কথা স্বপ্নেও কি ভাবতে পারেন?  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি? আহারে! মলাটছেঁড়া, পাতাকাটা ধূলিধূসরিত একেকটি বই বার্ধক্যজনিত কারণে কোমর ভেঙে কাত হয়ে কতকাল ধরে যে এক জায়গায় পড়ে রয়েছে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া প্রায় শতাব্দীপ্রাচীন কাঠের শেলফগুলোতে! ধূলা ঝেড়ে এই বই পড়ে কার সাধ্য! ছাত্ররা এখানে নিজে এসে বই হাতে নিতে পারে না। কোন বইটি প্রয়োজন, কর্মচারীদের তারা বলবে এবং এর পর কর্মচারীরা সেই বই খুঁজে এনে দেবে। অদ্ভূত নিয়ম। ছাত্রদের হাত লেগেও তো কিছু ধূলা দূর হতে পারতো! অবশ্য বই এখানে কেউ পড়ে বলেও মনে হয় না। শিক্ষার্থীরা তো বিসিএস গাইড গিলতে ব্যস্ত। সেই একই নাক খুঁটতে থাকা, পান চিবানো আনস্মার্ট, কাজ করতে অনিচ্ছুক কর্মচারীর দল যারা কখনই একটি বই খুঁজে দিতে পারেনি আমাকে, এসে জানিয়েছে, হয় বইটি হারিয়ে গেছে, নয়তো চুরি হয়ে গেছে অথবা মিসপ্লেসড হয়েছে কোথাও। নামাজের সময় যাবেন তো কোথাও কেউ নেই, সব সুনসান। দুই শেলফের মাঝখানে হাঁটতে গিয়ে মাকড়শার জাল আটকে যাবে আপনার মাথায়। একশ বছরের পুরনো জাল হয়তো নয়, কারণ গ্রন্থাগার এবং তার ব্যবস্থাপনা একই রকম অকার্যকর থাকলেও মাকড়শারা চিরজীবী হয় না, তাদের বোনা জালও চিরস্থায়ী হবার কোনো কারণ নেই। 

প্রায় ত্রিশ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি। সাকুল্যে এই গ্রন্থাগারে ত্রিশ দিন গেছি কিনা সন্দেহ। অথচ প্যারিস, মন্ট্রিয়ল, ওসাকা, টোকিওর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পাঠাগারেই পড়ে থাকতাম। কেন যেতে ইচ্ছে করে না বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে? হতে পারে, বিদেশে থাকতে থাকতে আমার নাকটা একটু বেশিই উঁচু হয়ে গেছে, কিন্তু এমন নিম্ন মানের পাঠাগার নিয়ে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় হবার স্বপ্ন দেখা সাজে না। কীভাবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার আগাম ঘোষণা দেয়া একটি দেশের প্রধানতম বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ এবং সেই দেশের সরকার এমন একটি মুমূর্ষু পাঠাগার এখনও সহ্য করছেন ভেবে পাই না। এঁরা যখন দেশ-বিদেশে যান সরকারি খরচে, তখন কি দেখেন না, সেখানকার লাইব্রেরিগুলো কেমন? দেশের উন্নয়নই যদি না হলো, তবে দেশের টাকায় বিদেশ ভ্রমণে কী ফায়দা? কোটি কোটি টাকা খরচ হয় এই এক লাইব্রেরির পেছনে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। সর্বাঙ্গে ব্যথা, ঔষধ দিব কোথা? 

অন্তর্জালে একটি তালিকায় দেখলাম, বিশ্বের শ্রেষ্টতম একটি বিশ্ববিদ্যালয় অক্সফোর্ডে কর্মকর্তা-শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:১১, অর্থাৎ প্রতি ১১ জন শিক্ষার্থীর জন্যে একজন শিক্ষক কিংবা কর্মকর্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এর দশ বা বিশ গুণ বেশি হওয়া অসম্ভব নয়। কোনো প্রকার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই, তবুও কর্মকর্তারা কীভাবে যেন সুচারুভাবেই সম্পন্ন করেন তাঁদের সব কাজ। ধন্যবাদ তাঁদের। কিন্তু এত বেশি শিক্ষার্থীর জন্যে এত কম শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়ে কখনই বিশ্ব র‌্যাংকিং-এর ধারে কাছেও যাওয়া যাবে না।

কী রকম নোংরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক একটি টয়লেট! ডাকসু কি এদিকে নজর দিতে পারে না? বিশ্ববিদ্যালয়ের একদিক থেকে অন্যদিকে যেতে এখনও আদ্দিকালের রিকশাই ভরসা। চীনের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে দেখবেন, ক্যাম্পাসে ব্যাটারি-চালিত টমটম চলছে। ৭/৮ জন শিক্ষার্থী বসতে পারে এই টমটমে। ভারি যানবাহন অনবরত ঢুকছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। পথিকের হৃৎকম্প সৃষ্টি করে পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে তীব্রবেগে মোটর সাইকেল চালিয়ে ছাত্রনেতারা। তীব্র শব্দে মাইক বাজিয়ে মিটিং-মিছিল-র‌্যাগ ডে করার অনুমতি দেন মাননীয় প্রভোস্ট। এই শব্দদূষণে ক্লাস কীভাবে হয় ভেবে অবাক হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভিজিটে আসা ওমান দূতাবাসের এক কর্মকর্তা। এই সব মহান সুযোগ-সুবিধার অজুহাত দেখিয়ে সেরা একশতে স্থান পাওয়া কিছুটা কঠিন বটে।

সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা একেকজন জাত গবেষক হয়ে থাকেন। প্রাচীন যুগের ব্রাহ্মণের যজন, যাজন ও অধ্যাপনের মতো একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকেরও তিনটি কাজ: গবেষণা করা, করানো এবং পড়ানো। এই তিনটি কাজ যারা জানেন না তারা পাশ্চাত্যে শিক্ষক হতে পারেন না। গবেষণায় যাঁর আগ্রহ আছে, তিনি পি.এইচ.ডি. করতে করতে প্রকাশনা এবং অধ্যাপনার চেষ্টা করেন। বছর পাঁচেক এভাবে চলার পর এবং পি.এইচ.ডি. ডিগ্রি শেষ হলে কোথাও হয়তো প্রভাষক হিসেবে অস্থায়ী নিয়োগ পান। এর পর নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রবন্ধ গবেষণা পত্রিকায় মুদ্রিত হবার পর সেই নিয়োগ স্থায়ী হয়। সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং অধ্যাপক পদে পদোন্নতি হবে পদ যদি থাকে তবেই। প্রতিটি পদে নতুন করে অস্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হয় এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক পিয়ার রিভিউড প্রবন্ধ জমা দিয়ে প্রতিটি নিয়োগ স্থায়ী করতে হয়। পাশ্চাত্যে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মাধ্যমিক কিংবা স্নাতক পর্যায়ের ফলাফল নয়, গবেষণা এবং পাঠদানের ক্ষমতাই বিবেচ্য।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ কীভাবে হয়? ভালো রেজাল্ট করা ছাত্রদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিই আমরা। সেই ছাত্ররা গবেষণা করতে সক্ষম কিনা কিংবা আদৌ তাদের গবেষণা করার কোনো ইচ্ছা আছে কিনা... এসব ধর্তব্যের মধ্যেই আনা হয় না। নিয়োগপ্রাপ্ত তরুণ প্রভাষকদের একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ নিজের চেষ্টায় গবেষক হয়ে উঠতে পারলেও সিংহভাগের সেই ক্ষমতা থাকে না। ‘তিন তি বিনা নাহি গতি। সরস্বতী, প্রস্তুতি, গুরুভক্তি।’ তিন তি-র কোনটিই যাদের নেই, তারা কীভাবে গবেষক হবে? এদিকে গবেষণা ছাড়া পদোন্নতি দেবার নিয়ম নেই। তাই বলে সবাই কি আগে পরে অধ্যাপক হয় না? অবশ্যই হয়। তথাকথিত গবেষণা পত্রিকাগুলো কাগজে-কলমে পিয়ার-রিভিউড বলা হলেও আসলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই লেখক জানেন, রিভিউয়ার কে। রিভিউয়ারের উপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। চক্ষুলজ্জার খাতিরেই হোক, কিন্তু সহমর্মিতার কারণেই হোক, শিক্ষকেরা একে অপরের পৃষ্ঠপোষণ করেন, করতে বাধ্য হন। সেই সাহস কি আমার আছে যে রিফিউজ করবো কোনো প্রবন্ধ, সাহস করে এই সত্যি কথাটা কি বলতে পারবো এই জীবনে: ‘তোমার প্রবন্ধের মান নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীর গরু রচনার সমতুল্য নয়!’ আমার ঘাড়ে মাথা তো একটাই, নাকি? কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুন যেমন কৃষ্ণকে বলেছিল, সবাই তো আমার ভাই, বন্ধু, আত্মীয়, পরিচিত। এদের বুকে কী করে শর নিক্ষেপ করবো!’ সবাই আমার মুখচেনা, সুতরাং মুখরক্ষা না করে উপায় কি! এর ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। পাগলে কী না বলে, ছাগলে কী না খায়? সবই ছাপা হয় এবং সবাই প্রমোশন পান। সিংহভাগ প্রবন্ধ ‘গরুমার্কা’, যেগুলো লেখার উদ্দেশ্য আদৌ গবেষণা নয়, পদোন্নতি মাত্র। 

লেখাপড়া আজকাল কেউ করে না। সেই পরিবেশ কোথায়, প্রয়োজনই বা কী! শতকরা পাঁচ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকও বাংলা কিংবা ইংরেজি ঠিকঠাক মতো লিখতে পারেন না। এর জন্যে কে দায়ী, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের লেখাপড়ার ঘাটতি এর কারণ কিনা, সেটা গবেষণা ছাড়া কীভাবে বলবো? তবে একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, আমাদের পরিবার, আমাদের সমাজ গবেষণা কিংবা চিন্তাপ্রবণ নয়। সরকার প্রতিমাসে গবেষণার জন্যে কয়েক হাজার টাকা দেন প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে। সেই টাকায় শিক্ষকেরা বই কিনলেও দেশের প্রকাশনা শিল্প বিকশিত হয়ে আজ কোথায় চলে যেত। কিন্তু বেশির ভাগ শিক্ষকের ঘরে বই দূরে থাক, আগে যে ব্যাংকের চেকবই ছিল, ক্রেডিট কার্ড এসে ইদানিং তাও নেই। বইহীন একটা পরিবেশে শিশুরা কীভাবে মননশীল হয়ে গড়ে উঠবে? তারা তো বাবা-মাকে দেখেই শিখবে, নাকি?

চীনের ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমান। এই বিশ্ববিদ্যায়ের নতুন ক্যাম্পাস দূরে থাক, পুরনো ক্যাম্পাসেরও ধারে কাছে আসতে পারবে না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নান্দনিকতা ও সুযোগ-সুবিধায়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ডজন ডজন খাবারের জায়গা আছে। আছে দোকান, সুপার মার্কেট, চারতারকা হোটেল বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনের ভিতরেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে সেই আদ্যিকালের মধুর ক্যান্টিন আর হাকিম চত্বরের মতো নোংরা, অস্বাস্থ্যকর খাবার। ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা সংস্থা থেকে গত একশ বছরে ৫০০০ এর উপরে পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে, চীনা ভাষায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত পুস্তকের সংখ্যা কি ৫০০ অতিক্রম করেছে? এই ৫০০ পুস্তকও কি মানসম্পন্ন? এত কিছুর পরও ইউনান বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং-এ আসে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং-এর স্বপ্ন কেন দেখে? সম্প্রতি এক ডিন লন্ডনে গিয়ে এক সভায় বলেছেন, কোন একটি র‌্যাংকিং সংস্থাকে টাকা দেওয়া হয়নি বলে নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে তারা অন্যায়ভাবে র‌্যাংকিং-এ রাখেনি। পাগল নাকি পেট খারাপ বুঝি না!

পদোন্নতির জন্যে গবেষণাকে বাধ্যতামূলক করা আমাদের সামাজিক-মানসিক প্রবণতার সঙ্গে একেবারেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। স্বাভাবিক কামকে বাধা দিলে মানুষ বিকৃতকামের আশ্রয় নেবেই নেবে। যে গবেষণা করার লোক নয়, তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে গবেষণা করতে বাধ্য করা হলে সে পরিত্রাণের পথ খুঁজবেই। এর মানে হচ্ছে, আমাদের নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যেই গলদ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় সমস্যার শুরু এখানেই। যার কাজ তার সাজে, অন্য লোকের লাঠি বাজে। শিক্ষা-গবেষণায় অনধিকারী শিক্ষকদের নিয়ে কখনই বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান পাবে না। 

গোঁদের উপর বিষফোড়ার মতো আশির দশকে শুরু হয়েছে রিস্ট্রাকচারিং নামের এক কুপ্রথা পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা ৭৩-এর অধ্যাদেশে যার অস্তিত্ব নেই। মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতো পণ্ডিত অধ্যাপক হতে পারেননি, কারণ তাঁর বিভাগে পদ ছিল না। এখন পদ থাকার প্রয়োজন নেই। নির্দিষ্ট সংখ্যক বছর সার্ভিস দেবার পর, প্রয়োজনীয় সংখ্যক গবেষণার প্রমাণ দেখিয়ে কিংবা তার পরিবর্তে অন্য কোনো সার্ভিস দেখিয়ে যে কেউ অধ্যাপক হতে পারবেন। সমস্যা হচ্ছে, তিনি অবসরে গেলে কোনো অধ্যাপক পদ খালি হবে না। খালি হবে যে পদে তিনি ছিলেন সেই সহকারী বা সহযোগী অধ্যাপক পদটি, যার মানে হচ্ছে, রিস্ট্রাকচার্ড অধ্যাপক অনেকটা ভিতরে টয়োটার ইঞ্জিনযুক্ত মার্সিডিস গাড়ির মতো। সিংহচর্মাবৃত গর্ধভ। পাশ্চাত্যে একটি অধ্যাপক পদের জন্যে শিক্ষকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয় এবং যিনি সর্বাধিক যোগ্য তিনিই পদোন্নতি পান। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে মুড়ি-মুড়কির একদর। এই পরিবেশে শিক্ষকেরা গবেষণা করতে উৎসাহী হবেন কেন? গবেষণা-বিমুখ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ই বা হবে কীভাবে?

প্রাইভেট-পাবলিক কোথাও গবেষণা হচ্ছে না। লেখাপড়াও কি হচ্ছে? আগে বছরের শেষে পরীক্ষা হতো। এখন এক বছরকে দুই সেমিস্টারে ভাগ করা হয়েছে আমেরিকানদের অনুকরণ করে। পরীক্ষা নিতে নিতে শিক্ষকদের আর পরীক্ষা দিতে দিতে ছাত্রদের জীবন জেরবার। শুধু পরীক্ষাই দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা, খাতায় কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না যে মাথায় কিছু ঢুকেছে। আগে যখন বছরে একবার পরীক্ষা হতো, তখন ছাত্ররা লেখাপড়া করার সময় পেত, লেখাপড়ার বাইরে এক্সট্রা কারিকুলার কার্যক্রম করারও সুযোগ থাকতো: একটা বই পড়া, একটা নাটকে অভিনয় করা... এসবও তো শিক্ষার অঙ্গ। সেমিস্টার আসাতে সব শিকেয় উঠেছে। একাধিক সেমিস্টার থাকলে একাধিক বার খাতা দেখা এবং অন্যান্য বিল নেয়া যায় বটে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে চারটা সেমিস্টারে চার বার ফি নেওয়া যায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। সেমিস্টার সংস্কৃতি চালু করার পেছনে মালিকপক্ষ ও শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির কথাটা ভুলে গেলে চলবে না। শিক্ষক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকের পকেটে টাকা তো আসছে। ছাত্রদের মাথায় জ্ঞান ঢুকছে কি? লেখাপড়া যদি না হয় তবে গবেষণাই বা হবে কেমন করে? বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি অক্সফোর্ডে এখনও সেমিস্টার নেই, বছরান্তে পরীক্ষা হয়। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড কেন নিজের ঐতিহ্য ছেড়ে আমেরিকানদের লেজুড়বৃত্তি করছে?

এই পরিবেশ কি বদলাতে পারে না? না, পারে না। কারণ সরকার ও জনগণ চায় না এই পরিবেশ বদলাক। জনগণ মানে শিক্ষক, ছাত্র, আমরা সবাই। ছাত্রেরা রাজনীতি করে, কারণ তারা ক্ষমতা ও অর্থ চায়। ডাকসু নির্বাচন করার জন্যে সে বার বার ফেল করে, আবার ভর্তি হয়। স্বপ্ন: কোনো একদিন জননেতা ফাটাকেষ্ট হবে। সরকার তাদের দিয়ে রাজনীতি করায়, কারণ সেও ক্ষমতায় থাকতে চায়। আমাদের মধ্যে একজনও কি নিজের স্বার্থ এক চুল ছাড়তে রাজি আছি? যদি না থাকি, তবে সরকারই বা তার স্বার্থ ছাড়বে কেন? তা ছাড়া সবই ক্রীড়া বই তো নয়। দাবাখেলার কথাই ধরুন না কেন। কিস্তি কি কখনও বলতে পারবে যে আমি কোনাকুনি চলবো, কিংবা ঘোটক কি বলতে পারবে, আমি আড়াই ঘর যাবো না? তাহলে তো খেলাই বন্ধ হয়ে যাবে।

সরকারও ‘রাষ্ট্র’ নামক সতরঞ্জের একটি ঘুটি ছাড়া আর কিছু নয়, যদিও ভুল করে সে কদাচিৎ নিজেকে খিলাড়ী মনে করতেও পারে। সরকার চাইলেই কি সব অব্যবস্থার অবসান হতে পারে না? না পারে না। বাংলাদেশের সরকার প্রধান কি একবার মুখে ফুটে বলতে পারেন না: ‘আমি চাই, কাল থেকে সব গাড়ি ট্রাফিক লাইট মেনে চলবে!’ তিনি বলেন না কেন? কারণ তিনি জানেন, বললে কাজ হবে না। গাড়ি ট্রাফিক লাইট মেনে না চলাতে যাদের স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে, তারা সরকারের চেয়েও শক্তিশালী। কী জানি, কখন কী তারা করে বসে - এই অজানা ভয়ও ক্ষমতাকে তাড়িত করে বৈকি।
 
গাড়িকে সঠিক পথে চালাতে পারেন যে চালক তার যদি স্বাধীনতা না থাকে, দূরে কোথাও যাবার স্বপ্ন না থাকে, তবে গাড়ি এক জায়গাতেই ঘুরপাক খাবে। উপমহাদেশের সর্বত্র যোগ্যতা নয়, আনুগত্যের অগ্নিপরীক্ষা নিয়ে উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ হাজার শিক্ষার্থী এক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই বিপুল সংখ্যক জনতা চাইলে কী না করতে পারে। সরকার কেন চাইবে, সমমনা নয় এমন কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি ভয়ঙ্কর যন্ত্রের চালকের আসনে বসুক? যদি সেই ব্যক্তিটি কথা না শুনে, যদি বিগড়ে যায়, তাহলে তো সমূহ বিপদ। চট্টগ্রামের ভাষায় যেমন বলে, ‘হাতে ধরে কেন সরকার বাতের বড়ি খেতে’ যাবে।

যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়কে বদলানোর ক্ষমতা রাখেন, তাঁদের হয়তো উপাচার্য হওয়ার রূচি বা আগ্রহ নেই, কিংবা আগ্রহ থাকলেও তারা হয়তো ক্ষমতার পছন্দের লোক নন। ক্ষমতার পছন্দের লোক যারা, তাদের হয়তো ভিশন নেই। ভিশন থাক বা না থাক, উপাচার্য হওয়াটা একজন শিক্ষকের জন্যে সারা জীবনের মিশন। কত শত নির্বাচনের বৈতরণী কত কষ্টে পার হয়ে, কত কত সহকর্মীকে কঠিন ল্যাং মেরে কাত করে ফেলে, জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে এই বহু প্রত্যাশিত পদটি পেয়ে নিজের বউয়ের সামনে এসে তাঁরা বড় মুখ করে বুক চিতিয়ে দাঁড়ান। লেখাপড়া, গবেষণা করা আর নির্বাচন করে জিতে আসার যোগ্যতা ভিন্ন। মহাপণ্ডিত হলেই মহান নেতা হওয়া যায় না। যাদের ভিশন আছে, যারা ভালো লেখাপড়া জানেন, তাদের যদি নেতা কিংবা উপাচার্য হবার মিশন না থাকে, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ভোটার হ্যান্ডেল করার মতো বিরক্তকর কাজ করার ধৈর্য যদি তাদের না থাকে, তবে তাদের সেই ঘাটতির দায় তো সরকারের নয়। 

সুতরাং অমুক ভিসির নিয়োগ সঠিক হয় নাই, তমুক ভিসি শুদ্ধ বাংলা বলতে পারে না, ফলনা ভিসি কোনো গবেষণা করে নাই, তলনা ভিসি লোকজনের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে... এইসব নাই দুনিয়ার বাহুল্য প্যাঁচাল পেড়ে কোনো লাভ নাই। সরকার ফলনাকে নিয়োগ দিয়েছে, ফলনার চেয়ে যোগ্যতর কাউকে পায়নি বলে বাধ্য হয়েই দিয়েছে, বাধ্য না হলে কখনও দিত না, নিশ্চিত জানবেন। দয়া করে কেউ কাউকে পদ দেয় না, বাধ্য হয়ে দেয়। জীবনানন্দ জীবিত থাকলে বলতেন: ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে ভুল চাল দিতে ভালোবাসে!’ 

শুধু এ বঙ্গে নয়, ও বঙ্গেও  অবস্থা তথৈবচ। সব মিলিয়ে বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক মান সুবিধার নয়। কদিন আগে এক কনফারেন্সে গিয়েছিলাম শান্তিনিকেতনে। সেখানে গণ্ডায় গণ্ডায় উপাচার্য, ভবিষ্যতে উপাচার্য হবেন, হতে পারেন এমন অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী উপস্থিত ছিলেন উভয় বাংলার। সেখানে কারও বক্তব্যে, বিশ্বভারতীর উপাচার্য, বিশেষত উভয় বঙ্গের দুই নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বক্তব্যে যুক্তি, জ্ঞান বা ভিশন তো দূর কী বাত, কাণ্ডজ্ঞানের ছাপও আছে বলে মনে হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, কোনো অপোগণ্ড বালকের কথা শুনছি। এর প্রধান কারণ, দলীয় নিয়োগ। কথাটা আমি নয়, অনেকেই বলছিল সেখানে। যোগ্য ব্যক্তি নিয়োগ পাচ্ছেন না দলীয় আনুগত্যের অভাবে।

লেখাপড়া যে করে না, সে কীভাবে নতুন কথা বলবে?  লেখাপড়া যে করে, তার দলবাজি করার অবসর থাকার কথা নয়। যে দলবাজি করে না, তার পক্ষে উপাচার্য হওয়া অসম্ভব। হিসাব অতি সোজা। আগে পরে স্বীকার করতেই হবে, আমরা সবাই সিস্টেমের শিকার। এক অদ্ভুত গোলক-ধাঁধা বা ভুলভুলাইয়ায় আটকে আছি আমরা সবাই। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলছি বটে, কিন্তু আমি নিশ্চিত, শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ, দেশরক্ষা বিভাগ, ব্যবসা, সংস্কৃতি... অবস্থা বাংলাদেশের সব সেক্টরে এক, ফারাক উনিশ আর বিশ। অবস্থা কিংবা দূরবস্থা, যাই বলুন। যতদিন লাল আলোতে গাড়ি চলবে, ততদিন অবস্থা বদলাবে না।

পরিত্রাণের উপায় আছে বৈকি: অপেক্ষা আর প্রার্থনা। ওয়েটিং ফর গোদো ব্রেখটের নাটক। ঈশ্বরে কেউ বিশ্বাস করুন বা না করুন, ভরসাটা তেনার উপর করতে বাধ্য আমরা। যদি কখনও সেই মহোদয় বাঙালি জাতির প্রতি সুপ্রসন্ন হন, মুখ তুলে চান, তবে সরকার এমন কোনো ব্যক্তিকে উপাচার্য নিয়োগ দিয়েও ফেলতে পারেন যাঁর অল্পস্বল্প ভিশন আছে। কিন্তু সেই ভীষণ ভালো ঘটনাটি ঘটার জন্যে আমাদের ভীষণ রকম অপেক্ষাও করতে হতে পারে। ঈশ্বরের কখন কী মর্জি হয় তা আমরা মরণশীল মনুষ্যের জানবার কথা নয়। 

ততদিনে বিশ্বের বাকী সব বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং-এ এগিয়ে যাবে এবং আমরা ‘হা র‌্যাংকিং, হা র‌্যাংকিং’ মাতম করতে করতে পড়ে থাকবো পেছনে, বহু পেছনে। কেউ কেউ ঢাকা কিংবা অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে দোষ দিয়ে মনে শান্তি পেতে পারেন, কিন্তু ‘ভূতাবস্থা অপরিবর্তিত থাকিলে’ প্রাইভেট তো দূর কী বাত, বাংলাদেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের জীবনকালে র‌্যাংকিং-এ স্থান পাবে না, অলৌকিক কিছু যদি না ঘটে যায়।

লেখক: অধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
গভর্নিং বডি-ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা সংশোধনের সিদ্ধান্ত বৃহস্পতিবার - dainik shiksha গভর্নিং বডি-ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা সংশোধনের সিদ্ধান্ত বৃহস্পতিবার সরকারি স্কুলের ৪৯ শিক্ষককে বদলি - dainik shiksha সরকারি স্কুলের ৪৯ শিক্ষককে বদলি সরকারিকরণ করলে সরকারেরই লাভ : শাব্বীর মোমতাজী (ভিডিও) - dainik shiksha সরকারিকরণ করলে সরকারেরই লাভ : শাব্বীর মোমতাজী (ভিডিও) প্রশ্নকর্তা ও মডারেটর খুঁজছে পিএসসি - dainik shiksha প্রশ্নকর্তা ও মডারেটর খুঁজছে পিএসসি ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা সংশোধনের সিদ্ধান্ত ২২ আগস্ট - dainik shiksha ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা সংশোধনের সিদ্ধান্ত ২২ আগস্ট কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে - dainik shiksha কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে ঢাবিতে ১ম বর্ষ ভর্তি বিজ্ঞপ্তি - dainik shiksha ঢাবিতে ১ম বর্ষ ভর্তি বিজ্ঞপ্তি শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন - dainik shiksha শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website