বিএড স্কেল কীভাবে উচ্চতর গ্রেড হয়? - মতামত - দৈনিকশিক্ষা


বিএড স্কেল কীভাবে উচ্চতর গ্রেড হয়?

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী |

বেসরকারি শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড দেবার আগেই রীতিমত নাটক শুরু হয়ে গেছে। উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা পেলে শিক্ষকদের দৈন্যদশা কিছুটা লাঘব হবে মনে করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সর্বোপরি সরকারকে অনেকবার ধন্যবাদ দিয়েছি। এখন মনে হচ্ছে চাঁদ হাতে দেবার মিথ্যে লোভ দেখিয়ে শিশুদের যেমন ঘুম পাড়ানো হয, তেমনি উচ্চতর স্কেল বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য একটি মিথ্যে প্রলোভন। 

রাজনীতি বিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে ‘আমলাতন্ত্র’ আর ‘লাল ফিতার দৌরাত্ম্য’ পড়েছিলাম। তখন এ দুটি বিষয়ে তেমন স্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারিনি। কেন জানি বিষয় দুটো বরাবর দুর্বোধ্য ঠেকেছে। আজ কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে এসে উচ্চতর গ্রেড প্রসঙ্গে নানা টালবাহানা আর অজুহাত দেখে ‘আমলাতন্ত্র’ ও ‘লাল ফিতার দৌরাত্ম্য’ দুটি বিষয়ই সহজে বুঝতে পেরেছি। আজ সহজে উপলব্ধি করতে পেরেছি, ‘আমলাতন্ত্র কাকে বলে’ আর ‘লাল ফিতার দৌরাত্ম্য’ কী জিনিস। সঠিক উদাহরণে দুর্বোধ্য যে কোনো বিষয় সহজে বোধগম্য হয়ে ওঠে।

আজকাল লেখাপড়ায় সৃজনশীল প্রশ্নের ব্যবহার। আমাদের সময় পরীক্ষায় ‘রচনামূলক’ ও ‘সংক্ষিপ্ত’ দু’ ধরণের প্রশ্ন আসতো। সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের উত্তরে ‘উদাহরণ’ দেবার কথা বলা হতো। আজ তেমন হলে ‘আমলাতন্ত্র কী’ কিংবা ‘লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কাকে বলে’-এ জাতীয় প্রশ্নের উত্তরে  বেসরকারি শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড একটি যথার্থ উদাহরণ হতে পারতো।

মনে হয় উচ্চতর গ্রেডের বিষয়টি আস্তে আস্তে ধোঁয়াশার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। যারা বেসরকারি শিক্ষকদের কষ্ট দিয়ে তৃপ্তি পায়, তাদের হাতে এটি ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে। উচ্চতর গ্রেড নিয়ে নানা ধুম্রজাল সৃষ্টি হচ্ছে। স্পষ্টীকরণের নামে চিঠি চালাচালি করে এটিকে অধিকতর অস্পষ্ট করে তোলা হচ্ছে। উচ্চতর স্কেল নিয়ে জটিলতা সৃষ্টির মানে কী? আমার বোধগম্য হয় না যে, কথায় কথায় কোনো কিছুর জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে দৌড়ে যেতে হবে কেন? শুধু অর্থ মন্ত্রণালয়ে দৌঁড় দেবার কোনো মানে হয় না। কেননা, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আমলারাও বেসরকারি শিক্ষকদের ভালো চোখে দেখে বলে মনে হয় না। বেসরকারি শিক্ষকদের দুর্ভাগ্য যে, তাদের কাছে লেখাপড়া করে যারা উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাদের অনেকে নিজেদের শিক্ষকদের চেয়ে বড় ও মর্যাদাবান মনে করে থাকেন।

এক মন্ত্রণালয় থেকে আরেক মন্ত্রণালয়ে ফাইল চালাচালি শিক্ষকদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে রাখার দুষ্ট বুদ্ধি ছাড়া কিছু নয়। দুর্বুদ্ধি দিয়ে দুর্বৃত্তরা শিক্ষকদের বরাবর নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখে। এমনিতে অর্থ মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে তেমন ভালো সম্পর্ক কোনোদিন থাকে না। এই সরকারের গত আমলের অর্থমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর বাড়ি এক জেলায় হওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে তেমন সম্পর্ক ছিল না বলেই জানি। সে সময়ের শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেল দেবার কথা বার বার বলেও শেষমেষ কিছুই দিতে পারেননি। অবশেষে ‘দ্বিগুণ বাড়িভাড়া’ আর ‘পাঁচগুণ চিকিৎসা ভাতা’ দেবার তৃপ্তির ঢেকুর তুলে তাকে বিদায় নিতে হয়েছে। এই অবস্থায় অর্থ মন্ত্রণালয় কোনোদিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে কোনো সুপরামর্শ দিয়েছে কিংবা দেবে বলে  মনে হয় না। তদুপরি, কোনো মন্ত্রণালয়ের আমলারাই শিক্ষকদের সুনজরে দেখেন না। এরাই শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া ১০০০ টাকা দেয়, যে টাকায় বাড়ি কিংবা বাসা ভাড়া পাওয়া দূরে থাক বস্তিতে একটি ঝুপড়ি ঘরও ভাড়া মেলে না। ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা দেয়, যেটি দিয়ে শিক্ষকের নিজের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পর্যন্ত চলে না। মা-বাবা, স্ত্রী, পরিজন ও সন্তান-সন্ততি বাঁচলে বাঁচুক কিংবা মরলে মরুক। আজকাল মোল্যাদের থেকে একটি তাবিজ কিংবা একটু তেল পড়া আনলেও  পাঁচশ-এক হাজার টাকা হাদিয়া দিতে হয়।

উৎসব ভাতার বিষয়টি আরও লজ্জাজনক। হাঁস-মোরগ দিয়ে কোরবানি দেয়ার বিধান থাকলে কথা ছিল না। কেবল ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, কোরবানি দিতে না পারলে শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদাও বাঁচে না। সিকি বোনাস দিয়ে ধর্মীয় দায়িত্ব আদায় আর সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন রাখা কঠিন কাজ। 

উচ্চতর গ্রেড নিয়ে তামাশার কারণে মাথা-মগজ নষ্ট হবার উপক্রম। যোগদান থেকে উচ্চতর গ্রেডের প্রান্তিক যোগ্যতা হিসেব করে প্রতিষ্ঠান প্রধান পর্যন্ত সবার জন্য উচ্চতর গ্রেড অবারিত হওয়া উচিত ছিল। এমপিওভুক্তির তারিখ থেকে নয়, যোগদানের দিন থেকে হিসেব করে অভিজ্ঞতা বের না করলে অনেকেই লাভে-মূলে সবই হারাবেন।

বিএড স্কেল কীভাবে উচ্চতর স্কেল হয়? এটি কে মানবে? শিক্ষকতা পেশায় বিশেষ করে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকতার জন্য বিএড একটি অপরিহার্য বা অত্যাবশ্যকীয় ডিগ্রি। এটি অর্জন করে একজন শিক্ষক কাম্য স্কেলে উন্নীত হয়ে থাকেন মাত্র। এর আগ পর্যন্ত তিনি নিম্ন ধাপে বেতন প্রাপ্য হন বটে। অতঃপর বিএড ডিগ্রি নিয়ে তিনি কাম্য স্কেল লাভ করেন। শিক্ষকতা শুরু করার আগে কেউ বিএড ডিগ্রি অর্জন করে থাকলে তিনি প্রারম্ভিক বেতন স্কেল হিসেবে বিএড স্কেল প্রাপ্য হন। তাহলে কি ধরে নেব, তিনি শুরুতেই একটি উচ্চতর গ্রেড পেয়ে গেছেন? শিক্ষকতা শুরু করার পর কেউ একজন দুই বছরের মধ্যে বিএড ডিগ্রি অর্জন করলে তিনি কি বিএড স্কেল প্রাপ্য হন না? নাকি বিএড স্কেলের জন্য তাকে আরও ১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে? এভাবে হলে তো আর কেউ বিএড ডিগ্রি নিয়ে পেশাগত উৎকর্ষতা বৃদ্ধির জন্য আগ্রহী হবে না। অনেক শিক্ষক টাকা পয়সা খরচ করে বিএড ডিগ্রি অর্জনে কোনো লাভ দেখতে পাবেন না। এই সব শিক্ষকদের অধিকার থেকে বঞ্চিত  রাখার কুট কৌশল ছাড়া আর কিছু নয়।

যোগদান থেকে অভিজ্ঞতা হিসেব না করে এমপিওভুক্তি থেকে হিসেব করে উচ্চতর গ্রেড দেয়া যেমন শিক্ষকদের বঞ্চিত করে রাখার অপপ্রয়াস, তেমনি বিএড স্কেলকে উচ্চতর গ্রেড গণ্য করা চরম হঠকারিতা ছাড়া কিছু নয়। বেসরকারি শিক্ষক সমাজের সাথে এসব অশুভ আচরণ বৈ কিছু নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে যে শিক্ষক সমাজ অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলসহ ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট ও বৈশাখি ভাতা পেয়ে নিরন্তর সরকারিকরণের স্বপ্ন দেখে চলেছেন, সেই শিক্ষক সমাজের কাছ থেকে অতিরিক্ত ৪ শতাংশ কর্তন আদায়সহ শিক্ষকদের স্বার্থবিরোধী নানা গেজেট প্রকাশ করে যারা সরকারিকরণকে প্রলম্বিত করতে চায় তারা দেশ ও জাতির এক চরম ক্ষতি সাধনে লিপ্ত রয়েছে। এরা শিক্ষকদের ভালোবাসতে পারে না। এরা শিক্ষা ও শিক্ষকদের পঙ্গু রেখে সাহেদ-সাবরিনা-আরিফদের উপরে তুলতে চায়। এরা তাদের স্বজন। ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে শিক্ষক সমাজকেই এদের প্রতিহত করতে হবে। নিজেদের মাঝে ঐক্য গড়ে তোলা ছাড়া বেসরকারি শিক্ষকদের সামনে আজ আর অন্য পথ খোলা নেই।

লেখক : অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী, অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট এবং দৈনিক শিক্ষার সংবাদ বিশ্লেষক।




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram - dainik shiksha Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে - dainik shiksha একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে please click here to view dainikshiksha website