বিজয় দিবসসহ বিশেষ দিবসে বিদ্যালয় ছুটি কেন? - মতামত - Dainikshiksha


বিজয় দিবসসহ বিশেষ দিবসে বিদ্যালয় ছুটি কেন?

মো. সিদ্দিকুর রহমান |

৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম  বাংলাদেশ। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসীদের বেশে কতিপয় স্বার্থানেষী রাজনীতিবিদ। বঙ্গবন্ধুর ও স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির প্রতি তাদের কৃত্রিম ভালোবাসা আজ জাতির কাছে উন্মোচিত। 

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নিঃশেষ করে দিতে পচাঁত্তরে জাতির জনককে হত্যা করা হয়। কত ত্যাগের বিনিময়ে এ দেশের স্বাধীনতা অর্জন হয়েছে তা নতুন প্রজন্মকে জানানো আমাদের কর্তব্য। অথচ কুটকৌশলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীকে এ জানার অধিকারে অনেকটা বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। প্রতিবছর আমাদের মাঝে আসে বাঙালির হাজারো বছরে প্রাচীনতম প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের চিরাচরিত ঐতিহ্য বাংলা নববর্ষ। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উৎসবের দিন ছাড়া বাঙালি জাতির রয়েছে বিশেষ গৌরবময় দিবস।

বাঙালি জাতির মতো গৌরবময় সংগ্রামী ইতিহাস অন্য কোনো জাতির নেই। পৃথিবীতে ভাষার জন্য আর কোন জাতিকে রক্ত দিয়ে মর্যাদা অর্জন করতে হয়নি। আজ মহান একুশ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্থান পেয়েছে। একুশের শহীদদের মহান আত্মত্যাগে এবং একাত্তরে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে বাঙালি অর্জন করেছে মহান স্বাধীনতা। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে রঞ্জিত এ স্বাধীনতা বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন। বাঙালির স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, ২৫ মার্চের বিভিষীকাময় গণহত্যা দিবস,শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের মাঝে জাতির সংগ্রামী স্বাধীনতার ইতিহাস লুকায়িত আছে।

বাঙালি জাতির গর্ব জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন বা জাতীয় শিশু দিবস ছাড়া বাঙালি জাতির জনকের বিয়োগান্ত জাতীয় শোক দিবসসহ সকল দিবসের তাৎপর্য, ঘটনা, ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জানা প্রয়োজন।  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশ নেত্রী শেখ হাসিনা স্কুলে জঙ্গিবাদ বিরোধী কাউন্সিলিং নি:সন্দেহে একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে বাঙালি জাতির সংস্কৃতি, ইতিহাস বিশেষ করে আগামী প্রজন্মের জানা প্রয়োজন। মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি সম্পর্কে বিশদভাবে জানা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। তাদের ভালোবাসা ঈমানের অঙ্গ। এ ভালোবাসা জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে তাদের ধর্ম-কর্ম, আচার-অনুষ্ঠান পালন করবে। ধর্ম-কর্ম আচার অনুষ্ঠান পৃথক হলেও উৎসব সকলের। এর মাধ্যমে পারস্পারিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও  ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হবে।

ধর্মীয় উৎসব ব্যতিরেকে বাঙালি জাতীয় দিবস বা বিশেষ দিবস একসাথে উৎসব মুখর পরিবেশে পালন করে আসছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ সরকারের সময়েও স্বাধীনতার ঘৃণ্য শত্রুরা অভ্যন্তরে থেকে বাঙালি জাতির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে ভালভাবে না জানাতে নানা কৌশলের আশ্রয় নেয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ প্রান্তে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী অনুভব করেছিল বাঙালি জাতিকে নিশ্চিন্ন করতে হলে সর্বাগ্রে মেধাশূন্য করতে হবে। সে লক্ষ্যে তারা দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে ধরে নিয়ে হত্যা করে। সে ন্যাক্কারজনক ঘটনাকে সামনে রেখে ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করা হয়।

অথচ আজকের প্রজন্ম বুদ্ধিজীবী দিবসের ঘটনা, তাৎপর্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে পারছে  কি? মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সরকারের আমলে প্রশাসনের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা একটি ঘৃণ্য চক্র জাতীয় দিবস বা গুরুত্বপূর্ণ দিবসকে ছুটির তালিকায় ছুটি দেখিয়ে পালন করার নির্দেশ দেয়। ছুটি থাকায় শিক্ষকরা উক্ত দিবস পালনে আন্তরিকতার পরিবর্তে বিরুপ মনোভাব নিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষকদের উপস্থিতি অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি শহরাঞ্চলে নগণ্য হলেও গ্রামাঞ্চলে উপস্থিতি হয় না বললেই চলে। তার অন্যতম কারণ ছুটি থাকায় শিক্ষার্থী উপস্থিতি বাধ্যতামূলক নয়।

ছুটি থাকায় শিক্ষার্থীর হাজিরা নেওয়ার কোন সুযোগ নেই।  শিক্ষকদের হাজিরা খাতা স্বাক্ষরের পরিবর্তে ছুটি দেখানো হয়। তাই স্বল্প সময় কোথায় কোথায় দায়সারাভাবে উৎসববিহীন বিষন্নমনে শিক্ষকদের দিবসসমূহ পালন করতে দেখা যায়। দিবসগুলোর ঘটনা, তাৎপর্য ও সংগ্রামী ইতিহাস শিশুদের জানানোর জন্য ছুটি না রেখে কর্মদিবস ঘোষণা না মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে আগামী প্রজন্মকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। উক্ত ছুটিগুলো গ্রীষ্মের ছুটির সাথে যোগ করে ১৫ দিন করার মাধ্যমে অন্যান্য সরকারি কর্মচারীর মত প্রাথমিকের শিক্ষকেরা তিন বছর পর পর শ্রান্তিবিনোদন ভাতা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা পাবে। দিবসগুলো কর্মদিবস ঘোষণার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, স্বাধীনতার ইতিহাস জানার অধিকার ও জঙ্গিবাদ বিরোধী কার্যক্রম সুদৃঢ় হবে। শিক্ষকরা পাবে সরকারি কর্মচারীর মত শ্রান্তিবিনোদন ভাতা প্রাপ্তির অধিকার।

দিবসগুলো কর্মদিবস ঘোষণার মাধ্যমে শিক্ষার্থী শিক্ষকদের অধিকার নিশ্চিত করে প্রাথমিকে দিবস পালন উৎসবমুখর হোক। এ প্রত্যাশা কী অযোক্তিক? প্রাথমিক শিক্ষকেরা তো বাড়তি অর্থ ও ছুটির তালিকায় নির্ধারিত ছুটির বেশি দাবি করছেনা। তাহলে কোন দৃষ্টিকোন থেকে প্রাথমিক ও গণ শিক্ষামন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে অনাহুত সময়ক্ষেপণ করে মুক্তিযুদ্ধের সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন? শিগগির মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী, সচিব ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন বলে আশাবাদী।

সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় আগামী প্রজন্ম গড়ে উঠুক দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অধিকার রক্ষার মাধ্যমে উৎসবমূখর পরিবেশে জাতীয় দিবসসহ বিশেষ দিবস স্কুল খোলা রেখে পালন করা হোক এ প্রত্যাশা।

 

লেখক : আহ্বায়ক, বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ এবং প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরাম; সম্পাদকীয় উপদেষ্টা, দৈনিক শিক্ষা।




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
ঢাকার এসএসসি’র প্রশ্নে ভুলকারী যশোরের ২০ শিক্ষকের শাস্তি - dainik shiksha ঢাকার এসএসসি’র প্রশ্নে ভুলকারী যশোরের ২০ শিক্ষকের শাস্তি কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে শ্রম বাজারের সাথে সঙ্গতি রেখে কারিকুলাম প্রণয়ন করতে হবে: শিক্ষামন্ত্রী - dainik shiksha কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে শ্রম বাজারের সাথে সঙ্গতি রেখে কারিকুলাম প্রণয়ন করতে হবে: শিক্ষামন্ত্রী প্রাণসহ ৫ কোম্পানির নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রি, সাত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা - dainik shiksha প্রাণসহ ৫ কোম্পানির নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রি, সাত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা কলেজের নবসৃষ্ট পদে এমপিওভুক্তির নির্দেশনা - dainik shiksha কলেজের নবসৃষ্ট পদে এমপিওভুক্তির নির্দেশনা একাদশে ভর্তি নিশ্চায়ন করবেন যেভাবে - dainik shiksha একাদশে ভর্তি নিশ্চায়ন করবেন যেভাবে একাদশে ভর্তিতে সর্বোচ্চ ফি ১০ হাজার টাকা - dainik shiksha একাদশে ভর্তিতে সর্বোচ্চ ফি ১০ হাজার টাকা নেপালে স্কুলে চীনা ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক! - dainik shiksha নেপালে স্কুলে চীনা ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক! জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া সহকারী অধ্যাপক স্কেল পেলেন কারিগরির ১৩ প্রভাষক - dainik shiksha সহকারী অধ্যাপক স্কেল পেলেন কারিগরির ১৩ প্রভাষক শিক্ষক নিবন্ধন: এগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের নতুন সিলেবাস দেখুন - dainik shiksha শিক্ষক নিবন্ধন: এগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের নতুন সিলেবাস দেখুন please click here to view dainikshiksha website