আমাদের সঙ্গে থাকতে দৈনিকশিক্ষাডটকম ফেসবুক পেজে লাইক দিন।


বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক :মর্যাদা ও দায়িত্ব

সজল চৌধুরী | জানুয়ারি ৪, ২০১৬ | মতামত

উচ্চশিক্ষার্থে দেশের বাইরে আসার দরুন বাইরের উন্নত শিক্ষা পদ্ধতি এবং শিক্ষকদের হালচাল পর্যালোচনা করার একপ্রকার সুযোগ তৈরি হয়েছে – যার দরুন খুব কাছ থেকে পার্থক্যগুলো একেবারে চোখের সামনে ধরা দিচ্ছে। আর এর সাথে তৈরি হচ্ছে কিছুটা হতাশা আর নিজেদের অবস্থানকে নিরিখ করে দেখার অবকাশ। জাপানসহ উন্নত বিশ্বের সামাজিক প্রেক্ষাপটে সর্বোপরি যে কোন স্তরের শিক্ষকদের মূল্য যে কতো বেশি চোখে না দেখলে সেটি আমাদের মতো দেশের শিক্ষকদের বোঝা এতোটা সহজ নয়। বেতন কাঠামো থেকে শুরু করে জীবন যাপনের ব্যবস্থাপনা—সামাজিক সম্মান সকল ক্ষেত্রে যেন পরিপূর্ণতার বহিঃপ্রকাশ। তাদেরকে দেখলে গর্ব হয়—একথা ভেবে আমিও একজন শিক্ষক আবার কষ্টও হয় পার্থক্যটা যখন চোখের সামনে এসে যায়। অতি প্রাচীনকাল থেকে এসব দেশে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের থেকে সাংগঠনিকভাবে সম্পূর্ণ আলাদা এবং মূল্য অনুযায়ী অনেক বেশি। যদিও টাকাই সবকিছু নয় একজন শিক্ষকের কাছে – তথাপি সামাজিক প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব খুব কম নয়। ২০১২’র তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষকদের বেতন কাঠামোর দিক থেকে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ভারতসহ উন্নত প্রায় সকল দেশেই এর অবস্থান অত্যন্ত উঁচুতে। জাপানে প্রতিমাসে একজন শিক্ষক (গ্রেড-১ থেকে গ্রেড-১০) প্রায় আড়াই লাখ ইয়েন (গ্রেড-১১ থেকে গ্রেড-২০) প্রায় সাড়ে তিন লাখ ইয়েন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আনুমানিক সাড়ে পাঁচ লাখ ইয়েন কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে এরও বেশি পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার কথা যদি ধরা হয়—সেখানে শুধুমাত্র সাউথ অস্ট্রেলিয়াতে ৬৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে শুধুমাত্র শিক্ষা ক্ষেত্রে—যেখানে একজন শিক্ষকের সর্বনিম্ন বাত্সরিক আয় ৪১,১০৯ মার্কিন ডলার আর সর্বোচ্চ আয় ৯৫,১০১ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যার মূল্য প্রায় মাসিক ছয় থেকে সাড়ে ছয় লাখ টাকা। এখানকার (উন্নত বিশ্ব বলতে সাধারণত যা বোঝায়) শিক্ষকদের মধ্যে যারা অধ্যাপক এবং সহযোগী অধ্যাপক—তারা সকলেই দিনরাত গবেষণা নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে, অন্যান্য দিকে তাকানোর সুযোগ তাদের বিন্দুমাত্র নেই বললেই চলে—সত্যি কথা বলতে তাদেরকে অন্যদিকে তাকাতেও হয় না-কারণ প্রশাসনিক সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য এসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রয়েছে সমুন্নত অবকাঠামো এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে গবেষণা অনুদানের ব্যবস্থাপনা। জাপানের প্রায় সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয় সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্থায়ীভাবে শিক্ষক নিয়োগে আগ্রহী নয় এমনকি গবেষণাকল্পে কোন শিক্ষকের ভূমিকা বছরান্তে কেমন—তার উপর নির্ভর করে তার পদমর্যাদা এবং আনুষঙ্গিক বিষয়াদি—যার দরুন একজন শিক্ষককে প্রায় সবসময়ই গবেষণা কর্মকাণ্ড এবং তদসংলগ্ন বাজেটের কথা মাথায় রেখে ছুটে বেড়াতে হয় দেশে বিদেশে—সেখানে রাজনৈতিক প্ররোচনা, দলীয়করণ আর চাটুকারিতা করার স্থান এবং সময় কোথায়? অথচ আমাদের দেশের শিক্ষকদের কারণে অকারণে প্রশাসনিক কিংবা দাপ্তরিক কাজে খুব বেশি মাথা ঘামাতে হয় সর্বত্র- যার ফলে গবেষণা আর ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠদান করা হয়ে ওঠে তাদের গৌণ লক্ষ্য এবং শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হয় সুনিশ্চিতভাবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূল উদ্দেশ্য গবেষণা করা হলেও সময় কোথায় অভিজ্ঞ শিক্ষকদের কিংবা নেই কোন পরিবেশ? আর যদিও কোন সুযোগ তৈরি হয়, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব এবং বিভিন্ন জটিলতায় সেটিও অংকুরে বিনষ্ট হয়। অথচ এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নিয়ে দেশে কখনও শিক্ষক সমিতি-ফেডারেশনগুলোকে সঠিক পন্থায় সোচ্চার হতে দেখা যায়নি।

এ সমস্যাগুলো নিয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ শিক্ষকরা নির্বিকার থেকেছেন দিনের পর দিন। আর এভাবেই দিন দিন আমরা ভাষা হারিয়ে ফেলেছি ভালো কিছু বলার, নতুন কিছু করার এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ গঠনকল্পে। একটা সময় ছিল যখন আমাদের সমাজ যে কোন শিক্ষকদের এতোটাই মূল্য দিতো যখন সমাজের কর্তাব্যক্তিরা শিক্ষকদের দ্বারপ্রান্ত হতেন গঠনমূলক পরামর্শ নেবার জন্যে—জ্ঞানগর্ব আলোচনা করার জন্য—আর আজ দিন বদলেছে—গ্রামের সেই শুভ্র সফেদ পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত স্কুলের হেডমাস্টার আর শিক্ষকবৃন্দ যখন নিজেদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে রাজপথে তীব্র দাবদাহে জলকামান খায়, ঠিক তখনই আমাদের অভিজ্ঞ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকমন্ডলী টেলিভিশন সেটের সামনে বসে টকশোতে ব্যস্ত থাকেন আলাপচারিতায়—ক্ষমতায়নের লোভে। সেদিনও আমরা সোচ্চার হতে পারিনি। এই সুবিধাবাদী সমাজে একতরফাভাবে শুধুমাত্র সরকারের ঘাড়েই দোষ চাপালে চলবে না, আমাদের নিজেদের দিকেও তাকাতে হবে—চিহ্নিত করতে হবে আমাদের মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ধারাবাহিক ক্রমবিন্যাসকে। যে কোন জাতি একজন শিক্ষকের মূল্য তখনই অনুধাবন করতে পারবে যখন একজন উন্নয়নশীল দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে বর্তমান সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপটে কি গবেষণায় অথবা কি সামাজিক উন্নয়নে কতটুকু ভূমিকা আমরা পালন করতে পেরেছি স্ব স্ব অবস্থান থেকে তার মাপকাঠির উপর— অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র ব্যক্তিস্বার্থের কাছে তার কিছুই হয়নি আজঅবধি। পক্ষান্তরে আমরা দ্বিধান্বিত হয়েছি, বিভাজিত হয়েছি সকল ক্ষেত্রে যার প্রমাণ আজও সুস্পষ্ট। অথচ দেশের বাইরে দেখছি ভিন্ন রূপ। অধ্যাপক মানেই কক্ষভর্তি প্রয়োজনীয় বইয়ের সমারোহ, রয়েছে গবেষণার আর সংযোগ স্থাপনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ এবং সুযোগ-সুবিধা। অথচ ভাবতেও কষ্ট হয় আমাদের দেশে এসব সুবিধা পেতে একেকজন শিক্ষককে হরেক রকম বিড়ম্বনা পোহাতে হয়, অন্যদিকে অনেকে নির্দিস্ট পদোন্নতি হবার পর পরই গবেষণা ও অন্যান্য উন্নয়ন ক্ষেত্রে মুখ থুবড়ে থমকে পড়েন। এমন সব উদাহরণ খুব কাছ থেকে অনেক শিক্ষকই অবলোকন করেছেন। অথচ এগুলো আমাদের মধ্যে কখনও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেনি সম্মিলিতভাবে। তবে একথা অনস্বীকার্য যে, যে কোন প্রেক্ষাপটেই নিজেদের কথা যদি বলতে নাই পারা যায় তাহলে একসময় সরকার থেকে শুরু করে কোন পক্ষই তাদের সাফাই গাইবে না। একথা প্রমাণিত যে, মেধাবীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার সুযোগ পেয়ে আসছেন (অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ব্যতিরেকে)—তবে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এই সত্যটি আর কতদিন টিকে থাকবে সেটি অবশ্যই দেখার বিষয়- কারণ একজন মেধাবী তার মেধা নিয়ে যখন শিক্ষকতায় আসেন এবং দেখতে থাকেন প্রশাসনের প্রায় সবক্ষেত্রেই তোষামোদী, স্বেচ্ছাচারিতা—তখন তাদের স্বপ্নগুলো উড়ে যায় বকপক্ষী হয়ে—দেশ তাদের কাছ থেকে পায় না কিছুই। আর এর দায়ভার আমাদের নিজেদেরকেই নিতে হবে। নিজ নিজ দায়িত্ব ভুলে তেল মাথায় তেল দিয়ে সাময়িকভাবে হয়তো লাভবান হওয়া যায়—সেক্ষেত্রে দেশ জাতি পায় না কিছুই – আর এভাবেই আমরা হারাচ্ছি আমাদের মূল্যবোধ। আর সেটি ব্যতিরেকে শ্রেণীকক্ষের সব থেকে মেধাবী আর চৌকস ছাত্র-ছাত্রীটি কি বুক উঁচিয়ে বলতে পারবে, আমার জীবনের লক্ষ্য শিক্ষক হওয়া? আর শিক্ষকদের মূল্য ঠিক তখনই সমাজ উপলব্ধি করতে পারবে।

লেখক : সজল চৌধুরী

সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম (বর্তমানে জাপানের গবেষণারত)

[email protected]

আপনার মন্তব্য দিন