ব্যাঙের ছাতার মত কিন্ডার গার্টেন আর মাদ্রাসা - বিবিধ - Dainikshiksha


ব্যাঙের ছাতার মত কিন্ডার গার্টেন আর মাদ্রাসা

আলী হোসেন, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি |

PHOTOলক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে ওঠেছে শতাধিক কিন্ডার গার্টেন, ক্যাডেট স্কুল এবং মাদ্রাসা। শিক্ষার মানন্নোয়ন নয় ব্যবসাই মূল লক্ষ্য এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মালিকদের। অনেক প্রতিষ্ঠানে নেই শিক্ষার পরিবেশ।

ছোট পরিসরে ঘাদাঘাদি করে পাঠদান, অদক্ষ ও তুলনামূলক স্বল্প শিক্ষিত শিক্ষকদ্বারা পাঠদান, সরকারের পাঠ্য বইয়ের তুলনায় নিজেদের বইকে প্রাধান্য দেয়া এবং অতিরিক্ত বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দেয়া, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সঠিকভাবে তুলে না ধরা, অসহনীয় ভর্তি ফি আদায়, অতিরিক্ত মাসিক বেতন, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার নামে মাসে মাসে পরীক্ষা ফি আদায়, শ্রেণি কার্যক্রম শুরুর আগে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন না করার অভিযোগসহ জাতির জনকের প্রতিকৃতি প্রদর্শন করা হচ্ছেনা ব্যক্তি পর্যায়ের এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক মহল।

উপজেলার অন্তত ৩০টি কিন্ডার গার্টেন, ক্যাডেট স্কুল ও মাদ্রাসা ঘুরে এমনই চিত্র দেখা গেছে। এর মধ্যে মাদ্রাসাগুলোর চিত্র একেবারে ভয়াবহ। আবাসিক, অনাবাসিক, ডে-কেয়ার বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মাদ্রাসাগুলোতে শুধু ভর্তি ফি আদায় করা হচ্ছে ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এই টাকা নেয়ার পর ফেব্রুয়ারি মাস থেকে আবার প্রতিমাসে সর্বনিন্ম ১ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা। পাশাপাশি বই, খাতা, কলম, ড্রেস, জুতাসহ ইত্যাদি শিক্ষা সামগ্রী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শিক্ষার্থীদের কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো একেকটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চন্দ্রগঞ্জ এলাকায় প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাগুলোর প্রতিষ্ঠাতা মালিকরা কেউ এই এলাকার স্থানীয় নয়। কারো বাড়ি কুমিল্লা, কারো বাড়ি ভোলা-বরিশাল, চট্টগ্রাম, চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাসের সুবাধে এসব ব্যক্তিরা কয়েকজন মিলে ভাড়া বিল্ডিংয়ে মাদ্রাসা, কিন্ডার গার্টেন, ক্যাডেট স্কুল, কোচিং সেন্টার খুলে বসেছেন। এদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবিরসহ বিভিন্ন ইসলামী উগ্রবাদি দলের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

মাদ্রাসাসহ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি এরা আর কী কী করেন, কোথায় কোথায় যান, কার কার সাথে ওঠা-বসা করেন এসব নিয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তা বা স্থানীয় প্রশাসনের (গোয়েন্দা) কোন নজরদারি নেই। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, জেলা ও উপজেলা প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একশ্রেণির কর্মকর্তাদের সাথে ব্যক্তি পর্যায়ের এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্তৃপক্ষের সাথে অর্থনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে সখ্যতা গড়ে ওঠেছে। এসব শিক্ষা কর্মকর্তারা টাকার বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক খোঁজখবর না নিয়ে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, পিএসসি, এবতেদায়ী, জেএসসি, জেডিসি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সহযোগিতা দিয়ে আসছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, জেলা শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে অনেকগুলো ক্যাডেট স্কুল, কিন্ডার গার্টেন ও মাদ্রাসা গড়ে ওঠেছে। তবে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে ভালো মানের পড়ালেখা হচ্ছে বলেও অভিভাবকদের অভিমত। বিশেষ করে জেলা শহরের কাকলী শিশু অংগন, পুলিশ লাইন্স স্কুল, লক্ষ্মীপুর ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল, মান্দারী প্রি-ক্যাডেট জুনিয়র স্কুল, হাজিরপাড়া আল বাশার একাডেমি, চন্দ্রগঞ্জ কিন্ডার গার্টেন, চন্দ্রগঞ্জ মডেল স্কুল, দিশারী আইডিয়াল কিন্ডার গার্টেনসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার গুণগত মান, পরিবেশ রক্ষা এবং সরকারের নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অভিভাবকরা। উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতিবছরই জিপিএ-৫ সহ শতভাগ পাশ করে আসছে। এসব প্রতিষ্ঠান নিয়ে স্থানীয় এলাকাবাসী এবং অভিভাবকরা সন্তোষ প্রকাশ করেন।

তবে চন্দ্রগঞ্জে প্রায় একই এলাকায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই বিল্ডিংয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। একই জায়গায় ব্যাঙের ছাতার মত এতগুলো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় চলছে শিক্ষার্থীদের নিয়ে টানাটানি। এনিয়ে বিপাকে পড়েছেন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা। এর মধ্যে চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়নের দেওপাড়া বেল্লাল মঞ্জিলে প্লে থেকে ৭ম শ্রেণি পর্যন্ত বাপ, বেটা আর মেয়ের জামাই তিনজনে মিলে খুলেছেন আন্নূর মহিলা মাদ্রাসা। সেখানে পড়ালেখার পাশাপাশি তারা পরিবার পরিজন নিয়েও বসবাস করেন। এই প্রতিষ্ঠানে আবাসিক ৩২ জন শিক্ষার্থীসহ ৪০ জন শিক্ষার্থী (বালিকা) ভর্তি রয়েছে। একই ভবনে দারুল আজহার মাদ্রাসা নামে আরো একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পাশাপাশি একই নামে একই এলাকার মোস্তফার দোকানে আরো একটি মাদ্রাসা চালু করায় দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে দ্বন্দ্ব।

স্থানীয় এলাকাবাসী মনে করেন, বিভিন্ন জেলা থেকে এসে এসব ব্যক্তিরা কেন কোন উদ্দেশ্যে এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। নিজ নিজ জেলায় কেন তারা প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলেন নি। এর পিছনে রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্য আছে কীনা তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হাসিনা ইয়াসমিনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করার মত সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র বিরোধী কোনো কর্মকান্ডের অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া যদি কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ করেন, তদন্ত সাপেক্ষে প্রমাণ পাওয়া গেলে তারও ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান এই শিক্ষা কর্মকর্তা।

একই বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ আব্দুল মান্নান বলেন, সরকারের পাঠ্য বইয়ের চেয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি নিজেদের বই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন তাহলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। পাশাপাশি কোনো প্রতিষ্ঠান মালিক যদি সরকারের চলমান নীতিমালা ভঙ্গ করেন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবহার করেন এ ধরণের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

পাঠকের মন্তব্য দেখুন
চতুর্দশ শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ২০ হাজার - dainik shiksha চতুর্দশ শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ২০ হাজার প্রাথমিকে আরও আট হাজার শিক্ষক নিয়োগ শিগগিরই - dainik shiksha প্রাথমিকে আরও আট হাজার শিক্ষক নিয়োগ শিগগিরই এসএসসির ফল প্রকাশ ৬ মে - dainik shiksha এসএসসির ফল প্রকাশ ৬ মে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান পরীক্ষা স্থগিত - dainik shiksha গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান পরীক্ষা স্থগিত please click here to view dainikshiksha website Execution time: 0.21450090408325