ভোকেশনাল শিক্ষায় বৈষম্য - মতামত - Dainikshiksha


ভোকেশনাল শিক্ষায় বৈষম্য

প্রকৌশলী রিপন কুমার দাস |

বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা ১৩ ভাগ কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন। সরকার ২০২১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই সংখ্যাকে ২০ ভাগ ও ২০৪০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ৬০ ভাগে উন্নীত করতে চায়। কিন্তু বর্তমানে প্রেক্ষাপটে এটা বাস্তবায়ন করা একেবারেই অসম্ভব। সাধারণ শাখার মাধ্যমিক স্তর ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শুধু শিক্ষকদের বেতন ও ভাতাদি ছাড়া অন্য কোনো বৈষম্য পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

কিন্তু মাধ্যমিক স্তরের সরকারি ও বেসরকারি ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শিক্ষকদের বেতন ও ভাতাদি নিয়ে বৈষম্য তো আছেই, তাছাড়া উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে এখন পর্যন্ত বেসরকারি পর্যায়ে ভোকেশনাল কোর্স চালুই করা হয়নি। 

মাধ্যমিক পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আনুপাতিক হারে মাধ্যমিক শিক্ষা উপবৃত্তি প্রকল্প চালু রয়েছে। যার শতকরা ৯৫ ভাগ সুবিধা বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসাসমূহ প্রাপ্ত হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপবৃত্তি চালু থাকলেও ৭৫ ভাগ প্রতিষ্ঠান বেসরকারি  হওয়া সত্ত্বেও তাদের ১ ভাগ শিক্ষার্থীও কোন প্রকার উপবৃত্তির সুবিধা পায় না, এটাও এক ধরনের বৈষম্য।

 ২৬ হাজার মাধ্যমিক, কলেজ ও মাদরাসা পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আইসিটির মাধ্যমে শিক্ষার প্রচলর প্রকল্প চালু রয়েছে। এর শতকরা ৯৫ ভাগ সুবিধা বেসরকারি কলেজ, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসাগুলো পেয়ে থাকে। পক্ষান্তরে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের প্রকল্প চালু থাকলেও ৭৫ ভাগ প্রতিষ্ঠান বেসরকারি  হওয়া সত্ত্বেও তাদের ১ ভাগ সুুবিধা বেসরকারি ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান পায় না। এটাও এক ধরনের বৈষম্য।

 মাধ্যমিক পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের পাঠদানের মান উন্নয়নের জন্য টিকিউআই, সেকায়েপ ও সেসিপ প্রকল্প চালু রয়েছে। এর শতকরা ৯৫ ভাগ সুবিধা বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসাগুলো পায়। অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্টেপ, আইএলও, এসডিপি প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষকদের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু থাকলেও ৭৫ ভাগ প্রতিষ্ঠান বেসরকারি  হওয়া সত্ত্বেও তাদের ১ ভাগ শিক্ষকও কোন প্রকার প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সুবিধা পায় না, এটাও এক ধরনের বৈষম্য । 

সরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিনè প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষনের জন্য অবকাঠামো, পযন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল প্রদান কার্যক্রম চালু থাকলেও ৭৫ ভাগ প্রতিষ্ঠান বেসরকারি  হওয়া সত্ত্বেও তাদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের জন্য অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল সুবিধা প্রদান করা হয় না। এটাও এক ধরনের বৈষম্য । 
সরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিনè প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তব প্রশিক্ষণের জন্য ভাতা প্রদান কার্যক্রম চালু থাকলেও ৭৫ ভাগ প্রতিষ্ঠান বেসরকারি  হওয়া সত্ত্বেও তাদের বাস্তব প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের জন্য শিক্ষার্থীদের ভাতা প্রদান করা হয় না, এটাও এক ধরনের বৈষম্য ।

সরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিনè প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষাকদের পাঠদানের মানোন্নয়নের জন্য ফিলিপাইন, চিন, সিঙ্গাপুর, জাপান, ভারতসহ অনেক রাষ্ট্রে প্রশিক্ষণের কার্যক্রম চালু থাকলেও ৭৫ ভাগ প্রতিষ্ঠান বেসরকারি  হওয়া সত্ত্বেও তাদের শিক্ষকদের পাঠদানের মানোন্নয়নের জন্য একজনকেও অন্য কোন দেশে প্রশিক্ষনের জন্য পাঠানো হয়নি, এটাও এক ধরনের বৈষম্য । 

একই কারিকুলামে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান সমুহে দুই ধরনের নীতি রেখে দুই ধরনের শিক্ষার্থী তৈরি করে দেশের মানুষকে দক্ষ জনগোষ্ঠীতে রূপান্তর করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই বৈষম্য দূর করার জন্য মাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নি¤œলিখিত দাবী সমুহ বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।

১। সাধারণ শাখার সরকারি বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ন্যায় সরকারি বেসরকারি ভেদাভেদ না করে সকল ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একই হারে ছাত্র উপবৃত্তি ও বাস্তব প্রশিক্ষণ ভাতা চালুকরণ।
২. সরকারি বেসরকারি সকল ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একই হারে ব্যবহারিকের ক্লাসের জন্য যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল প্রদান।
৩. সরকারি বেসরকারি সকল ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য একই ধরনের বিদেশে উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ।
৪. সরকারি বেসরকারি সকল ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন।
৫. সংযুক্ত প্রতিষ্ঠানে ৮ম গ্রেডের সহকারী প্রধান শিক্ষক (ভোকঃ) পদ সৃজন।
৬. এসএসসি ভোকেশনাল শিক্ষার্থীদের ভোকেশনাল শাখায় উচ্চ শিক্ষার জন্য প্রতিটি উপজেলা সদরে কমপক্ষে ১টি সংযুক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ও সকল স্বতন্ত্র এসএসসি  ভোকেশনাল প্র্রতিষ্ঠানে এইচএসসি (ভোকেশনাল) কোর্স চালুকরণ।
৭. পূর্বের ২০জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন ট্রেড ইন্সট্রাক্টর পদের পরিবর্তে ৪০জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন ট্রেড ইন্সট্রাক্টরের পদ করার কারণে সকল ট্রেডে ৯ম গ্রেডের একজন বিভাগীয় প্রধানের পদ সৃজন।  
৮. ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং পাস ভোকেশনাল শিক্ষকদের বিএড কোর্সের মতো দু’বছর মেয়াদি ব্যাচেলার অব ভোকেশনাল এডুকেশন কোর্স চালুকরণ।
৯. সরকারি সকল প্রতিষ্ঠানের ন্যায় বৈশাখী ভাতা, সম্মান জনক বাড়িভাড়া, পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা, টাইম স্কেল ও পূর্ণাঙ্গ অবসর সুবিধা প্রদান।
১০. বেসরকারি সকল ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের পাঠদানের মানোন্নয়নের জন্য সরকারি শিক্ষকদের মতো দেশ বিদেশে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা। 
১১. ভোকেশনাল শিক্ষাক্রমের শিক্ষার্থী সংকট দূর করার জন্য প্রতিটি ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের ৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত চালুকরণ ও ওই সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত ভোকেশনাল শিক্ষাক্রমের কমপক্ষে একটি ট্রেড চালুকরণ। সরকারি ও বেসরকারি স্বতন্ত্র ও সংযুক্ত এসএসসি ভোকেশনাল শিক্ষাক্রমের প্রতিষ্ঠান সমুহে ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত ভোকেশনাল শিক্ষাক্রম চালুকরণ।
১২. সকল সংযুক্ত ভোকেশনালগুলোকে মাধ্যমিক শাখা থেকে পৃথক করে ও স্বতন্ত্র ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি করা ও প্রতিটি ইউনিয়নে সরকারিভাবে ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান চালু।
১৩. ভোকেশনাল শিক্ষাক্রমের ও শিক্ষকদের বিভিনè সমস্যা সমাধানের জন্য জেলা পর্যায়ে জেলা ভোকেশনাল শিক্ষা অফিস ও  উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা ভোকেশনাল শিক্ষা অফিস স্থাপন করা।

লেখক : ট্রেড ইন্সট্রাক্টর, ডোনাভান মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পটুয়াখালী।

[মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন]




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেল স্বতন্ত্র ইবতেদায়ির জনবল কাঠামো নীতিমালা - dainik shiksha প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেল স্বতন্ত্র ইবতেদায়ির জনবল কাঠামো নীতিমালা আলিমের নম্বর বণ্টন প্রকাশ - dainik shiksha আলিমের নম্বর বণ্টন প্রকাশ এমপিওভুক্ত হচ্ছেন স্কুল-কলেজের ৯০৯ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন স্কুল-কলেজের ৯০৯ শিক্ষক সরকারি হল আরও ৪৩ প্রতিষ্ঠান - dainik shiksha সরকারি হল আরও ৪৩ প্রতিষ্ঠান পদোন্নতি পাচ্ছেন সরকারি হাইস্কুলের সাড়ে পাঁচ হাজার শিক্ষক - dainik shiksha পদোন্নতি পাচ্ছেন সরকারি হাইস্কুলের সাড়ে পাঁচ হাজার শিক্ষক বিশেষ মঞ্জুরীর টাকার আবেদন করা যাবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত - dainik shiksha বিশেষ মঞ্জুরীর টাকার আবেদন করা যাবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত টেস্টে ফেল করলে পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না - dainik shiksha টেস্টে ফেল করলে পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না শূন্যপদের চাহিদা পাঠানোর সময় ফের বাড়ল - dainik shiksha শূন্যপদের চাহিদা পাঠানোর সময় ফের বাড়ল দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website