মন্ত্রীর দপ্তরের পিওনদের আর ভেট দেবেন না কর্মকর্তারা - বিবিধ - Dainikshiksha


মন্ত্রীর দপ্তরের পিওনদের আর ভেট দেবেন না কর্মকর্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক |

শিক্ষামন্ত্রীর দপ্তরের পিও এবং পিওনসহ অন্যান্য কর্মচারীদের আর ভেট দেবেন না শিক্ষা প্রশাসনের গুরত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত বিভিন্ন অধিদপ্তর, বোর্ড ও প্রকল্পে নিযুক্ত শিক্ষা প্রকৌশলী ও শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা এই ভেট (নজরানা বা উপঢৌকন) দিয়ে আসছেন গত প্রায় এক দশক ধরে। ভেট না দিলে মন্ত্রীর কান ভারী করা, দাপ্তরিক কাজে গেলেও মন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতে অহেতুক দেরি করিয়ে দেয়া, বিদেশ সফরের তালিকা থেকে নাম কর্তন করা, বেনামীতে অভিযোগ দিয়ে তদন্ত কমিটি করিয়ে দেয়া এবং বদলির ভয়সহ নানা ধরণের হয়রানি করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বঙ্গবন্ধুর সৈনিক ও খাটি আওয়ামী লীগার দুইজন মেধাবী রাজনীতিককে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যথাক্রমে মন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁরা হলেন ডা. দীপু মনি ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। নতুন মন্ত্রী ও উপমন্ত্রীকে পেয়ে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা। সদ্য সাবেক শিক্ষামন্ত্রীর দপ্তরের কয়েকজন পিও (পার্সোনাল অফিসার) ও পিয়ন (চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী) এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন যে ঘুষের দায়ে তাদের মধ্যে দুজনকে গ্রেফতার করেছিলো গোয়েন্দা পুলিশ। জঙ্গী পরিচালিত স্কুলের পরিচালকদের কাছ থেকে ঘুষ নেয়ার সময় গোয়েন্দা জালে আটক হওয়া ওই দুই কর্মচারীকে জেলে পাঠিয়েছে আদালত। আর দুর্নীতির মামলা দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার নির্দেশে ২০১২ খ্রিস্টাব্দের ১১ অক্টোবর গ্রেফতার ও বরখাস্ত করা হয় মন্ত্রীর দপ্তরের ফটোকপি মেশিন চালানোর দায়িত্বে থাকা একজন এমএলএসএকে। চাকরি দেয়ার নামে শত শত মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নিয়েও চাকরি দিতে পারেনি ওই এমএলএসএস। এই কর্মচারী গত মাসেও মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত করিয়ে দেয়ার কথা বলে ননএমপিও শিক্ষকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সদ্য সাবেক শিক্ষামন্ত্রীর একজন সাবেক এপিএসর ভেটের অঙ্ক এত বড় হয়ে ‍উঠেছিলো যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে তাকে মন্ত্রণালয় ছাড়তে হয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে আগেই বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন ওই এপিএস। ২০১৪ থেকে ২০১৮ মেয়াদের আর  কোনও মন্ত্রীর দপ্তরের এতজন কর্মচারীকে গ্রেফতা/বরখাস্ত/বাধ্যতামূলক বদলি ও জেলে পাঠাতে হয়নি। 

এইসব পিওন/পিওদের ভেট অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন কর্মকর্তা ও শিক্ষকরা। তাদের ভেট অত্যাচারের মাত্রা তীব্রতর হওয়ায় সাবেক শিক্ষামন্ত্রীর বিদায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা। অথচ তাঁকে মাত্র দুইমাস আগে কয়েকডজন সিনিয়রকে ডিঙ্গিয়ে অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী। ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে বিএনপি-জামাত জামানায় তিনি কোনও ধরণের পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি অধ্যাপক পদ পেয়েছিলেন। অধিদপ্তরে কর্মরত বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সিনিয়র অধ্যাপকরা এই জুনিয়র অধ্যাপকের অধীনে কাজ করতে অস্বস্তিবোধ করে আসছেন। এই অস্বস্তির কথা পিওনদের মাধ্যমে সাবেক মন্ত্রীর কানে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলেন তারা। পিওনরা ওই দায়িত্ব পেয়ে নবনিযুক্ত বড় কর্মকর্তাকে চাপ দিতেন বড় অঙ্কের বখরার জন্য। চাপে অতিষ্ঠ হয়ে মন্ত্রীর দপ্তরের দিকে তাকাতেন না তিনি। গুরুত্বপূর্ণ সভায় যোগ দিয়ে সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে তড়িঘড়ি করে মন্ত্রণালয় ছাড়তেন তিনি।            

প্রকল্প কর্মরত কয়েকজন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী সেসিপ প্রকল্পের অধীনে বিভিন্ন পদে কয়েকডজন নিয়োগ দিতে হয়েছে মন্ত্রীর দপ্তরের পিওনদের তদবিরে। এমপিওভুক্তির নার্ভসেন্টার হিসেবে পরিচিত ইএমআইএস সেলেও চাকরি দিতে হয়েছে চারজনকে। এই সেল থেকেই লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে ভুয়া শিক্ষকদের এমপিও করিয়ে দেয়া হয়। এই টাকার ভাগও দিতে হয় মন্ত্রীর দপ্তরের পিওনদের। শিক্ষা অধিদপ্তরের সরকারি কলেজ শাখায় সংযুক্ত থাকা একজন কর্মকর্তা দুইমাস আগে সেসিপে পদায়ন বাগিয়েছেন মন্ত্রীর দপ্তরের একজন পিওনের মাধ্যমে।

জানা যায়, লুটপাটের কারখানা হিসেবে পরিচিত জেনারেশন ব্রেকথ্রু প্রকল্পের অধীনে দেশ-বিদেশে ভ্রমণশেষে ভেট দিতে হয় মন্ত্রীর দপ্তরের পিওনদের।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের একজন সহকারী পরিচালক বলেন, ‘সাবেক মন্ত্রীর দপ্তরের একজন পিওন হঠাৎ নাজিল হন আমার দপ্তরে। হাতে থাকে কয়েকটি জেলা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বদলির আবেদন।’         

ডিআইএ নামে পরিচিত পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা দৈনিক শিক্ষাকে বলেন, সদ্যবিদায়ী মন্ত্রীর দপ্তরের একজন পিওনের মামা ডিআইএতে চাকরি করেন গত নয় বছর যাবত। এই মামার মাধ্যমে ভেট আদায় করেন ওই পিওন। তাকে ভেট না দিলে বেনামীতে অভিযোগ দেয়া হয়। পরিদর্শনের ‘ভালো’ আদেশ পাওয়া যায়না। পিওন ভাগ্নের বদৌলতে মামা পান ডজন ডজন স্কুল-কলেজ ও মাদরাসা পরিদর্শন ও তদন্তের দায়িত্ব।

ডিআইএতে কর্মরত আরেকজন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সৌদি আরব গিয়েছিলাম কয়েকমাস আগে। খেজুর ও আতর দিয়েছিলাম দুইজন পিওনকে। কিন্তু তারা তাতে সন্তুষ্ট হননি। তাদের দাবি ছিলো অন্য, তা পূরণ করতে না পারায় বদলির ভয় দেখিয়েছেন বার বার। তাই ভোটের আগে বার বার সিলেটের বিয়ানীবাজার যেতে হয়েছে।

তবে, দৈনিক শিক্ষার এক প্রশ্নের জবাবে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন সৎ ও আওয়ামী লীগপন্থী কয়েকজন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা। তাদের মতে, যারা প্রকৃত দুর্নীতিবাজ ও জামাত-বিএনপিপন্থী তারাই গুরত্বপূর্ণ পদে পদায়ন ও পদ ধরে রাখতে পিওন চাপরাশিদের নজরানা দেন। যাদের বিরুদ্ধে জিপিএ ফাইভ বিক্রির অভিযোগ, সরকারকে অস্থিতিশীল করতে সরকারিকরণের বিরুদ্ধে মামলা ও মিছিল করানো এবং ফেসবুকে সরকারবিরোধী প্রচারণায় লিপ্ত তারাই পিওনদের খুশি রাখার চেষ্টা করেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী কোনও শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা পিওনদের বখরা দেয়ার প্রয়োজন মনে করেন না।  

মাধমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক একজন মহাপরিচালক দৈনিক শিক্ষাকে বলেন, সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের কুলাঙ্গার ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত তারেক জিয়ার বন্ধু ও বিএনপি-জামাত জমানায় জিপিএ ফাইভ কিনে রাতারাতি স্কুলের নাম ফাটানো এক আন্তর্জাতিক আদম ব্যবসায়ী প্রায় সব কর্মচারীকে ঘুষ দেয়া শুরু করেন ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে।  শিক্ষা মন্ত্রী ও সচিব এবং ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের প্রায় সব কর্মচারী এই শিক্ষা মাফিয়ার কাছ থেকে বখরা নেন। কালো তালিকাভুক্ত ও কালো পোষাক পরিহিত এই আন্তর্জাতিক শিক্ষা মাফিয়ার সঙ্গে দারুন সখ্য রয়েছে ঢাকা, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সিস্টেম অ্যানালিস্ট, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, স্কুল ও কলেজ পরিদর্শকদের সঙ্গেও। এই মাফিয়ার রয়েছে কয়েকডজন প্রতিষ্ঠান। এই মাফিয়া ডন শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনার নামে তথ্য সংগ্রহ করে তারেক জিয়ার কাছে পৌছে দেন মর্মে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি এই মাফিয়ার কথিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন শিক্ষাবোর্ডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা ক্যাডারের একজন সিনিয়র অধ্যাপক বলেন, বিভিন্ন উপলক্ষে ভেটের জন্য মন্ত্রীর দপ্তরের পিওন/পিওরা হঠাৎ নাজিল হন শিক্ষা প্রকৌশল, ডিআইএ, ঢাকা ও মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড, সেসিপ, টিকিউআই, শিক্ষা অধিদপ্তরের এমপিও শাখা এবং সরকারি কলেজ ও স্কুলের বদলি শাখায়। এসবের অবসান ঘটবে নতুন মন্ত্রীর আমলে এটাই প্রত্যাশা সবার।




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
ববির রেজিস্ট্রারের নৈতিক স্খলন, কাজে যোগদানের ব্যর্থ চেষ্টা - dainik shiksha ববির রেজিস্ট্রারের নৈতিক স্খলন, কাজে যোগদানের ব্যর্থ চেষ্টা আইনি জটিলতায় শিক্ষক নিয়োগের তালিকা প্রকাশ পেছালো - dainik shiksha আইনি জটিলতায় শিক্ষক নিয়োগের তালিকা প্রকাশ পেছালো কোচিংয়ে লিপ্ত উইলসের ৩০ শিক্ষকের নাম - dainik shiksha কোচিংয়ে লিপ্ত উইলসের ৩০ শিক্ষকের নাম রকেটের জটিলতায় উপবৃত্তিবঞ্চিত রাজশাহীর শত শত শিক্ষার্থী - dainik shiksha রকেটের জটিলতায় উপবৃত্তিবঞ্চিত রাজশাহীর শত শত শিক্ষার্থী স্টুডেন্টস কেবিনেট নির্বাচন ২৬ জানুয়ারি হচ্ছে না - dainik shiksha স্টুডেন্টস কেবিনেট নির্বাচন ২৬ জানুয়ারি হচ্ছে না প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৫ মার্চ শুরু - dainik shiksha প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৫ মার্চ শুরু ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া শিক্ষার খবর সবার আগে পেতে ‘দৈনিক শিক্ষা ব্রেকিং নিউজ’ ফেসবুক পেজে লাইক দিন - dainik shiksha শিক্ষার খবর সবার আগে পেতে ‘দৈনিক শিক্ষা ব্রেকিং নিউজ’ ফেসবুক পেজে লাইক দিন please click here to view dainikshiksha website