মানুষ গড়ার যেমন কারিগর চাই : নাদিরা কিরণ - মতামত - Dainikshiksha


মানুষ গড়ার যেমন কারিগর চাই : নাদিরা কিরণ

নাদিরা কিরণ |

সদ্য ক্লাস সেভেনে উঠেছি। এখনকার মত জানুয়ারির প্রথম দিনে হাতে নতুন বই আসত না। তাই স্কুল খুললেও ক্লাস থাকত ঢিলেঢালা। এ সুযোগে আমার এক সহপাঠী পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় বেড়াতে যাওয়ায় দীর্ঘদিন স্কুল অনুপস্থিত ছিল। যশোর শহরের অন্যতম ভালো স্কুল মমিন গার্লস বা গভঃ গার্লস হাইস্কুলে এসবে ভীষণ নিয়ন্ত্রণ। মফস্বল শহরের ভালো স্কুলের ভারি ভাবের কড়াকড়িও তেমন। মাসে কেবল বেতন দেয়ার একটি দিন ছাড়া স্কুল ড্রেস, জুতা বাধ্যতামূলক, নয়তো প্রবেশ নিষিদ্ধ। হাতের নখ রাখা বা নেলপলিশ, লিপিস্টিক চলবে না।

কাঁধের নীচে চুল গেলেই আটসাট বাঁধতে হবে। তেমন কড়াকড়ির স্কুলে সহপাঠী সেই মেয়ে ঢাকার  বিউটিপার্লার থেকে স্টেপ কাটে ছাঁটা চুল নিয়ে ক্লাসে হাজির। বেতন দেয়ার দিন বলেই যথারীতি স্কুল ড্রেস ছাড়া অন্য পোষাকে তাও আবার ভিন্ন কাটের চুলে টিচার আপার চোখ গেল। তিরস্কার কেবল মুখে নয়, স্কুল মাঠে বসিয়ে রাখলেন তার ক্লাস টাইমের পুরো ৪৫ মিনিট। এতটুকু মেয়ে কেন এমন শখ করবে, পরিবার কেন কেয়ার করেনি এসব আপা বললেন বটে। তবে অভিভাবকের ডাক পড়েনি। মনে আছে, অষ্টম শ্রেণিতে যখন বার্ষিক পরীক্ষায় নকল করতে গিয়ে ধরা পড়ার পর হল থেকে এক সহপাঠীকে বের করে দেন টিচার। যথারীতি তিরস্কারের তীর্যক বাণও সাথে। সেবারও দেখিনি অভিভাবককে ডাকতে। আজকাল পান থেকে চুন খসলেই অভিভাবককে তলব।

ছেলের সঙ্গে নাদিরা কিরণ

ঢাকার এক নামী ইংলিশ ভার্সন স্কুলে লক্ষ্মী ছেলে হিসেবে ক্লাসে পরিচিত আমার ছোট্ট ছেলেটির জন্যও একদিন ডাক পড়েছিল আমার। ও তখন ক্লাস টুতে। স্কুলের দোতলা ভবনের তিনতলায় ওঠার সিঁড়ি মেরামত হচ্ছে কোনওরকম ব্যারিকেড ছাড়াই। ক্লাস চলাকালে এসব মেরামত কাজ কতটা ঝুঁকিপুর্ণ তা শিশুরা বোঝে না। উন্মুক্ত স্থানে পড়ে থাকা ইট, সুরকি তখন অতটুকু বাচ্চাদের দারুণ খেলার উপাদান। ক্লাসের ফাঁকে টিচার ঢোকার আগেই মিসদের (আধুনিক স্কুলের তদারকি আয়া) চোখ এড়িয়ে সেসব টুকরো নিয়ে তারা নীচে ছুঁড়ছে, কখনও জানালায়। এরই ফাঁকে আমার ছেলের হাতের ইটের টুকরো লাগে আরেকটি ছেলের মাথায়। যথারীতি রক্ত বের হওয়ায় আমাকে তলব। অফিস ফেলে দৌড়ে গিয়ে দেখি আমার ছেলে কায়ানাতকে এডমিন রুমের সামনে যেভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে, যেন খুনের মোটিভ নিয়ে ঢিল ছুড়েছিলো সে। জানলাম, আহত ছেলেটিকে সিএমএইচে নেয়া হয়েছে। ছেলেটির অভিভাবককে ফোন দিয়ে জানলাম কোন সেলাই পড়েনি। আমি খরচ দিতে চাইলেও রাজি হলেন না তারা। দুঃখ প্রকাশ করায়ও তারা বিষয়টি সহজভাবে নিলেন।

এটা জানার পরও ক্লাসটিচার বেশ তীর্যকভাবে কথা শোনালেন। আমার মিডিয়া পরিচিতির জন্য হয়ত কিছুটা সীমা ছিলো। অন্য কেউ হলে তারা বোধহয় অরিত্রীর বাবার মতোই চরম তিরস্কারে জর্জরিত হতেন। আমি ক্লাস টিচারকে বলেছিলাম, আমার ছেলে কাজটি মোটেই ভালো করেনি। কিন্তু আপনি কি জানতে চেয়েছিলেন, ঘটনাটা কী কারণে ঘটেছিল? অতটুকু বাচ্চা ইট মারলে কী ঘটতে পারে, আসলেই বুঝেছিল কি? কোথায় ইটের টুকরা পেয়েছিল? আমার ছেলের ক্লাস রেকর্ডে কি তার এমন আচরণ আছে? শ্রেণিশিক্ষক সন্তোষজনক উত্তর দেননি। কয়েক মাস পর ঢাকার একটি ভালো স্কুলে ভর্তি যুদ্ধের চেষ্টা করে আরেকটি ভালো স্কুলে নিয়ে আসি। তবে আগের স্কুলে টিসি (ছাড়পত্র) আনতে গেলে হেডটিচার কারণ জানতে চান। তাঁকে বলি, যে স্কুলে ছোট্ট শিশুর মানসিক অবস্থা বোঝা হয় না, সামান্য ইস্যুতে অপরাধী বানানো হয়, সেখানে ছেলেকে পড়াতে আগ্রহ পাচ্ছি না। আমি বলেছিলাম, আমার ছেলেকে সেদিন দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। অন্য শিশুদের সামনে ছেলেটা বিব্রত হয়। এটা ওর মানসিক বিকাশে বিরুপ প্রতিক্রিয়া ফেলবে। শিশুরা চঞ্চল, আবার দুষ্টুমির ছলে অন্য কেউ করলেও আমার ছেলের ওপর দোষ হবে না তাও বলা যায় না।

আরেকটি কথা বলেছিলাম, ক্লাস চলাকালে ভবনের মেরামত কাজ চলা কি যৌক্তিক? সাংবাদিক বলেই হয়ত হেডটিচার তেমন কথা বাড়াননি। টিসি দিয়ে দেন। নতুন স্কুলে আমার ছেলে পাঁচ বছর। তেমন কোন অভিযোগ আসেনি।

অরিত্রী, অভিমানী মেয়েটি এভাবে চলে যাবার পর এসব কথাই ভীড় করছে মনে। পরীক্ষা থেকে বিরত রাখার অপমান তো মেয়েটির ছিলই। বাবারও সেজন্য চরম অপমান সইতে হলো। এ যুগের সেনসেটিভ প্রজন্মের অরিত্রী তার ধকল নিতে পারেনি। না, মেয়েটির আত্মহত্যা কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। অরিত্রীর মোবাইল নিয়ে নকল করার নৈতিক স্খলনও সমর্থন করছি না। কিন্তু মেয়েটিকে তিরস্কার, তার খাতা কিছুক্ষণ আটকে রাখা যেতো। এটাও মেয়েটির জন্য যথেষ্ট শাস্তি হতো। অপমানটাও কম হতো না। অভিভাবককে ডাকাও অযৌক্তিক নয়। কিন্তু অপমান করতে নয়, সন্তানের প্রতি আরো সতর্ক এবং নৈতিকতার শিক্ষা দেয়ার পরামর্শ দেয়ার জন্য। তার ওপর মেয়েটি তার বাবা মায়ের সামনে দফায় দফায় অপরাধ স্বীকার করে শিক্ষকদের পা ধরে মাফ চেয়েছিল। কেন শিক্ষকরা নমনীয় হতে পারলেন না ? শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো শিক্ষার্থী গড়ে তোলার কেন্দ্র এবং শিক্ষকরা তার কারিগর।

তবে তারা পুরো দোষ পরিবারকে দিয়ে নিজেদের দায় এড়ালেন কেন? তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। পাশাপাশি তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কোন ধরনের কটূক্তি, অমানবিক এমনকি মানসিক চাপ পড়ে এমন কোন আচরণ থেকে বিরত থাকার জন্য শিক্ষকদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এ উদ্যোগের পাশাপাশি বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য, নৈতিক স্খলন থেকে বিরত রাখতে, ক্রোধ, হিংসা-প্রতিহিংসা, হীনমন্যতা থেকে মুক্ত রাখার অনুভব, অনুশীলনের জন্য শিক্ষক রাখা জরুরি। অনেকে বলতে পারেন এগুলো ছাড়াই আমরা তো মানুষ হয়েছি। তাদের মনে রাখতে হবে আমরা কোন শতাব্দীর প্রজন্মের কথা বলছি। কোন পরিবর্তিত পরিবেশে, কোন বদ্ধ পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠছে আমাদের শিশুরা।

প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে শিশুদের মানসিক গঠনে মা-বাবার বাইরেও চারপাশের মানুষজন, পরিবেশ তাকে কতটা মূল্যায়িত করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছে কি? বেটার লাইফ বা উন্নত জীবনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে মা-বাবাকেও নানা কর্মে নিয়োজিত থাকতে হয়। একান্নবর্তী পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে শেয়ার করা বা তাদের অনুসরণ করা, পরামর্শ নেয়ার সুযোগ পেলে উদার মানসিকতা তৈরির যে সহজ ক্ষেত্র একটি শিশু পায়, এখনকার প্রজন্ম তা থেকে বঞ্চিত। ফলে মনোজগৎ দৃঢ় হওয়ার সুযোগটাও সে সময়ের চেয়ে অনেক কম। গাদা গাদা বই আর কোচিংভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যস্ততার কারণে শিশুদের জন্য আলাদা সময় বের করে মানসিক গুণাবলি তৈরির কৌশলও সব মা-বাবার থাকে না। স্নেহ-ভালোবাসার বাইরেও দৃঢ় মনোবল তৈরির আবহ মা-বাবা বোঝেন না। পুঁথিগত বিদ্যার বাইরেও এমন মূল্যবোধ তৈরির সঠিক পীঠস্থান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সে প্রতিষ্ঠানের এ শিক্ষা দেয়ার কারিগর যে শিক্ষকরা তারা কেন সংবেদনশীল হবেন না, তা ভাববার সময় এসেছে বৈকি।

বাবা-মায়ের পর শিক্ষকরা শিশুদের বড় অভিভাবক পরম নির্ভরতার স্থান হবে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা হবেন শিক্ষার্থীদের মন খুলে কথা বলার পরম আশ্রয়স্থল। এমনটা হলেই না শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হবে পবিত্রস্থান, শিক্ষকরা হবেন মানুষ গড়ার কারিগর।

গভর্নিং বডিতে কেবল অর্থ, আমলা আর রাজনৈতিক পদের জোরে নয়, অঞ্চলের সজ্জন, নির্লোভ, ভালো মানুষদের অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন। তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের সম্পর্কে অভিভাবকদের মতামত বিশ্লেষণ করবেন, এমন ব্যবস্থাও থাকা উচিত। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিভাবকদের কোনও অভিযোগ থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবেন তারা। একই সঙ্গে শিক্ষকরা যেন সেসব অভিভাবকের সন্তানদের ওপর তার ক্ষোভটা প্রকাশ করে শিক্ষা জীবন ক্ষতিগ্রস্ত না করেন, সেটাও তদারকি করবেন।

একই সঙ্গে শিক্ষকদের নানাবিধ প্রশিক্ষণের মধ্যে মানবিক গুণাবলির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। তবে কেবল পুঁথিগত অধ্যায় নয়, এগুলো সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে মনোবিদ বা এ বিষয়ের শিক্ষকদের সংযুক্ত করা প্রয়োজন। নতুবা বইয়ের মোড়কে আটকে থাকবে মূল্যবোধের চাবি।

নাদিরা কিরণ, সাংবাদিক




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
এইচএসসির অনলাইন ফরম পূরণ শুরু ১৩ ডিসেম্বর - dainik shiksha এইচএসসির অনলাইন ফরম পূরণ শুরু ১৩ ডিসেম্বর ভিকারুননিসার ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত - dainik shiksha ভিকারুননিসার ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত ভিকারুননিসার বসুন্ধরা শাখার কলেজ ও মাধ্যমিকের অনুমোদন নেই - dainik shiksha ভিকারুননিসার বসুন্ধরা শাখার কলেজ ও মাধ্যমিকের অনুমোদন নেই এসএসসির ফরম পূরণের সময় ফের বাড়ল - dainik shiksha এসএসসির ফরম পূরণের সময় ফের বাড়ল ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধিসহ মাদরাসা শিক্ষকদের নভেম্বর মাসের এমপিওর চেক ব্যাংকে - dainik shiksha ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধিসহ মাদরাসা শিক্ষকদের নভেম্বর মাসের এমপিওর চেক ব্যাংকে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তিতে ট্রিপল ই জটিলতা - dainik shiksha শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তিতে ট্রিপল ই জটিলতা সরকারি চাকরিতে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলকের পরিপত্র জারি - dainik shiksha সরকারি চাকরিতে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলকের পরিপত্র জারি ডাচ-বাংলার উদাসীনতায় পরীক্ষকদের সম্মানীর টাকা প্রতারকদের হাতে - dainik shiksha ডাচ-বাংলার উদাসীনতায় পরীক্ষকদের সম্মানীর টাকা প্রতারকদের হাতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website