আমাদের সঙ্গে থাকতে দৈনিকশিক্ষাডটকম ফেসবুক পেজে লাইক দিন।


শিক্ষক না শিক্ষা, প্রতারণা কার সঙ্গে

মো. জাকির হোসেন | জানুয়ারি ৭, ২০১৬ | শিক্ষাবিদের কলাম

অষ্টম বেতন স্কেলে শিক্ষকদের মর্যাদাহানির বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক অন্দোলন আট মাস পেরিয়ে নবম মাসে পড়েছে। আন্দোলনের প্রতি সরকারের আচরণের ধরন দেখে শিক্ষকরা কি এখনো অনুধাবন করেননি যে সরকার তাঁদের দাবি মানবে কি মানবে না! দফায় দফায় কর্মবিরতি, মানববন্ধন, আলোচনা—সবই হয়েছে। শিক্ষকদের দাবি পর্যালোচনার জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মন্ত্রিপরিষদ কমিটি গঠিত হয়েছে।

শিক্ষকরা ১১ জানুয়ারি থেকে ‘কমপ্লিট শাট ডাউন’ অর্থাৎ শিক্ষাদান, পরীক্ষা গ্রহণ, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডসহ সব ধরনের কাজ বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অষ্টম বেতন কাঠামোকে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তার কোনো দায় শিক্ষক সমাজের নেই। একটি মীমাংসিত বিষয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ গণপরিষদের খসড়া শাসনতন্ত্র অনুমোদন উপলক্ষে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলছিলেন, ‘ওই সিএসপি, পিএসপি বাংলাদেশে থাকবে না। সরকারি চাকরিতে সাতটি স্তর থাকবে। বেতন কমিশন গঠন করা হয়েছে। কেউ ৭৫ টাকা বেতন পাবে, কেউ দুই হাজার টাকা পাবে, তা হতে পারে না। সবার বাঁচার মতো অধিকার থাকতে হবে। একজন সব কিছু পাবে, আরেকজন পাবে না তা হতে পারে না। সম্পদ ভাগ করে খেতে হবে।’

চতুর্থ বেতন কাঠামো পর্যন্ত আমলাতন্ত্রের শীর্ষ পদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে কোনো বৈষম্য ছিল না। পঞ্চম বেতন কাঠামোতে সবার জন্য প্রযোজ্য বেতন কাঠামোর বাইরে মুখ্য সচিব ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের জন্য আলাদা সুপার গ্রেড তৈরি করা হলো। আর অষ্টম বেতন কাঠামোতে সর্বসাধারণের জন্য প্রযোজ্য বেতন কাঠামোর বাইরে সিনিয়র সচিব নামে আরেকটি সুপার গ্রেড তৈরি করা হলো। যেসব কারণে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্র পাকিস্তানকে যেভাবে গ্রাস করেছিল সে আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো থেকে মুক্ত হয়ে জনগণের রাষ্ট্র কায়েম করা। প্রশাসনিক কার্যক্রমে পাকিস্তানি আমলের আমলাতান্ত্রিক প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে আসতে বঙ্গবন্ধু প্রশাসনের উচ্চপদে আমলাগোষ্ঠীর বাইরে কিছু নিয়োগ প্রদান করেছিলেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়ে প্রকৌশলী মঈনুল ইসলাম, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ডা. টি হোসেন, তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ভারপ্রাপ্ত সচিব পদে বাহাউদ্দিন চৌধুরীকে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছিল। অবশ্য আমলাদের চাপের মুখে উচ্চ পদে যাঁদের বসিয়েছিলেন তাঁদের সরিয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু আমলাতন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফলে গণতান্ত্রিক জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ও প্রশাসনে আমলাতন্ত্র পুনর্বাসিত হলো।

দেশের ৩৭টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতিগুলোর ফেডারেশন শিক্ষকদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে মর্মে সংবাদ সম্মেলন করেছে। কে প্রতারণা করেছে? শিক্ষক ফেডারেশনের নেতারা স্পষ্ট করে বলেছেন, অর্থমন্ত্রী শিক্ষকদের দাবি ন্যায্য বলে আখ্যা দিয়ে তাঁদের দাবি মানার কেবল সুস্পষ্ট অঙ্গীকার নয়, বরং দাবি মনে নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো বেতন স্কেলের প্রজ্ঞাপনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের নির্মম প্রতিফলন ঘটেছে। একাধিক মন্ত্রীর বরাত দিয়ে পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, প্রজ্ঞাপন জারির আগে বেতনবৈষম্য নিরসনসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি শিক্ষকদের বিষয়ে কিছু সুপারিশ করলেও তা প্রজ্ঞাপনে প্রতিফলিত হয়নি।

শিক্ষকদের এবারের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকাশ হয়ে পড়া কিছু বিষয় গভীর উদ্বেগের। এক. প্রশাসন ক্যাডারের আমলাদের সঙ্গে প্রকৌশলী, কৃষিবিদ ও চিকিৎসক তথা প্রকৃচি ও অন্যান্য ক্যাডারের আজন্ম বিরোধ সর্বজনবিদিত হলেও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সঙ্গে বিরোধের বিষয়টি কখনোই প্রকাশ্য রূপ নেয়নি। কিন্তু বেতন কাঠামোকে কেন্দ্র করে ভয়ানক শত্রুতার সুপ্ত রূপটি বেরিয়ে এসেছে। শিক্ষাবান্ধব প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে শিক্ষকবিদ্বেষী করে তোলার অপপ্রয়াস স্পষ্টতই লক্ষণীয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পড়ানোর ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বোঝানো হয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়া বা অন্যান্য কাজ করা অধ্যাপকদের অবসরের পর মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশের বাড়ি-গাড়ি থাকে আর অবসরপ্রাপ্ত সচিবদের ১০০ শতাংশের একাধিক বাড়ি-গাড়ি খোদ রাজধানী শহরে নিদেনপক্ষে বিভাগীয় শহরে খুঁজলেই পাওয়া যাবে। এর রহস্য কী? শুধু সচিব নন, এর নিম্নপদস্থ অবসরপ্রাপ্তদের মধ্যেও এ হার ১০০ শতাংশের কাছাকাছি হবে। সচিবরা ৯-৫টা অর্থাৎ আট ঘণ্টা অফিস করেন সত্য। আট ঘণ্টা কাজ করে কি একজন ভালো শিক্ষক হতে পারেন? একজন শিক্ষককে অধ্যয়ন, ক্লাস লেকচার তৈরি, পদোন্নতির জন্য গবেষণা ও গবেষণা প্রবন্ধ লেখা, গবেষণা প্রবন্ধ মূল্যায়ন, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্র পরীক্ষণ, এমফিল ও পিএইচডি গবেষণা তদারকি মিলিয়ে দৈনিক ন্যূনতম ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা চাকরি করতে হয়। শিক্ষকদের চাকরি থেকে অবসরের বয়স অন্যদের তুলনায় বেশি, এটি কেবল বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর অপরাপর দেশেও একই নিয়ম। তদুপরি ৬৫ বছরের এ নিয়ম কেবল শিক্ষকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, আরো বেশি বয়সে অবসরে যাওয়ার পেশা বাংলাদেশেই রয়েছে। তিন. আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো ও আওয়ামী লীগ সরকারের আগ্রহে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতিতে শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের কথা উল্লেখ থাকলেও ফরাসউদ্দিন কমিশনের সুপারিশে শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রদান না করার জন্য আগ বাড়িয়ে বলা ও অর্থমন্ত্রীর শিক্ষকদের জন্য কোনো স্বতন্ত্র বেতন স্কেল হবে না বলে দম্ভোক্তি ম্যানিফেস্টো ও জাতীয় শিক্ষানীতির পরিপন্থী। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহার ও ২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতিতে স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রণয়নের লক্ষ্যে স্থায়ী পে কমিশন, শিক্ষক নিয়োগের জন্য স্বতন্ত্র কমিশন গঠন ও সম্মানজনক সম্মানী প্রদানের কথা বলা হয়েছিল। আর জাতীয় শিক্ষানীতিতেও বলা হয়েছে, ‘আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সব স্তরের শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা হবে।’

আমলারা যেহেতু তাঁদের জায়গাটি সংরক্ষিত ও অন্যদের জন্য অগম্য করতে চান, সেহেতু শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর মধ্যেই এর সমাধান খুঁজতে হবে। উন্নত ও অনুন্নত বিশ্বে শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর অসংখ্য নজির রযেছে। শ্রীলঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য একটি স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো রয়েছে। সেখানে মূল বেতনের বাইরে শিক্ষকরা বেশ কিছু ভাতা পান। যেমন—জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ ভাতা ছাড়াও রয়েছে গবেষণা ভাতা ও বিশেষ ভাতা। উপরন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক আট বছর চাকরি করার পর শুল্কমুক্ত গাড়ি ক্রয় করতে পারেন এবং এই সুবিধা প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নবায়নযোগ্য। পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্যও ভিন্ন বেতন স্কেল রয়েছে। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো ভারতে স্বতন্ত্র বেতন স্কেল না থাকলেও ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিভিন্ন ধরনের ভাতা পেয়ে থাকেন। ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি শুরুর অব্যবহিত পর শিক্ষকরা সর্বনিম্ন দুই লাখ থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ রুপি পর্যন্ত গবেষণা উন্নয়ন অনুদান নামক এককালীন ভাতা পেয়ে থাকেন। এর বাইরে গবেষণার জন্য রয়েছে সরকারি বিভিন্ন অনুদান। ভারত সরকার মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় টানতে বেতন কাঠামোয় সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও উপযুক্ত মর্যাদা প্রদানের ব্যবস্থা করেছে। ভারতের বেতন কমিশন যেখানে মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে, শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষা ও বৃদ্ধিতে অবস্থান নিয়েছে সেখানে বাংলাদেশের বেতন কমিশনের সুপারিশে শিক্ষকদের এযাবৎ কাল উপভোগ করে আসা মর্যাদা ছিনিয়ে নিয়ে এর অবনমন ঘটানো হয়েছে। শিক্ষকদের দাবি মেনে নেওয়ার কথা বলে মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে প্রতারণামূলক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

শিক্ষক ও শিক্ষার সঙ্গে প্রতারণার প্রতিকার যে জাতি করে না, সে জাতি অবশ্যম্ভাবীভাবেই শিক্ষায় পিছিয়ে পড়বে। আর শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া একটি জাতি জ্ঞাননির্ভর একুশ শতকের অর্থনীতিতে কত দূর যেতে পারবে তা কি অননুমেয়?

লেখক : মো. জাকির হোসেন, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মন্তব্য দিন