আমাদের সঙ্গে থাকতে দৈনিকশিক্ষাডটকম ফেসবুক পেজে লাইক দিন।


শিক্ষা ক্যাডারের চলমান আন্দোলনে জুনিয়রদের ভাবনা

নিজস্ব প্রতিবেদক | জানুয়ারি ৭, ২০১৬ | ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ ঘোষণার পর সরকারি কলেজ শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য আন্দোলন মিডিয়ার মাধ্যমে দেশবাসীর নিকট বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে।

মুলত: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলনের শ্লোগানের সাথে মিল রেখে কলেজশিক্ষক নেতারা তাদের শ্লোগান তৈরী করেছেন।

Bcs GES-2সরলমনা জুনিয়র শিক্ষকরা তাদের নেতাদের ডাকে সাড়া দিয়ে জানপ্রাণ বাজি রেখে আন্দোলন সফল করে যাচ্ছেন।

জুনিয়র শিক্ষকরা ভাবছেন, নেতারা জুনিয়র, সিনিয়রসহ সকল শিক্ষকের স্বার্থে আন্দোলন এর ডাক দিয়েছেন। কিন্তু শিক্ষক নেতারা জুনিয়র শিক্ষকদের সরলতাকে ব্যবহার করে তাদের দিয়ে আন্দোলন করিয়ে কেবল মাত্র নিজেদের (সিনিয়রশিক্ষকদের) স্বার্থ উদ্ধারে নেমেছেন।

তাদের প্রতারনার কৌশল হিসেবে খুব সুকৌশলে তারা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের শ্লোগানের সাথে নিজেদের শ্লোগান মিল রেখেছেন। যাতে তাদের প্রতারনা জুনিয়র শিক্ষকরা ধরতে না পারে। বাস্তবে হয়েছেও তাই। জুনিয়র শিক্ষকদের পাশাপাশি দেশবাসীও তাদের শ্লোগানের দ্বারাপ্রতারিত হয়েছেন।

এমনকি মন্ত্রী, সচিবরাও প্রতারিত হয়েছেন। এখন আসি কিভাবে জুনিয়র শিক্ষকরা প্রতারিত হচ্ছেন? আমাদের মনে রাখতে হবে, সরকারি কলেজের শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতো সবাই অধ্যাপক হতে পারেন না। সরকারি কলেজে পদোন্নতির অবস্থাটি খুব হতাশাজনক।

শতকরা ০৩ জন শিক্ষক মাত্র অধ্যাপক পদেপদোন্নতির সুযোগ লাভ করেন। বাকি ৯৭% শিক্ষকরা সবাই চাকুরী হতে অবসরের কিছুদিন আগে সহযোগী অধ্যাপক পদ লাভ করে চাকুরী হতে অবসরে যান। তবে চিত্রটি বিষয় ভিত্তিক পদোন্নতি ব্যবস্থার কারনে ইউনিফরম নয়। কোন কোন বিষয়ের শিক্ষক আগে পদোন্নতি পান। যা হোক, সমস্যাটা হলো সহযোগী অধ্যাপক পদ ওঅধ্যাপক পদ দুটি নিয়ে।

আশ্চর্যজনক ভাবে, সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক পদ ও অধ্যাপক পদ দুটি ১৯৮০ পর থেকে এক ধাপ নীচের লেভেলের আছে। অথচ স্বাস্থ্য শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক পদ ও অধ্যাপক পদ দুটি এক ধাপ উপরের লেভেলে আছে এবং তাদের সহযোগী অধ্যাপক পদ চতুর্থ গ্রেডে ও অধ্যাপক পদ তৃতীয় গ্রেডে। অথচ, সরকারি কলেজে সহযোগী অধ্যাপক পদ ৫ম গ্রেডে ও অধ্যাপক পদ চতুর্থ গ্রেডে। অর্থাৎ দুটো পদই এক ধাপ নীচে অবস্থান করছে।

উল্লেখ্য যে, স্বাস্থ্য শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষাও সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ম গ্রেড পান তারাই যারা অফিসার। যেমন স্বাস্থ্য ক্যাডারে সিভিল সার্জন পান ৫ম গ্রেড অফিসার হিসেবে। অথচ স্বাস্থ্য শিক্ষা হিসেবে তাদের সহযোগী অধ্যাপকগণ পান ৬ষ্ঠ থেকে সরাসরি চতুর্থ গ্রেড। তারা ৫ম গ্রেড জাম্প করে সরাসরি চতুর্থ গ্রেড পান এবং তা পান কেবল মাত্র শিক্ষক হওয়ায়। কিন্তু সরকারি কলেজের শিক্ষকরা শিক্ষক হওয়ার পরেও তারা শিক্ষকহিসেবে সে সুবিধা পান না।

সরকারি কলেজের শিক্ষকরা অফিসারদের ন্যায় ৬ষ্ঠ হতে ৫ম গ্রেড এ পদোন্নতি পান, তারপর তাদের মধ্য হতে মাত্র ৩% শিক্ষক পানচতুর্থ গ্রেড এ পদোন্নতি।

সে প্রেক্ষিতে, বেতন বৈষম্য আন্দোলনে সরকারিকলেজ শিক্ষকদের আন্দোলনের মুল শ্লোগান এর চুম্বক অংশ হওয়া উচিত ছিলো “অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক পদ এক ধাপ নীচে নেমে গেছে। তাই এ পদ দুটির গ্রেড উন্নয়ন চাই”। কিন্তু শিক্ষক নেতারা খুবই কৌশলে সহযোগী অধ্যাপক পদআপগ্রেডের দাবীটি বাদ দিয়ে শ্লোগানের চুম্বক অংশে শুধুমাত্র অধ্যাপক পদের অবমাননার কথা বলেছে।

তাদের শ্লোগানটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আন্দোলনের শ্লোগানের সাথে মিল হয়ে যাওয়ায় সে সময় কেউই খেয়ালকরে নাই যে, শ্লোগানের চুম্বক অংশে সহযোগী অধাপক পদ আপগ্রেডেশনের দাবীটিবাদ পড়ে গেছে।

অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন যে, শিক্ষক নেতাদের তাড়াহুড়ায় তা বাদ পরে গেছে। যারা এ কথা ভাবছেন, তারা বোকার স্বর্গে বসবাস করছেন।

মুলত:এই শিক্ষক নেতারা জ্ঞানপাপী। তারা জেনে শুনে ইচ্ছাকৃতভাবে সুকৌশলে শ্লোগান তৈরী করেছেন।

৯৫% জুনিয়র শিক্ষকদের বন্চিত করে নিজেদের (৩% এর)স্বার্থ আদায়ই তাদের মুল লক্ষ্য। কেননা, নেতারা সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে অধ্যাপক পদ পাবেন বা পেয়েছেন।

অধ্যাপক পদ তৃতীয় গ্রেডে গেলে, তারা ৫ম থেকে৩য় গ্রেডে যাবেন। এখন একসাথে সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদ দুইটির গ্রেড উন্নয়ন চাইতে গেলে যদি দুইটাই বাদ পড়ে যায়, এই ভাবনা থেকেই মূলত জুনিয়র শিক্ষকদের বন্চিত করার নীল নকশা করে ৩% এর পক্ষ নেয়।

আর ৯৭% জুনিয়র শিক্ষকেরস্বার্থকে জলান্জলী দিয়ে নিজেদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে তাদেরশ্লোগানের চুম্বক অংশে শুধু অধ্যাপকদের কথাই বলা হয়।

আর অর্থ মন্ত্রনালয়ও তাদের প্রতারণা ধরতে না পেরে শুধু অধ্যাপক পদ যাতে ৩য় গ্রেডে যেতে পারে সেরকম প্রস্তাবনা শিক্ষা মন্ত্রনালয়কে পাঠাতে বলেছে। এখন শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের যুগ্নসচিব (কলেজ) মোল্লা জালাল উদ্দিন সে চিঠির সুত্র ধরে অধ্যাপক পদের আপগ্রেডশন নিয়ে কাজ করছেন। অথচ, আন্দোলনের শ্লোগানের চুম্বক অংশে সহযোগী অধ্যাপক পদের কথা অধ্যাপক পদের সাথে থাকলে অর্থ মন্ত্রণালয় সে রকমভাবে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ে চিঠি দিতো। এবং সে চিঠি মোতাবেক শিক্ষা মনত্রনালয় অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক, উভয় পদের আপগ্রেডশনের পক্ষে প্রস্তাব তৈরী করে অর্থ মন্ত্রনালয়ে পাঠানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারতো। কিন্তু শিক্ষক নেতাদের স্বার্থপরতায় ৯৭% সরকারি কলেজের শিক্ষকরা গ্রেড উন্নয়নের এইসুযোগ থেকে বন্চিত হতে চলেছেন।

শিক্ষক নেতাদের বক্তব্য থেকেও উপোরক্ত কথার সমর্থন মিলে। যেমন: সাম্প্রতিক একটি সংবাদের শিরোনাম দেখুন-“অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে সরকারি কলেজ শিক্ষকদের বিষয়ে কোনবক্তব্য না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতিরনেতৃবৃন্দ”। খবরের ভিতরে গেলে দেখা যায়, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির মহাসচিব আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যায় সরকারি কলেজ শিক্ষকদের বিষয়টিও অন্তর্ভূক্ত করা হলে ভাল হতো। আমাদের দাবি কোন অযৌক্তিক বা বাড়াবাড়ি পর্যায়ের নয়। ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত দাবি করে আসছেন সরকারি কলেজ শিক্ষকরা। কিন্তু ঘোষিত ৮ম বেতন স্কেলে শিক্ষা ক্যাডারের অধ্যাপকদের পদমর্যাদা ও বেতনক্রম অবনমন করা হয়েছে। বেতন স্কেলে প্রজাতন্ত্রের সকল ক্যাডার সার্ভিসে ৫ম গ্রেড হতে সরাসরি ৩য় গ্রেডে পদোন্নতি দেয়া হয়। অন্যদিকে শিক্ষা ক্যাডারের ৫ম গ্রেডের সহযোগী অধ্যাপক গণ পদোন্নতি পেয়ে ৪র্থ গ্রেডে অধ্যাপক হন। এর ৫০% সিলেকশন গ্রেড পেয়ে ৩য়গ্রেডে উন্নীত হন। দীর্ঘদিনের এই বৈষম্য নিরসন না করে উল্টো সিলেকশন গ্রেড বাতিলে অধ্যাপকগণ ৪র্থ গ্রেড হতে অসম্মান জনকভাবে অবসরে যাবেন এবং মর্যাদাছাড়াও বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।

এছাড়া শিক্ষা ক্যাডারের পদসমূহ ২য় ও ১ম গ্রেডে উন্নীতকরণের দাবিও বিবেচনায় আনা হয়নি অষ্টম বেতন স্কেলে”।

মহাসচিব মহোদয়ের বক্তব্য থেকে যেটি দেখার বিষয়:বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির মহাসচিব আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার তার দেয়া বক্তব্য থেকে সুষ্পষ্ট দেখাযায় যে, উনি শুধুমাত্র অধ্যাপক পদের বঞ্চনার কথাই বারবার বলছেন। একটি বারও সহযোগী অধ্যাপকদের বঞ্চনার কথা বলেন নাই। আবার কিছু দিন পুর্বে সিনিয়রঅর্থ সচিবের সহিত এক বৈঠকেও তিনি শুধুমাত্র অধ্যাপক পদের অবনমনের কথা তুলেধরে বক্তব্য দিয়েছেন। এমন কি টিভি টক শোতেও তিনি অধ্যাপক পদের পক্ষেই কথা বলেছেন। আরেক শিক্ষক মো. মাসুমে রব্বানী খান, যিনি মুলত সহযোগীঅধ্যাপকদের বন্চিত করার মুল নকশা প্রণয়নকারী ও পর্দার অন্তরালে সমিতির মহাসচিব আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার কে পরিচালনা কারী, তিনিও তার টিভি টকশোতে প্রকাশ্যে শুধুমাত্র অধ্যাপক পদের আপগ্রেডের কথা হাইলাইট করেই বলেছেন।

শুধু তা-ই নয়, তিনি তার বাচনভঙ্গি আর অসৎ কারিশমা দিয়ে ভিন্ন মতালম্বী বিসিএস সমিতির অনান্য নেতাদেরও সহযোগী অধ্যাপক পদকে বন্চিত করার জন্য তার প্রণীত নীল নকশার পক্ষে দাড় করিয়েছেন।

আর এই সব মহান শিক্ষক নেতারা সম্মিলিতভাবে সমস্ত জুনিয়র শিক্ষকদের বিভ্রান্ত করে কমিউনিটির ১০০% এরস্বার্থ আদায়ের স্বপ্ন দেখিয়ে মুলত ৩% এর স্বার্থ আদায়ের আন্দোলনে যুক্ত করেছেন। জয়তু শিক্ষা ক্যাডারের এই মহান নেতারা!

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা ক্যাডারের জুনিয়র সদস্যবৃন্দ।

আপনার মন্তব্য দিন