শিভেনিং স্কলারশিপ পেতে যা লাগবে - বিদেশে উচ্চশিক্ষা - Dainikshiksha


শিভেনিং স্কলারশিপ পেতে যা লাগবে

রাইসুল ইসলাম সৌরভ |

কৃচ্ছ্রসাধনের এই যুগে এখনও ব্রিটিশ সরকার সারা বিশ্বের শিক্ষার্থীদের জন্য বিলেতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ অব্যাহত রেখে যে স্বল্পসংখ্যক ‘পূর্ণ তহবিল বৃত্তি’ চালু রেখেছে, শিভেনিং স্কলারশিপ তার মধ্যে অন্যতম। মেধাবী ও নেতৃত্বদানের যোগ্যতাসম্পন্ন তরুণদের সারা পৃথিবী থেকে বাছাই করে এই বৃত্তির আওতায় যুক্তরাজ্যে এক বছর মেয়াদে স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে পড়ার সুযোগ করে দেয়া হয়। বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন এবং মর্যাদাপূর্ণ এ বৃত্তির আওতায় ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে বিশ্বের ১৪১টি দেশের প্রায় ৭০ হাজার আবেদনকারীর মধ্য থেকে মাত্র ১ হাজার ৭শ’ ৬৫ জন যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স কোর্স করার সুযোগ পেয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে ৭শ’ আবেদনকারীর মধ্যে ১৬ জন এ বছর শিভেনিং বৃত্তির জন্য মনোনীত হয়ে এরই মধ্যে ব্রিটেনে পড়ালেখা শুরু করেছেন।

মূলত যুক্তরাজ্য সরকারের ফরেন ও কমনওয়েলথ (এফসিও) অফিস এবং সহযোগী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহযোগিতায় পরিচালিত এই স্কলারশিপে একজন শিক্ষার্থীকে তার পড়ালেখার সম্পূর্ণ খরচ (১৮ হাজার পাউণ্ড পর্যন্ত), ব্রিটেনে বসবাস ও জীবনধারণের জন্য এক বছর পর্যন্ত মাসিক ভাতা; নিজ দেশ থেকে যাওয়া-আসার বিমান টিকিটসহ বিভিন্ন ভাতা, এমনকি এই স্কলারশিপের আওতায় প্রযোজ্য ভিসা ফি মওকুফ এবং ভিসা পেতে যে মেডিকেল টেস্ট প্রয়োজন হয়, তার ফিও বহন করা হয়। অর্থাৎ এক বছরের পড়াশোনার মোটামুটি সব খরচই এ স্কলারশিপের আওতায় বহন করা হয়।

আবেদনের সময় : শিভেনিং বৃত্তির জন্য মূলত অনলাইনে (www.chevening.org/ bangladesh) আবেদন চালু হয় আগস্ট মাসে (এ বছর ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের জন্য আবেদন চালু হয়েছে ৭ আগস্ট থেকে, যা চলবে চলতি বছরের ৭ নভেম্বর পর্যন্ত) এবং ক্লাস শুরু হবে পরবর্তী বছরের সেপ্টেম্বর মাসে। আগে ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে হলেও এখন স্বতন্ত্র সচিবালয় ও স্থানীয় হাই কমিশনের মাধ্যমে পুরো বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

আবেদনের যোগ্যতা : শিভেনিং যেসব দেশের নাগরিকদের বৃত্তি দেয়, সেসব দেশের যে কোনো একটির নাগরিক হতে হবে। বাংলাদেশিরা এ তালিকায় আছে; তবে ব্রিটেনে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে তিনি এক্ষেত্রে বিবেচিত হবেন না। ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রি থাকতে হবে, যা দিয়ে বিলেতের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হওয়া যায়। কমপক্ষে দুই বছরের কাজের অভিজ্ঞতা লাগবে; তাই সদ্য স্নাতক পাস করা ছাত্রছাত্রীরা আবেদনের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন না, যদি না ছাত্রাবস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা (ইন্টার্নশিপ, তবে কোর্স সম্পন্ন করার জন্য নয়; পূর্ণকালীন, খণ্ডকালীন, মজুরির বিনিময়ে বা ছাড়া- যাই হোক না কেন) বা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে দুই বছরের অভিজ্ঞতা না থাকে। ব্রিটেনে কাজের অভিজ্ঞতা গণনা করা হয় ঘণ্টা হিসেবে, তাই দুই বছরের অভিজ্ঞতা প্রমাণে ন্যূনতম ২ হাজার ৮শ’ ঘণ্টা কাজের অভিজ্ঞতা দেখাতে হবে।

ব্রিটিশ হাইকমিশন, ব্রিটিশ কাউন্সিল, অ্যাসোসিয়েশন অব কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটিস বা ব্রিটিশ সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠানের সাবেক বা বর্তমান কর্মী বা তাদের আত্মীয় এই বৃত্তির আওতাভুক্ত হবেন না। বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা প্রমাণে অবশ্যই আইইএলটিএস-এ গড়ে কমপক্ষে ৬.৫ (তবে কোনো মডিউলেই ৫.৫-এর কম না) থাকতে হবে (এক্ষেত্রে আপনি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চান, সেখানে স্কোর আরও বেশি চাইলে তা পেতে হবে)। শিভেনিং-এ আবেদন করার একটা বড় সুবিধা হল, আবেদনের সময় আইইএলটিএস স্কোর ওয়েবসাইটে আপলোড করার প্রয়োজন হয় না।

পড়ার বিষয় : আপনি যে বিষয়ে পড়তে ইচ্ছুক, শিভেনিং-এর তালিকাভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৫শ’ স্নাতকোত্তর কোর্স থেকে যে কোনো তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে আবেদনের সময়ই ঠিক করে দিতে হবে। চাইলে আপনি একই বিষয় তিনটি ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্ধারণ করে দিতে পারেন বা তিনটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ও হতে পারে। এক্ষেত্রে আপনি পছন্দের তালিকায় যেসব বিশ্ববিদ্যালয় ঠিক করে দিচ্ছেন, তাদের যে কোনো একটি থেকে বিনা শর্তে ভর্তির অফার লেটার জোগাড় করতে হবে। তাই আবেদন করার পাশাপাশি একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গেও ভর্তির ব্যাপারে যোগাযোগ করা ভালো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মূলত বিষয় পছন্দ করে অনলাইনে আপনার পূর্বের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও আইইএলটিএসের স্কোর পাঠানোর প্রয়োজন পড়ে। শর্তাধীনভাবে বৃত্তি পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে জানালে বিনা খরচে ও শর্তে অনলাইনে অফার লেটার পাঠিয়ে দেয়া হয়, যা দেখিয়ে আপনি চূড়ান্তভাবে শিভেনিং বৃত্তি পেতে পারেন।
আবেদনে পূর্ণতা আনার জন্য দুটি রেফারেন্স লেটার আপলোড করতে হবে। তবে তা প্রাথমিক বাছাইয়ের পর ইন্টারভিউয়ের জন্য বিবেচিত হলে ইন্টারভিউ বোর্ডে বা তার আগে নির্ধারিত ওয়েব পেইজে আপলোড করা যায়। রেফারেন্স লেটারে একাডেমিক ও প্রফেশনাল দুই ধরনের সমন্বয়ই থাকতে পারে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, শিভেনিং যেহেতু নেতৃত্বদানে যোগ্যতাসম্পন্নদের স্কলারশিপ দিয়ে থাকে, তাই রেফারেন্স লেটারে যেন আপনার সে যোগ্যতা প্রয়োজনে উদাহরণসহ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

বৃত্তি পেতে : শিভেনিং বৃত্তি পেতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর (যদি কারও করা থাকে) পর্যায়ে অসাধারণ ফলাফল খুব গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয় না; এমনকি আপনি সরকারি না বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, তাও বিবেচ্য বিষয় নয়। বরং আপনি যে বিষয়ে এখন পড়তে ইচ্ছুক, তার সঙ্গে আপনার পূর্বের পড়ালেখা বা কর্মের সংযোগ; ইংরেজি ভাষায় লিখতে ও গুছিয়ে বলতে পারার ভালো দক্ষতা; আপনি যে বিষয়ে পড়তে চাচ্ছেন, ভবিষ্যৎ কর্ম পরিকল্পনার সঙ্গে তার প্রাসঙ্গিকতা এবং এর সঙ্গে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশ সরকারের অগ্রাধিকার ক্ষেত্রের সঙ্গতি প্রভৃতি বিষয়ের ওপর জোর দেয়া হয় বেশি। তাই আবেদন করার আগে বাংলাদেশে যুক্তরাজ্য হাই কমিশনের ওয়েব পেইজ থেকে অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করতে পারলে ভালো হয়। শিভেনিংয়ের ওয়েব সাইটেও দেশভিত্তিক অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো উল্লেখ থাকে।

অনলাইন আবেদন ফর্মে নিজের সম্পর্কে তথ্য, যোগাযোগের ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রভৃতি বিষয়ের পাশাপাশি নিজের জীবনের উদাহরণসহ ৫০০ শব্দের চারটি প্রবন্ধ লিখতে হবে। বাছাইয়ের পরবর্তী পর্যায় অর্থাৎ ইন্টারভিউয়ের জন্য আপনি বিবেচিত হবেন কিনা, তা মূলত নির্ভর করবে এই চারটি প্রবন্ধে কত চমৎকারভাবে বাস্তব উদাহরণসহ বক্তব্য উপস্থাপন করা হচ্ছে তার ওপর। তাই সময় নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে একেবারেই নিজের কথাগুলো সাজিয়ে এখানে লেখা উচিত। কারও পূর্বের আবেদনপত্র দেখে বা কোনো ওয়েবসাইটের সাহায্য নিয়ে না লেখাই ভালো। এতে স্বকীয়তা বজায় থাকবে বেশি এবং অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কাও কমে যাবে। তাছাড়া আপনি নিজেই নিজের বক্তব্য সবচেয়ে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন, যা অন্যের দ্বারা সম্ভব নয়। এছাড়া ইন্টারভিউ পর্যায়ে মূলত এখান থেকেই প্রশ্ন করা হয়। তাই তখন সবকিছু ব্যাখ্যা করাও আপনার জন্য অনেক সহজ হবে। এসব ক্ষেত্রে আপনাকে বাংলাদেশের স্বার্থ সব সময় সবার আগে প্রাধান্য দিতে হবে। প্রবন্ধগুলোয় খুব ভালোভাবে নিজের জীবনের উদাহরণ সহকারে নেতৃত্বের গুণাবলী ও অন্যান্য বিষয় তুলে ধরতে হবে।

বিস্তারিত : www.chevening.org

২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে শিভেনিং বৃত্তিপ্রাপ্ত, বর্তমানে যুক্তরাজ্যের স্টারলিং বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে অধ্যয়নরত




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায় ঠেকাতে ১০ কমিটি - dainik shiksha ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায় ঠেকাতে ১০ কমিটি এমপিওভুক্ত হচ্ছেন স্কুল-কলেজের ১১২৪ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন স্কুল-কলেজের ১১২৪ শিক্ষক নভেম্বরের এমপিওতেই ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি - dainik shiksha নভেম্বরের এমপিওতেই ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায় বন্ধের নির্দেশ শিক্ষামন্ত্রীর - dainik shiksha ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায় বন্ধের নির্দেশ শিক্ষামন্ত্রীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ট্রাফিক সার্কুলেশন প্ল্যান তৈরির নির্দেশ - dainik shiksha শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ট্রাফিক সার্কুলেশন প্ল্যান তৈরির নির্দেশ এমপিওভুক্ত হচ্ছেন মাদরাসার ২০৭ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন মাদরাসার ২০৭ শিক্ষক ২৮৮ তৃতীয় শিক্ষককে এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত - dainik shiksha ২৮৮ তৃতীয় শিক্ষককে এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website