শেখ কামাল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা সংস্কার আন্দোলন - মতামত - Dainikshiksha


শেখ কামাল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা সংস্কার আন্দোলন

আ ব ম ফারুক |

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ছেলে শেখ কামালের ৬৯তম জন্মদিন পালিত হয়েছে গত ৫ আগস্ট। অন্যদের মতো সেদিন এ উপলক্ষে ৬৯ কেজি ওজনের কেক কাটা হয়নি। এ বদ-কালচারটি বঙ্গবন্ধু পরিবারে নেই। সেদিন বিভিন্ন পত্রিকায় এ বিষয়ে বেশকিছু প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। সেগুলোতে শেখ কামালের সাদাসিধা জীবন, অনেক অজানা তথ্য ও তাঁর বিবিধ গুরুত্বপূর্ণ অবদান চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

এর প্রয়োজন রয়েছে। কারণ আমাদের দেশের কিছু মহল থেকে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেক আজগুবি অসত্য তথ্য নিরবচ্ছিন্ন ও পরিকল্পিতভাবে প্রচার করা হয়েছে জনমনে তাঁদের সম্পর্কে বিরূপ ধারণা সৃষ্টির হীন উদ্দেশ্যে। তারা সফল হয়নি। কিন্তু তাদের প্রচার এখনও অব্যাহত রয়েছে। ইন্টারনেটে ঢুকলে এসব অপপ্রচার এখনও পাওয়া যায়, বিশেষ করে পাকিস্তান-বেসড্ ওয়েবপেজগুলোতে। এসব অপপ্রচারের জবাবও অনেকে দিচ্ছেন, সত্যকে তুলে ধরছেন, কিন্তু তা খুব সংগঠিতভাবে দেয়া হচ্ছে বলে মনে হয় না। অথচ বিষয়টা অত্যন্ত জরুরী, বিশেষ করে তরুণ সমাজের কাছে সত্যকে প্রকাশ করার জন্য।

তবে শেখ কামাল সম্পর্কে যারা লিখেছেন বা আলোচনা করেছেন, তারা একটি সত্য এখনও প্রকাশ করেননি। এটি তাদের না জানার কথা নয়। হয়ত তাঁর অনেক অবদানের ভিড়ে সেটি তারা উল্লেখ করে ওঠতে পারেননি। সেটি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ‘শিক্ষা সংস্কার আন্দোলন’ নামে একটি আন্দোলন শুরুর কথা।

আমার ও আমার বন্ধুদের সৌভাগ্য যে, ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১মবর্ষ স্নাতকে আমরা শেখ কামাল, আমাদের কামাল ভাইকে, সহপাঠী হিসেবে পেয়েছিলাম। তিনি ছিলেন সোশিওলজিতে আর আমরা অন্যান্য বিভাগে। তাই তিনি আমাদের ক্লাসমেট ছিলেন না, ছিলেন ব্যাচমেট। সৌভাগ্য বলছি এজন্য যে, তিনি ছিলেন সেই সময় আক্ষরিক অর্থেই একজন লিজেন্ড। কিন্তু তা শুধু বঙ্গবন্ধুর সন্তান বলেই নয়। তিনি ছাত্রলীগের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে মাঠ পর্যায়ে রাজপথে অংশ নিয়েছেন। পারিবারিক পরিচয়ের কারণে তিনি অনায়াসেই ছাত্রলীগের অন্যতম নেতা হতে পারতেন। কিন্তু উপর্যুপরি অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি তা হননি। ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন, তাও অন্যরা জোর করাতে। তিনি সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত সক্রিয় কর্মীর মতো রাজপথে মিছিল করেছেন, সেøাগান দিয়েছেন, পুলিশের তাড়া ও কাঁদানে গ্যাস খেয়েছেন, আশপাশের সবাইকে উদ্দীপ্ত করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানী মিলিটারি বন্দী করার পর ছোটভাইকে নিয়ে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেছেন। অন্যদের সঙ্গে কঠিন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। নৈপুণ্যের জন্য আর্মির ওয়ারটাইম কমিশন পেয়েছেন। এরপর এইড-দ্য-ক্যাম্প (এডিসি) হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানীকে সহায়তা করেছেন। বিজয়ের পর সামরিক বাহিনীতে না থেকে পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে ফিরে এসেছেন।

লেখাপড়ায় মনোনিবেশের পাশাপাশি ছায়ানটে গিয়ে সেতার বাজানো শিখতেন। তিনি ভাল সেতার বাজাতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোন বিভাগের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে তুমুল উৎসাহ জোগাতেন। নাটক পাগল ছিলেন। তখন সদ্য স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে নাটকের গতানুগতিক ধারার বিপরীতে একটি নবনাট্য আন্দোলন চলছিলÑ যেখানে জবরজং পোশাক, ব্যয়সাপেক্ষ ব্যাক সিন ইত্যাদির বালাই ছিল না, কিন্তু উপস্থাপনার চমৎকারিত্ব ছিল। থিয়েটার, নাগরিক ইত্যাদি নতুন নাট্য দলের পাশাপাশি শেখ কামাল এ আন্দোলনকে আরও বেগবান করার জন্য ‘নাট্যচক্র’ ও ‘ঢাকা থিয়েটার’ নামে গ্রুপ থিয়েটার দল গঠনে হাত লাগালেন। নিজে ভাল খেলতেন। বিশেষ করে ক্রিকেট ও বাস্কেট বলে ফার্স্ট ডিভিশন খেলোয়াড় ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে কারা ভাল ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, বাস্কেট বল, হকি খেলছে তা লক্ষ্য রাখতেন এবং তাদের উৎকর্ষ বাড়ানোর ব্যবস্থা নিতেন। খেলার জগতে ‘আবাহনী ক্রীড়াচক্র’ নামে নতুন ঘরানার ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এমন একটি অফুরন্ত প্রাণশক্তির গতিময় বর্ণিল প্রতিভাধর ছাত্রটি আবার ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, ভদ্র ও সদালাপি। ভাবা যায়! তিনি তো লিজেন্ড হবেনই। এমন একজন লিজেন্ডের সহপাঠী হওয়া অবশ্যই সৌভাগ্যের ব্যাপার।

একসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও তাঁকে আমরা ‘কামালভাই’ ডাকতাম, কারণ তিনি ছিলেন আমাদের তিন বছরের বড়। না, তিনি খারাপ ছাত্র ছিলেন না যে, উপর্যুপরি ড্রপ দেয়ার কারণে আমাদের সঙ্গে চলে এসেছেন। বরং কারণটা ছিল, কামাল ভাইয়ের স্কুল জীবনের প্রায় পুরো সময়টাই বঙ্গবন্ধুকে জেলে কাটাতে হয়েছে। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম পুরুষটি যখন একটানা জেলে থাকে, তখন চরম আর্থিক দুর্দশায় নিপতিত পরিবারের সন্তানদের লেখাপড়ায় বিঘœ ঘটবে, এটাই স্বাভাবিক। পাকিস্তানী মিলিটারি শাসকদের সেটাই ছিল লক্ষ্য। সে কারণেই কামাল ভাইয়ের জীবন থেকে তিনটি শিক্ষাবছর হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এজন্য কামাল ভাইয়ের কোন খেদ ছিল না। এজন্য আমরা তাঁকে অন্তর থেকে আরও শ্রদ্ধা করতাম।

কামাল ভাই তাঁর অন্যান্য কাজের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ উন্নতকরণের জন্য যে কাজটি শুরু করেছিলেন, তা বর্তমানেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং কিছুটা হলেও আলোচনার দাবি রাখে। সেই সময় যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা শিক্ষক ছিলেন, তারাও নিশ্চয়ই এই আলোচনায় আরও তথ্য যোগ করতে পারবেন।

কামাল ভাইয়ের নেতৃত্বে এ আন্দোলনের মূলকথা ছিলÑ দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের মেধাবী শিক্ষার্থীরা প্রথিতযশা শিক্ষকদের কাছ থেকে পাঠ নিচ্ছেন। এর পাঠ্যসূচী ও শিক্ষকরা যেমন উন্নত, শিক্ষার পরিবেশটুকুও তেমনি উন্নত হওয়া চাই। পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব সবটুকুই প্রশাসনের এমন ভাবলে চলবে না, শিক্ষার্থীদেরও এ ব্যাপারে অনেক কিছু করার আছে। তিনি এই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আহ্বান জানালেন প্রতিটি বিভাগ থেকে সবচেয়ে মেধাবী তিনজন করে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের। কিন্তু এতে কোন জোরাজুরি নেই। যদি কোন মেধাবী শিক্ষার্থী এতে যোগ দিতে না চান, তাহলে তার পরের মেধাবীজন যোগ দেবেন। তিনিও না এলে তার পরেরজন। আর স্টিয়ারিং কমিটি গঠিত হলো প্রতি বিভাগ থেকে একজন করে সবচেয়ে মেধাবী মুখ নিয়ে। এই প্রতিনিধিত্বকারী শিক্ষার্থীরা পুরুষ না মহিলা, তা বিবেচ্য নয়। সবার অধিকার সমান। কেন্দ্রীয় কমিটি প্রতি মাসে একবার টিএসসিতে বৈঠকে বসবে। আর স্টিয়ারিং কমিটি বসবে প্রয়োজনমতো, তবে দু’সপ্তাহে অন্তত একবার। আবহাওয়া প্রতিকূল না থাকলে সভা বসার ব্যাপারে কামাল ভাইয়ের প্রথম পছন্দ ছিল খোলা মাঠ। আমরা এভাবে কলাভবন, কার্জন হল, সায়েন্স এনেক্স ও টিএসসির লেনে ঘুরে ঘুরে অনেকবার বসেছি। ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কেনা বাদাম আর চা ছিল আমাদের সভার নিত্যকার মেন্যু। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় পার হওয়াতে কমিটির সবার নাম মনে নেই। তবে আমাদের কার্জন হল এলাকার কয়েকজনের নাম মনে আছে। যেমন, ফিজিক্সের রকীব ও ইকবাল, এ্যাপ্লাইড ফিজিক্সের তরিকুল, কেমিস্ট্রির জাহাঙ্গীর ও আলাউদ্দিন, বোটানির সানি, বায়োকেমিস্ট্রির রহমত ও মোসাদ্দেক, সয়েল সায়েন্সের এনায়েত, জিওলজির বদরুল, স্ট্যাটিসটিকসের খন্দকার, ইকোনমিক্সের শিবলী, আইনের মকবুল প্রমুখ। এরা সবাই ছিল যার যার বিভাগের প্রথম শ্রেণীতে প্রথম বা দ্বিতীয়। আমি এ রকম মেধাবী ছিলাম না। কিন্তু আমার বিভাগের বন্ধুরা স্টিয়ারিং কমিটিতে ফার্মেসি বিভাগের প্রতিনিধিত্বের জন্য আমাকেই মনোনীত করেছিল।

শিক্ষা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম আরেকটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করতে হয়। তখন অধিকাংশ মেধাবীরা রাজনীতি বিমুখ ছিলেন না। তাই কেন্দ্রীয় কমিটি তো বটেই, এমনকি স্টিয়ারিং কমিটিতেও অধিকাংশই ছিলেন রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এবং ছাত্রলীগের পাশাপাশি ছাত্র ইউনিয়ন, বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজবাদী ছাত্র জোট প্রভৃতি সংগঠনের সদস্য। কিন্তু অন্য ছাত্র সংগঠনের হলেও তাদের সবাইকে নিয়ে আন্দোলন করতে কামাল ভাই বা অন্যদের কারও কোন সমস্যা হয়নি।

এই আন্দোলনের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের দাবি। তখন বাণিজ্য অনুষদের সবগুলো বিভাগ ছিল কলাভবনে অবস্থিত। ক্লাসরুম খালি না থাকাতে বিভিন্ন বিভাগের অনেক ক্লাস সময়মতো হতো না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কোন বিভাগ অনেক জায়গা অপ্রয়োজনে দখল করে রাখলেও অনেকের প্রয়োজনীয় জায়গাটুকুও ছিল না। কার্জন হলের বিভাগগুলোরও অনেকের এই সমস্যা ছিল। মনে আছে, আমাদের ফার্মেসি বিভাগেই প্রয়োজনীয় ক্লাসরুমের অভাবে আজাদ স্যার, অর্থাৎ পরবর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. একে আজাদ চৌধুরী, আমাদের ফার্মেসি বিভাগের ক্লাস নিতেন বিভাগের সামনের তমাল গাছটির নিচে। ছাত্র সংখ্যার তুলনায় আবাসিক হলের সংখ্যাও যথেষ্ট ছিল না। সদ্য স্বাধীন দেশটির অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখেও যথাসম্ভব জরুরীভিত্তিতে অবকাঠামো সম্প্রসারণের জন্য শিক্ষা সংস্কার আন্দোলনের দাবিটি তাই অত্যন্ত জোরালো হয়েছিল।

এখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখনকার চাইতে অনেক পরিচ্ছন্ন। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোন ভবনের দেয়াল ও করিডোরে কোন দেয়াল লিখন বা সেøাগান চোখে পড়ে না। এখন সেøাগান লেখা হয় মূলত বাইরের দেয়ালে। কিন্তু সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি একাডেমিক ভবন, লাইব্রেরি, রেজিস্ট্রার বিল্ডিং, টিএসসি, আবাসিক হল ও রাস্তার পাশের দেয়ালগুলো ছিল দেয়াল লিখনে ও পোস্টারে কন্টকিত। এমনটি শ্রেণীকক্ষের ভেতরেও সেøাগান লেখা বাদ ছিল না। সরকারী দল ও বিরোধী দল নির্বিশেষে সব ছাত্র সংগঠনই তাদের বক্তব্য প্রচারের জন্য সভা-মিছিলের পাশাপাশি দেয়াল লিখনের ওপর জোর দিত। এসব লেখা সবগুলোই যে খুব রুচিসম্মত ছিল তাও নয়। ফলে সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন ও দেয়ালগুলোর চেহারা ছিল কদর্য। এটি যে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ এবং তা কিছুটা পরিপাটি থাকাই বাঞ্ছনীয়, সে বোধটুকু অনেকের মধ্যেই ছিল অনুপস্থিত। শিক্ষা সংস্কার আন্দোলন থেকে সব সংগঠনকে অনুরোধ করা হয়েছিল সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষার্থে ভবনগুলোর দেয়ালে বা অভ্যন্তরে পোস্টার না লাগাতে বা দেয়াল লিখন না করতে। শিক্ষা সংস্কার আন্দোলন প্রশাসনের কাছে দাবি করল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থানে স্থানে বড় বড় বোর্ড নির্মাণের, যাতে সবার সেøাগান লেখা যায় বা পোস্টার লাগানো যায়। এতে সৌন্দর্য রক্ষার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীরাও বোর্ডগুলো থেকেই কোন সংগঠনের কী বক্তব্য তা সহজেই জেনে নিতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তখন বড় না হলেও বেশ কয়েকটি পাকা বোর্ড বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করে দিয়েছিলেন, যার দুটি এখনও কার্জন হল এলাকায় রয়েছে।

কলাভবনের সামনের বটতলার ঐতিহাসিক মূল্যের কথা ভেবে এখানে প্রায়ই বিভিন্ন সংগঠনের সভা হতো। সভা চলাকালীন মাইকের আওয়াজে কলা ভবনে ক্লাস করা ছিল খুবই অসুবিধাজনক। শিক্ষা সংস্কার আন্দোলন থেকে প্রস্তাব করা হয়েছিল, ক্লাস চলাকালীন সময়ে এখানে সভা না করে মল চত্বরে সভা-সমাবেশ করার জন্য। বলা হয়েছিল, মল চত্বরে থাকবে উন্মুক্ত মঞ্চ এবং এম্ফিথিয়েটারের মতো সিমেন্ট নির্মিত গোলাকার বসার ব্যবস্থা। এজন্য উপাচার্যের বাসভবনের বিপরীতে মল চত্বরে স্থান নির্বাচন করা হয়েছিল এবং ছাত্রলীগসহ কয়েকটি সংগঠন সেখানে বেশ কিছুদিন সভাও করেছিল। কিন্তু এরপর থেকে এসব অনুষ্ঠান ধীরে ধীরে আবার বটতলাতে ফিরে আসতে থাকে।

তখনও অপরাজেয় বাংলা নির্মিত হয়নি। শিক্ষা সংস্কার আন্দোলন থেকে দাবি করা হয়েছিল মল চত্বরের মাঝামাঝি জায়গায় মুক্তিযুদ্ধের একটি বড় স্মারক ভাস্কর্য নির্মাণের। এখানেও থাকবে একটি মঞ্চ এবং এর চারপাশের বাগান শোভিত সবুজ প্রাঙ্গণে দর্শক-শ্রোতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। দাবির প্রেক্ষিতে প্রশাসন থেকে তার উদ্যোগও নেয়া হয়েছিল। তখনকার উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোজাফফর আহমেদ চৌধুরীর স্থাপন করা সেই ভিত্তি প্রস্তরটি এখনও জরাগ্রস্ত অবস্থায় বাণিজ্য ভবনের পশ্চিমে মল চত্বরে কোনমতে টিকে আছে। নামের সঙ্গে মিল রেখে তখন মল চত্বরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে সত্যি সত্যিই বাগান করা হয়েছিল। লাগানো হয়েছিল অনেক কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, জারুল, কণকচাঁপা, কামিনী, শিউলি ও মহুয়ার গাছ। এর মাঝের রাস্তাগুলোর দু’ধারে লাগানো হয়েছিল সারিবদ্ধ ঝাউ গাছ। বাগান পরিচর্যার জন্য নিয়োগ করা হয়েছিল চারজন মালি। কিন্তু কালক্রমে বাগানটি টেকেনি। শাহবাগের ফুলের দোকানিরা তোড়া বানাবার জন্য প্রতিদিন ভোরে এখানকার ঝাউ গাছগুলোর ডাল ভাঙ্গতো নির্বিবাদে। এছাড়া আরেক উপদ্রব ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের গৃহপালিত অগুণতি গরু-ছাগলের এই বাগানে অবাধ বিচরণ। এখন মল চত্বরে সেই সময়কার মাত্র কয়েকটি কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, জারুল, কণকচাঁপার গাছ টিকে আছে। আর আছে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার একটিমাত্র মহুয়ার গাছ।

মল চত্বরে বক্তৃতা মঞ্চ, এম্ফিথিয়েটার ও ভাস্কর্য নির্মিত না হলেও পরবর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে অপরাজেয় বাংলা নির্মাণ করা হয়েছে, এম্ফিথিয়েটার নির্মিত হচ্ছে সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের সামনে, নতুন নতুন অনেক ভবন ও হল তৈরি হয়েছে। সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক উন্নতি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের দেয়ালগুলো ছাড়া একাডেমিক ভবনগুলোতে বা ক্লাসরুমে এখন আর কেউ সেøাগান লেখে না। প্রক্টরিয়াল নিয়ন্ত্রণের কারণে যত্রতত্র পোস্টার লাগানোর হারও এখন অনেক কম। সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও সুবিধাবলী এখন অনেক উন্নত। এসব উদ্যোগ গ্রহণের জন্য বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাচার্যবৃন্দকে অবশ্যই অভিনন্দন জানাই।

কিন্তু এখন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সভা-সমাবেশ-সম্মেলনগুলো বটতলা ছেড়ে আরও এগিয়ে কলাভবনের লাগোয়া অপরাজেয় বাংলায় এসে ঠেকেছে। সবাই এখন এই ভাস্কর্যটিকেই মঞ্চ বানাচ্ছে। এর চারদিকে মাইক লাগানোর পর এর দুঃসহ শব্দে কলাভবন বা এর আশপাশে যখন ক্লাস নেয়া দূরের কথা, হাজার হাজার ছাত্র-শিক্ষক স্বাভাবিক শব্দে কথাও বলতে পারেন না, তখন কামাল ভাইয়ের কথা আর তাঁর নেয়া শিক্ষা সংস্কার আন্দোলনের কথা খুব মনে পড়ে।

কামাল ভাই সম্পর্কে আলোচনার সময় তাঁর অনেক অবদানের কথা সঙ্গতভাবেই আলোচনায় আসে। কিন্তু তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত শিক্ষা সংস্কার আন্দোলনের কথা উল্লেখ না করলে ব্যাপারটি অসম্পূর্ণ থেকে যায় বলেই আমার বিশ্বাস। এই আন্দোলনের সঙ্গে আমার চাইতেও সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন এমন অনেকেই দেশে-বিদেশে এখনও কর্মরত আছেন। অনুগ্রহ করে তারাও যদি এ বিষয়ে স্মৃতি হাতড়ে আরও কিছু তথ্য সংযোগ করেন, তাহলে কামাল ভাইয়ের এ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি বিস্মৃতিতে হারিয়ে যাবে না।

 

লেখক : ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

সৌজন্যে: জনকণ্ঠ




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায় ঠেকাতে ১০ কমিটি - dainik shiksha ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায় ঠেকাতে ১০ কমিটি এমপিওভুক্ত হচ্ছেন স্কুল-কলেজের ১১২৪ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন স্কুল-কলেজের ১১২৪ শিক্ষক নভেম্বরের এমপিওতেই ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি - dainik shiksha নভেম্বরের এমপিওতেই ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায় বন্ধের নির্দেশ শিক্ষামন্ত্রীর - dainik shiksha ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায় বন্ধের নির্দেশ শিক্ষামন্ত্রীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ট্রাফিক সার্কুলেশন প্ল্যান তৈরির নির্দেশ - dainik shiksha শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ট্রাফিক সার্কুলেশন প্ল্যান তৈরির নির্দেশ এমপিওভুক্ত হচ্ছেন মাদরাসার ২০৭ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন মাদরাসার ২০৭ শিক্ষক ২৮৮ তৃতীয় শিক্ষককে এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত - dainik shiksha ২৮৮ তৃতীয় শিক্ষককে এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website