সাক্ষরতা অর্জন করি, দক্ষ হয়ে জীবন গড়ি - মতামত - Dainikshiksha


সাক্ষরতা অর্জন করি, দক্ষ হয়ে জীবন গড়ি

মো. সিদ্দিকুর রহমান |

‘সাক্ষরতা অর্জন করি, দক্ষ হয়ে জীবন গড়ি’ এ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে এ বছর ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালন করা হচ্ছে। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর আমাদের দেশে সাক্ষরতার হার এখন ৭২.৯ শতাংশ। বিগত বছরের তুলনায় বেড়েছে ৬ শতাংশ। বৃদ্ধির হার অতি নগণ্য। নিরক্ষরমুক্ত জনগোষ্ঠী ছাড়া মানব উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই বিষয়টিকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে নিরক্ষর মুক্ত দেশ গঠনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে  হবে। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের ৮ সেপ্টেম্বর তেহরানে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর শিক্ষামন্ত্রীদের সম্মেলন থেকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযাযী ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে বিশ্বের প্রায় দেশে দিনটি পালিত হয়ে আসছে। ১০ ডিসেম্বর, ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণার ২৬ নং ধারায় শিক্ষা বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে ।

ক. প্রত্যেকেরই শিক্ষালাভের অধিকার রয়েছে। অন্ততপক্ষে প্রাথমিক ও মৌলিক পর্যায়ে শিক্ষা অবৈতনিক হবে। প্রাথমিক শিক্ষা হবে বাধ্যতামূলক। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সাধারণভাবে লভ্য থাকবে এবং উচ্চতর শিক্ষা মেধার ভিত্তিতে সবার জন্য সমভাবে উন্মুক্ত থাকবে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদে বলা আছে, রাষ্ট্র একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সব বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য।

খ. সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য এবং সে  প্রয়োজন সিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য।

গ. আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বিশাল জনগোষ্ঠীরকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করে তাদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার উদ্দেশ্যে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প গ্রহণ করে। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের অনুমোদন পায়। এরপরই সরকারের সম্পূর্ণ অর্থায়নে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণলায়ের অধীনে উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর তত্ত্বাবধানে প্রকল্পের বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। এ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলার ২৫০টি উপজেলার ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৪৫ লাখ নিরক্ষরকে সাক্ষর করাসহ জীবনমুখী শিক্ষাদানের উদ্যোগ নেয়া হয়। 

ইউনেস্কো ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রতিবছর শিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করে আসছে, যা ‘সবার জন্য শিক্ষা গ্লোবাল মনিটরিং রিপোর্ট ’ নামে পরিচিত। এর মধ্যে ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত রিপোর্টের প্রায় পুরোটাই ছিল সাক্ষরতার ওপর। ‘জীবনের জন্য শিক্ষা’ ছিল প্রধান  উপজীব্য। এতে বলা হয়, সাক্ষরতা একটি অধিকার এবং সব শিক্ষার ভিত্তি। সাক্ষরতা মানুষকে জীবনযাপনের জ্ঞান ও কৌশল শেখায়। সমাজে অধিকতর সক্রিয় অংশগ্রহণে অভ্যস্ত করে। বর্তমান জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতিতে সাক্ষরতায় দক্ষতা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইউনেস্কো থেকে প্রকাশিত ‘সবার জন্য শিক্ষা: গ্লোবাল মনিটরিং রিপোর্ট ২০১৫‘-এর ১০ সুপারিশ এবারের আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসেও প্রাসঙ্গিক ও প্রণিধানযোগ্য:

১. শৈশবকালীন যত্ন  ও শিক্ষায় গুরুত্বারোপ।

২. সব শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনে সক্ষম করে তুলতে প্রয়োজনীয়  সবকিছু করা।

৩. যুবক ও বয়স্কদের মধ্যে কর্ম ও জীবনদক্ষতা অর্জন প্রবণতা উন্নত করা।

৪. সাক্ষরতা ও গণিত বিষয়ে জ্ঞানের অধিকার আদায়ে বয়স্ক ব্যক্তিদের সক্ষম করে তোলা।

৫. জেন্ডার অসমতা থেকে সরে এসে জেন্ডার বৈষম্যহীনতার ওপর গুরুত্বারোপ ।

৬. শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ।

৭. সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা সহায়তা ও সম্পদ বৃদ্ধি করা।

৮. সমতার ওপর গুরুত্ব জোরদার করা।

৯. পরিবীক্ষণ  আরও উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের অভাব পূরণ করা।

১০. শিক্ষার জন্য উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখতে সমন্বয়বিষয়ক চ্যালেঞ্জ উত্তরণ। 

সাক্ষরতা অর্জনের  সাথে দক্ষ জীবন গড়ার সম্পর্ক জড়িত। দক্ষ হয়ে জীবন গড়ার জন্য কার্যকর সাক্ষরতা অর্জনের  বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি দেশের ব্যয় চিত্র তুলে ধরছি। গ্লোবাল  এডুকেশন ডাইজেস্টের ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশ যেখানে শিক্ষা খাতে বাজেটে মোট ব্যয়ের ১৩.৮ শতাংশ ও জিডিপির ২.০ শতাংশ ব্যয় করছে, সেখানে ভুটান মোট ব্যয়ের ১৭.৮ ও  জিডিপির ৬.০, ভারত মোট ব্যয়ের ১৪.১ ও জিডিপির ৩.৮, নেপাল মোট ব্যয়ের ২২.১ ও জিডিপির ৪.৭, পাকিস্তান মোট ব্যয়ের ১১.৩ ও জিডিপির ২.৫ শতাংশ ব্যয় করছে। সিদ্ধান্তহীনতা ও অদূরদর্শিতা সাক্ষরতা অর্জন তথা মানবসম্পদ উন্নয়নে বড় বাধা। বিগত বছর সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে ইউনেস্কো মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা বলেছেন, বিশ্বের ৭৫০ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এখনও সাক্ষরতার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের অনেক দূরে। ২৬৪ মিলিয়ন শিশু ও তরুণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এসব  বাধা মোকাবেলায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। আমিও আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি, ডিজিটাল জগৎ সাক্ষরতাকে  অপরিহার্য করে তুলছে। তবে মানুষ প্রযুক্তির দাস হবে না, প্রযুক্তিকেই তার প্রয়োজনে কাজে লাগাবে। সাক্ষরতা অর্জনের মাধ্যমেই গড়ে উঠবে দক্ষ জীবন গড়ার পথ চলা।  নিরক্ষরমুক্ত সমাজ গঠনে সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্য  জাগ্রত হোক সবার মাঝে এ প্রত্যাশা। 

তথ্য সংগ্রহ: আইএইচডি চেয়ারম্যানের নিবন্ধ থেকে ।

লেখক : আহ্বায়ক, প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরাম ও সম্পাদকীয় উপদেষ্টা, দৈনিক শিক্ষাডটকম।   




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
‘শিক্ষকদের অবসর-কল্যাণ সুবিধার তহবিল বন্ধ করে পেনশন চালু করতে হবে’ - dainik shiksha ‘শিক্ষকদের অবসর-কল্যাণ সুবিধার তহবিল বন্ধ করে পেনশন চালু করতে হবে’ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের প্রথম ধাপের পরীক্ষা ১০ মে - dainik shiksha প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের প্রথম ধাপের পরীক্ষা ১০ মে এসএসসির ফল ৫ বা ৬ মে - dainik shiksha এসএসসির ফল ৫ বা ৬ মে চাঁদা বৃদ্ধির পরও ২১৬ কোটি টাকা বার্ষিক ঘাটতি : শরীফ সাদী - dainik shiksha চাঁদা বৃদ্ধির পরও ২১৬ কোটি টাকা বার্ষিক ঘাটতি : শরীফ সাদী একাদশে ভর্তির নীতিমালা জারি, আবেদন শুরু ১২ মে - dainik shiksha একাদশে ভর্তির নীতিমালা জারি, আবেদন শুরু ১২ মে সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি - dainik shiksha সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website