স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ও অবৈতনিক মাধ্যমিক শিক্ষা - মতামত - দৈনিকশিক্ষা


স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ও অবৈতনিক মাধ্যমিক শিক্ষা

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী |

২০২০ খ্রিষ্টাব্দে জাতি মুজিববর্ষ উদযাপন করবে।  ২০২১-এ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির ইতিহাসে এ দুটো বছর নানা কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। অনাগত দিনে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এ দুটো বছরের দিকে তাকিয়ে নানা অর্জনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করবে। বছর দুটোকে টার্নিং পয়েন্ট ধরে প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ মেলাবে। সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতার বিচার বিশ্লেষণ করবে। যে দল সরকারে থাকবে, তার কৃতিত্ব মূল্যায়ন করবে। সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের সাফল্য ব্যর্থতার খতিয়ান তুলে ধরবে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের আয়োজন সম্পন্ন করা দরকার। সরকার যেমন মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের বহুমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করছে, তেমনি গোটা দেশের মানুষ এ দুটো পর্যায়ক্রমিক উৎসবের দিকে উন্মুখ তাকিয়ে আছে।

আমরা জেনে আনন্দিত হয়েছি যে, ইউনেস্কোর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাও মুজিববর্ষ উদযাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আমাদের সাথে ইউনেস্কোর ১৯৫টি দেশে মুজিববর্ষ পালন করা হবে। এ সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে অনন্য অহংকারের বিষয় এবং জাতির পিতা শেখ মুজিবের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্মাননা ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিব বিশ্ব বরেণ্য নেতা- এটি তারই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেস্কোর প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। কারণ সংস্থাটি সব সময় আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদায় উন্নীত করতে সংস্থাটির একক অবদানের কথা ভুলার নয়। ২১ ফেব্রুয়ারি এখন কেবল বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীতে উদযাপিত একটি পরিচিত দিন। গোটা দুনিয়া শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বাঙলার দামাল ছেলে সালাম, বরকত, রফিক ও জব্বারদের স্মরণ করে থাকে। যথাযোগ্য মর্যাদায় দুনিয়াব্যাপী দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে থাকে।

এখন ডিসেম্বর মাস। বিজয়ের এ মহান মাসে রাজাকারের একটি বিতর্কিত তালিকা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় যে দুর্ণাম কুড়িয়েছে, তা মুজিবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে কালিমা লেপনের ষড়যন্ত্র কিনা, তা খতিয়ে দেখা দরকার। এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের কলঙ্কিত করে রাজাকারদের পুনরুত্থানের পথ  প্রশস্ত করে দেবার অপপ্রয়াস চালানো হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। এ তালিকায় যেমন মানবতা বিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কুখ্যাত রাজাকার গোলাম আজম, কাদের মোল্লা, সাঈদী, সাকা চৌধুরী গংদের নাম নেই তেমনি অনেক নামীদামী মুক্তিযোদ্ধা রাজাকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এমন কাজটি কারা করলো, যে জন্য খোদ প্রধানমন্ত্রী তথা মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার মহানায়ক মুজিব কন্যাকে মিডিয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে জাতির ক্ষোভ ও কষ্ট নিবারণ করতে হলো? এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূলে কুঠারাঘাত ছাড়া কিছু নয়। মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার তথা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সকল কার্যক্রমকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়া হয়েছে। আমাদের  সৌভাগ্য এই যে, একজন বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা বেঁচে ছিলেন বলে অনেক দুঃসময় অবলীলায় অতিক্রম করা গেছেন। তা না হলে এতদিনে আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোথায় যে হারিয়ে যেত, তার ঠিক ঠিকানা নেই।

এদিকে বিজয়ের মহান মাসটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি নুরের উপর খোদ ডাকসু কার্যালয়ে ঢুকে যে সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়েছে, তাতে মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর প্রাক্কালে শিক্ষাঙ্গনগুলোকে অশান্ত করে তোলার ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাওয়া যায়। ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ’ নামে একটি ভুঁইফোঁড় সংগঠন বানিয়ে কারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আঘাত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে উঠেছে। এটি ব্যক্তি ভিপি নুরের উপর আঘাত নয়, এটি আমাদের স্বাধীনতার সূতিকাগার বলে পরিচিত ডাকসুর উপর নগ্ন আঘাত। যারা এ হীন কাজটি করেছে তারা জানে না, এই ডাকসু ভবনই আমাদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতার তীর্থ স্থান। বহু আন্দোলন ও সংগ্রামের পাদপীঠ। এই ডাকসুই আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের অগ্রনায়কদের জন্ম দিয়েছে। এই ডাকসু ভবনে ঢুকে এর ভিপির উপর হামলা করা স্বাধীনতার চেতনাকে লুণ্ঠিত করার সমান। স্বাধীনতার প্রতীক লাল সবুজের পতাকা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলার অপপ্রয়াস। এ হীন কাজ যারা করেছে, তাদের ক্ষমা নেই। এদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার নির্দেশ দেবার কারণে মুজিব তনয়া শেখ হাসিনার প্রতি আমাদের অনিমেষ শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।

২০২০ ও ২০২১ খ্রিষ্টাব্দ- অনিবার্য কারণে আমাদের কাছে দুটো আকাঙ্ক্ষিত বছর। এ দুটো বছর আমাদের উৎসাহ ও উদ্দীপনার বছর। জাতির জনক ও বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে খুব কাছে থেকে উপলব্ধির মাহেন্দ্র ক্ষণ এই ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ। শেখ মুজিবের আদর্শে নতুন করে উজ্জীবিত হবার বছর। তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার নতুন করে শপথ নেবার উপযুক্ত সময়। একটি শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য বঙ্গবন্ধু মুজিবের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের কথা জাতিকে স্মরণ করিয়ে দেবার এক উদার সময়। খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসনের ক্ষেত্রে সব বৈষম্য ঝেটিয়ে বিদায় করার দৃপ্ত প্রত্যয়ের এক শুভক্ষণ। এদিকে ২০২১ খ্রিষ্টাব্দ আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পঞ্চাশতম বছর। স্বাধীনতা লাভের অর্ধশত বছর পেরিয়ে আজ আমাদের নানা অর্জনের হিসাব-নিকাশ করতে হয়। সে হিসাব-নিকাশে প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির আসল চিত্র ফুটে ওঠে। প্রাপ্তি যেমন তৃপ্তি, তেমনি অপ্রাপ্তির বেদনা কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতা বৈ কিছু নয়।

স্বাধীনতার পঞ্চাশতম বার্ষিকীর প্রাক্কালে আমাদের অর্জন অনেক হলেও অপ্রাপ্তির কষ্টও কম নয়। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাস্তর সরকারিকরণ করা হলেও আজ পর্যন্ত শিক্ষার আর কোনো স্তর সরকারিকরণ করার কাজে হাত দেয়া হয়নি। যুদ্ধ বিধ্বস্ত জ্বলা-পোড়া দেশে প্রাথমিক শিক্ষা সরকারিকরণ করে অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করার যে  দুঃসাহসটি শেখ মুজিব দেখিয়ে গিয়েছিলেন, স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পরেও সে সাহসটি আর কেউ দেখাতে পারেনি। কথায় বলে, সব কাজ সবাইকে দিয়ে হয় না। সব কাজ করার সাহস সকলের থাকে না। যার দেহ ও শিরায় শেখ মুজিবের রক্ত বহমান, সেই শেখ হাসিনাই অবশিষ্ট শিক্ষাস্তর সরকারিকরণের সাহস দেখাতে পারেন বলে আমাদের বিশ্বাস। মাধ্যমিক শিক্ষা অবৈতনিক করে দিতে পারেন।

এখন বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি কাকতালীয় বিষয় এই যে, মুজিববর্ষ, স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দল আওয়ামীলীগ ও শেখ মুজিব তনয়া শেখ হাসিনা- সকলে একই সমতল ও সমান্তরালে যুগপৎ অবস্থান করছেন। পরিবেশ একদম অনুকূলে। কোনো কিছুতেই প্রতিকূলতা নেই। আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধকে অর্থবহ করে তুলতে এর চেয়ে উপযুক্ত আর কোনো সময় নেই। এমন আরেকটা সুদিন প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য আমাদের হবে না। এ রকম আরেকটা সুদিন কবে আসবে কে জানে? যেদিন স্বাধীনতার কোনো স্মরণীয় বা বিশেষ মুহূর্ত স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় জাতির জনকের উত্তরাধিকারের হাতে উদযাপিত হবে। হয়ত এমন একটা দিন আর জীবনেও কোনোদিন নাও আসতে পারে। সুতরাং শিক্ষার পরবর্তী সব কয়টি স্তর না পারলেও অন্তত দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তরটি সরকারিকরণ করে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন সফল ও সার্থক করা একান্ত অপরিহার্য।

মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীকে সামনে রেখে এই স্তরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এক সাথে সরকারিকরণের ঘোষণা দিয়ে অবৈতনিক মাধ্যমিক শিক্ষা চালু করা এখন সময়ের একটি বড় দাবি। এই দাবিটি মেনে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করলে তা সফল ও সার্থক হবে। মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের স্মৃতি জাতি বহুদিন পর্যন্ত মনে রাখবে। অন্যথায় সব আয়োজন অপূর্ণ থাকবে। মুজিববর্ষ আর স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর সব রাখঢাক ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। 

লেখক : অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট এবং দৈনিক শিক্ষার নিজস্ব সংবাদ বিশ্লেষক।




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
জেএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের - dainik shiksha জেএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্কুল খুললে সীমিত পরিসরে পিইসি, অটোপাস নয় : গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী - dainik shiksha স্কুল খুললে সীমিত পরিসরে পিইসি, অটোপাস নয় : গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাতীয়করণ: ফের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সেলিম ভুইঁয়া, কর্মসূচির হুমকি - dainik shiksha জাতীয়করণ: ফের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সেলিম ভুইঁয়া, কর্মসূচির হুমকি একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে - dainik shiksha একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে please click here to view dainikshiksha website