হে আল্লাহ, নেয়ামত উল্যাহদের শরমিনা আর শরমিনাদের নেয়ামত উল্যাহ বানিয়ে দাও - কলেজ - Dainikshiksha


হে আল্লাহ, নেয়ামত উল্যাহদের শরমিনা আর শরমিনাদের নেয়ামত উল্যাহ বানিয়ে দাও

সিদ্দিকুর রহমান খান |

২০০৩ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকের কথা। দাপুটে শিক্ষাসচিব মোহাম্মদ শহীদুল আলমের সামনে বসা ইংরেজি দৈনিক নিউ এইজের শিক্ষা রিপোর্টার আমি। আগেরদিন সচিবের বিরুদ্ধে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন নিয়ে সচিবের চোখে চোখ রেখে কথা বলছিলাম। এমন সময় সচিবের কক্ষে ঢুকলেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত সরকারি কলেজের কয়েকজন অধ্যাপক। তাঁদের হাতে বদলির আবেদন। দুতিনটি আবেদন দেখার পর শিক্ষকদের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন সচিব। এক পর্যায়ে আবেদন নিয়ে আসা শিক্ষা ক্যাডারের ওই কর্মকর্তাদের ধমকানো শুরু করলেন। সচিবের দৃষ্টিতে শিক্ষকদের অপরাধ, তাঁরা তাদের বদলির আবেদনের ওপর সরকার দলীয় এমপিদের দিয়ে লিখিত সুপারিশ করিয়েছেন। ইন্টারকমে ফোন দিলে সচিবের কক্ষে চলে আসলেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুকের পিএস সিনিয়র সহকারী সচিব গোলাম ইয়াহিয়া (উত্তরা ষড়যন্ত্রের অন্যতম কুশীলব ও বর্তমানে সরকারি ইডেন কলেজের সমাজবিজ্ঞানের দাপুটে বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক রওশন আরার স্বামী)।

দুই সন্তানের সঙ্গে শিক্ষক নেয়ামত উল্যাহকে আর দেখা যাবে না এভাবে। ছবি: মৃত নেয়ামত উল্যাহর ফেসবুক থেকে নেয়া

বললেন, একটা প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে এখনই। মন্ত্রী স্যার কোথায়? ইয়াহিয়া জানালেন, মন্ত্রী স্যার বাইরে। বিকেলে ফিরবেন। ইয়াহিয়াকে ডিকটেশন দিলেন সচিব। ১৫/২০ মিনিট পরে টাইপ করে প্রজ্ঞাপনের খসড়া নিয়ে সচিবের কক্ষে হাজির ইয়াহিয়া। প্রজ্ঞাপন জারি হলো। প্রজ্ঞাপনের মর্মার্থ খুবই ঔদ্ধত্যপূর্ণ মনে হলো আমার কাছে। সচিব প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। অপরদিকে একজন এমপি আইনপ্রণেতা। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। এমপিদের কোনও সুপারিশ যেন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের বদলির আবেদনে না থাকে। এছাড়া শিক্ষকরা বদলির আবেদন নিয়ে সরাসরি সচিবের কাছে যেতে পারবেন না। এই হলো ওইদিন জারি করা প্রজ্ঞাপনটির তাৎপর্য। সচিবের কাছে প্রজ্ঞাপনের একটা কপি চাইলাম। কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, আজকে আবার এটা নিয়ে রিপোর্ট লিখবেন নাকি? আমি বললাম লিখতেও পারি। একটা কপি পেয়ে সচিবের কক্ষ থেকে বেরিয়ে সোজা নিউ এইজ অফিসে গেলাম। টেলিফোনে কথা বলে নিলাম কয়েকজন এমপির সঙ্গে। রিপোর্টটি লিখে জমা দিলাম। পরদিন বড় করে প্রতিবেদনটি প্রকাশ হলো।

ওইদিন সংসদ চলছিল। সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে একাধিক এমপি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। অধিবেশন চলাকালে নিউ এইজে প্রকাশিত আমার লেখা প্রতিবেদনটি স্পিকারকে দেখালেন। এমপিরা বললেন, একজন সচিবের এত বড় স্পর্ধা কীভাবে হয়? শিক্ষকদের বদলির আবেদনে এমপিরা সুপারিশ করতে পারবেন না! দাপুটে শিক্ষাসচিব শহীদুলকে ওএসডি ও প্রজ্ঞাপনটি বাতিলের উদ্যোগ নিতে স্পিকারকে অনুরোধ করলেন সাংসদরা। প্রজ্ঞাপনটি নিয়ে সংসদে হইচইয়ের খবরটিও পরদিন বড় করে ছাপা হলো। বাতিল হলো প্রজ্ঞাপনটি। দুপুরে শিক্ষা ভবনে গেলে বিসিএস শিক্ষা সমিতির  তৎকালীন মহাসচিব আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকারসহ কয়েকজন নেতা আমাকে অভিনন্দন জানালেন। জড়িয়ে ধরে বললেন, “শিক্ষা ক্যাডার আপনার কাছে চির কৃতজ্ঞ থাকবে।” কিন্তু খুব মনখারাপ করলেন শিক্ষা অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক ও সরকারি জগন্নাথ কলেজে আমার অধ্যক্ষ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা মোহাম্মদ জুনাইদ। অধিদপ্তরে আমাকে পেয়ে তিনি বললেন, ‘তোমার পত্রিকায় (নিউ এইজে) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সচিব স্যার সারাদেশে খুব সমালোচনার মুখে পড়েছেন। সংসদে আলোচনা হয়েছে।’ আমি আস্তে করে মহাপরিচালককে বললাম, স্যার, বেয়াদবি নেবেন না, কারা যেন সচিবের জুতা পাহারা দেন? নায়েমের ডিজি খলিলুর রহমানও নাকি একই কাজ করেন? 

১৭ জুলাই মারা গেছেন সহকারী অধ্যাপক নেয়ামত উল্যাহ। ২রা অক্টোবর মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়েছে শিক্ষা অধিদপ্তরকে। জানতে চায় মৃত নেয়ামত উল্যাহ কেন কর্মস্থলে অনুপস্থিত!

মহাপরিচালক আমাকে বললেন, দেখো তো, শিক্ষা ভবনের কোনও গেট নেই। সবাই এখানে ঢুকতে পারে। জুতাচোর ওত পেতে থেকে শিক্ষা ভবন মসজিদে নামাজরতদের জুতা চুরি করে প্রায়ই। গত সপ্তাহে সচিব স্যারের দামি জুতা চুরি হয়েছে এখান থেকেই....   


প্রিয় পাঠক, এতক্ষণ প্রশাসন ক্যাডারের একজন দাপুটে সচিবের গল্প শুনলেন। এবার বদলির চক্করে পড়ে জীবন খোয়ানো শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা নেয়ামত উল্যাহর কষ্টকথা শুনুন। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কমকর্তা নেয়ামত উল্যাহর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে। এরপর অনেক বছর যোগাযোগ ছিলো না। ফেসবুক চালু হওয়ার পর একদিন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালেন। গ্রহণ করলাম। এর অনেক বছর পর ফেসবুকেই দেখলাম ডিআইএতে তাঁর পোস্টিং হয়েছে। ফেসবুকেই তার পারিবারিক ছবিসহ অন্যান্য খবর পেতাম। তিনিও আমার খবর রাখতেন ফেসবুকের মাধ্যমেই।  হঠাৎ কোথাও দেখা হলে গরগর করে আমার সব অ্যাক্টিভিটিস বলে দিয়ে আমাকে চমক দেয়ার চেষ্টা করতেন। বলতেন আমি কিন্তু আপনার ভক্ত।  

নেয়ামত উল্যাহ একদিন ফোন দিয়ে জানালেন, তাকে ফেনি সরকারি কলেজে বদলি করা হয়েছে। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ঢাকায় থাকার ফলে তিনি ঢাকা বা ঢাকার আশেপাশে কোথাও আসার চেষ্টা করছেন। তার বদলির জন্য তার শ্বশুরও  চেষ্টা করছেন। মাস পেরিয়ে বছর গড়ালেও খবর নেই। হঠাৎ দেখা গত ১৪ জুলাই। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে। আমি ধরে নিয়েছিলাম তিনি ঢাকার কোথাও বদলি হতে পেরেছেন। বললাম, কেমন আছেন? চাকরি কেমন চলছে? অভিমানের সুরে বললেন, ভালো নেই, “আপনি আমার খোঁজ রাখেন না, তাই আরও ভালো নেই।” নেয়ামত উল্যাহর হাতে হাত রেখে আমি বললাম,  স্যরি ব্রাদার। দোয়া চেয়ে চলে যাওয়ার সময় বললেন, চাকরিজীবনের বেশিরভাগ সময় আমাদের খারাপ পোস্টিংয়েই থাকতে হবে। কারণ, ভালো পোস্টিংয়ের জন্য অন্যরা যা পারে, আমরা তা পারি না। ভেবেছিলাম আমাদের ক্যাডারের একজন সিনিয়র এখন মন্ত্রণালয়ের কলেজ শাখার দায়িত্বে। এবার বুঝি শিক্ষা ক্যাডারের একটা বদলির ভাল নীতিমালা হবে। বৈষম্য দূর হবে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন নেয়ামত। এরপর করমর্দন করে চলে গেলেন।

 
ওটাই যে তাঁর শেষ যাওয়া তা কে জানত? 

১৮ জুলাই খবর পেলাম দর্শনের শিক্ষক নেয়ামত উল্যাহ আর নেই। তাঁর কয়েকজন ব্যাচমেট ও বন্ধু ঢাকার বনশ্রীতে তাঁর বাসায় গেছেন। মৃতদেহের সৎকারে অংশ নিয়েছেন। তাদের মুখেই শুনলাম। মৃত্যুর আগে অভিমানী নেয়ামত উল্যাহর আরও আরও কষ্টকথা। ভুলে থাকতে চেয়েছিলাম নেয়ামত উল্যাহকে। কিন্তু বারবার মনে পড়ে শেষ দেখার ওই স্মৃতি ওই কথাগুলো। নেয়ামত উল্যাহকে আবারও মনে করিয়ে দিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক আদেশ। মৃত্যুর  প্রায় পনেরদিন পর ফেনী কলেজ থেকে তাঁকে ঢাকার একটি ছোট কলেজে বদলির আদেশ জারি করা হয়েছে। বদলির আদেশটা দেখে হাসব না কাঁদব ভেবে পাচ্ছিলাম না। শিক্ষা ক্যাডারের কয়েকজন আমাকে বললেন, ভাই, একটা রিপোর্ট করিয়ে দেন আপনার দৈনিক শিক্ষায়। কিন্তু করালাম না, এই ভেবে যে হয়তো বদলির দীর্ঘ তালিকা আগেই অনুমোদন করে রাখা হয়েছিল। হঠাৎ আদেশ জারি করায় এমনটা হয়েছে। কিন্তু না, খোঁজ নিয়ে জানলাম তার মৃত্যুর খবর, জন প্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বেনিফিট ইত্যাদির সমস্ত কাগজ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কলেজ শাখার টেবিলেই। তবু চেপে রাখলাম রিপোর্ট লেখানো ও প্রকাশের সুযোগ। কিন্তু আর পারলাম না। সেপ্টেম্বর মাসে দেখলাম নেয়ামত উল্যাহ কেন কর্মস্থলে অনুপস্থিত তা তদন্ত করে মন্ত্রণালয়কে জানাতে অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এখানেই শেষ নয়। গত ২ অক্টোবর তাগিদ পত্র দিয়েছে মন্ত্রণালয়। স্মারক নম্বরে ভুল তারিখ লেখা চিঠিতে স্বাক্ষর রয়েছে একজন যুগ্ম-সচিবের। এই চিঠি দুটো দেখে আমার কোনও রিপোর্টারকে রিপোর্ট লিখতে না বলে নিজেই সম্পাদকীয় লিখতে বসলাম। কারণ, মৃত নেয়ামতকে শুধু বদলি করেই ক্ষান্ত হয়নি মন্ত্রণালয়। কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অপরাধে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু ও অতিসত্বর প্রতিবেদন পাঠাতে শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ এবং এর তাগিদপত্রও দিয়েছে! 

পাদটীকা: দুই বছর আগে শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা শরমিনাকে ঢাকার একটি বড় কলেজে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু  যোগদানের পর একদিনের জন্যও ওই কলেজে যাননি তিনি। কর্মস্থলে অননুমোদিতভাবে মাসের পর মাস অনুপস্থিতির কারণ মৌখিকভাবে জানতে চাইলে কলেজটির অধক্ষের ওপর ক্ষুব্ধ হন শরমিনা। অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকেও চোখ রাঙানি দেন শরমিনা। সহকারী অধ্যাপক শরমিনা বেঁচে আছেন, নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন কিন্তু কলেজে ক্লাস নেন না। আমি কি আল্লাহর দরবারে এই প্রার্থনা করতে পারি যে, ‘হে আল্লাহ, শিক্ষা ক্যাডারের সব নেয়ামত উল্যাহদের শরমিনা বানিয়ে দাও। যাতে জীবিত থেকে ক্লাস না নিয়েও, কলেজে না গিয়েও তাদের তদন্তের মুখোমুখি হতে না হয়। আর সব শরমিনাদের নেয়ামত উল্যাহ বানিয়ে দাও যাতে সবাই আজীবন ‘হেনী’ কলেজে থাকতে পারেন।’  

সম্পাদক, দৈনিক শিক্ষাডটকম। 




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
ডিগ্রি ভর্তির অনলাইন আবেদন শুরু আজ - dainik shiksha ডিগ্রি ভর্তির অনলাইন আবেদন শুরু আজ বৈশাখী ভাতা ও ইনক্রিমেন্ট কার্যকর জুলাই থেকেই - dainik shiksha বৈশাখী ভাতা ও ইনক্রিমেন্ট কার্যকর জুলাই থেকেই সরকারি হলো আরও ৪ মাধ্যমিক বিদ্যালয় - dainik shiksha সরকারি হলো আরও ৪ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২০ হাজার টাকায় শিক্ষক নিবন্ধন সনদ বিক্রি করতেন তারা - dainik shiksha ২০ হাজার টাকায় শিক্ষক নিবন্ধন সনদ বিক্রি করতেন তারা অকৃতকার্য ছাত্রীকে ফের পরীক্ষায় বসতে দেয়ার নির্দেশ - dainik shiksha অকৃতকার্য ছাত্রীকে ফের পরীক্ষায় বসতে দেয়ার নির্দেশ আইডিয়াল স্কুলে ভর্তি ফরম বিতরণ শুরু - dainik shiksha আইডিয়াল স্কুলে ভর্তি ফরম বিতরণ শুরু নির্বাচনের সঙ্গে পেছাল সরকারি স্কুলের ভর্তি - dainik shiksha নির্বাচনের সঙ্গে পেছাল সরকারি স্কুলের ভর্তি শিক্ষকদের অন্ধকারে রেখে দেড় লাখ কোটি টাকার প্রকল্প! - dainik shiksha শিক্ষকদের অন্ধকারে রেখে দেড় লাখ কোটি টাকার প্রকল্প! একাডেমিক স্বীকৃতি পেল ৪৭ প্রতিষ্ঠান - dainik shiksha একাডেমিক স্বীকৃতি পেল ৪৭ প্রতিষ্ঠান দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website