৬৮ শতাংশ শিক্ষক ফেল কেন! - সম্পাদকীয় - Dainikshiksha


৬৮ শতাংশ শিক্ষক ফেল কেন!

সিদ্দিকুর রহমান খান |

পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া বেসরকারি শিক্ষক ও হবু শিক্ষকদের পাসের হার প্রায় ৩২ শতাংশ হলে শিক্ষার্থী পাসের হার কীভাবে ৯২ শতাংশ হয়?

প্রায় একই পদ্ধতির পরীক্ষা এবং প্রায় একই পাঠ্যবই পড়ে ভিন্ন ভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় বসা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পাসের হারে আকাশ-পাতাল ব্যবধান হয় কেন? এটা বোঝার আগে জেনে নিই বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য পাবলিক পরীক্ষা ও ফলাফলের আদ্যোপান্ত।

২১ আগস্ট দশম বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। এতে পাসের হার প্রায় ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ ৬৮ শতাংশ ফেল। পরীক্ষার্থী ছিলেন সাড়ে তিন লাখের বেশি। এ পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়াধীন বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ বা এনটিআরসিএর।

এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের একটি অংশ বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত, বাদবাকিরা হবু শিক্ষক। যদিও ২০০৫ খ্রিস্টাব্দের ২০ মার্চ থেকে কার্যকর হওয়া নিবন্ধন আইন অনুযায়ী বেসরকারি হাইস্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় এমপিও-ননএমপিওনির্বিশেষে সব শিক্ষকের নিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক। জানামতে, শিক্ষক পদে চাকরির বাজারে নিবন্ধনধারী ব্যক্তির আকাল, সে বিবেচনায় নিবন্ধন সনদ ছাড়াই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে বাধ্য হচ্ছে স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষ।
চাকরিরত অনেকেই নিবন্ধন পরীক্ষা দেন। অনেকেই একাধিকবার পরীক্ষা দিয়েও পাস করতে পারেননি। অথচ এ শিক্ষকেরাও জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসির প্রশ্নকর্তা, পরীক্ষার হলে পরিদর্শক, পরীক্ষক ইত্যাদি।
বিগত কয়েক বছরের নিবন্ধন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা যে পাঠ্যবই পড়ে এক হাজার ২০০ নম্বরের পাবলিক পরীক্ষায় বসে, শিক্ষকেরাও প্রায় একই বই পড়ে ২০০ নম্বরের নিবন্ধন পরীক্ষায় বসেন। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের জন্য আলাদা পরীক্ষায় ২০০ নম্বরের টানা চার ঘণ্টার পরীক্ষা দিতে হয়। এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার মতোই নির্দিষ্ট সিলেবাস থাকে এবং এর মধ্য থেকেই প্রশ্ন করা হয়। এ খাতাও মূল্যায়ন করেন স্কুল-কলেজের শিক্ষকেরাই।

২০০৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু হয়ে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত মোট ১১টি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার পাসের গড় হার ৩০ শতাংশের নিচে। অর্থাৎ ৭০ শতাংশ শিক্ষক তাঁদের জন্য পাবলিক পরীক্ষায় ফেল করেন। এই হলো কর্মরত শিক্ষক বা হবু শিক্ষকদের গড় পাসের হার। দেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি। এখানেই শিক্ষকতা করছেন নিবন্ধন পাস ও ফেল উভয় প্রকারের শিক্ষকেরা।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিসহ নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ এসএসসি ও এইএসসি পরীক্ষার ফল। তবু তুলনার স্বার্থে সাম্প্রতিক এইচএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার পাসের হার উল্লেখ করছি। চলতি বছরের মে মাসে প্রকাশিত আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি পরীক্ষায় পাস করেছে ৯২ দশমিক ৬৭ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় ৩ শতাংশ বেশি।
১৩ আগস্ট প্রকাশিত আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ৭৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ, যা গতবারের তুলনায় সাড়ে ৪ শতাংশ বেশি।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবার জানা, ইংরেজি ও গণিত বিষয় দুটো পাবলিক পরীক্ষায় পাস-ফেলের নিয়ামক। চলতি ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে ৯২ দশমিক ৬৭ শতাংশ পরীক্ষার্থী এসএসসি পাস করেছে। সামান্য কয়েকজন বাদে এ শিক্ষার্থীরাই ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে দশম শ্রেণিতে ২০১২ খ্রিস্টাব্দে নবম, ২০১১ খ্রিস্টাব্দে অষ্টম, ২০১০ খ্রিস্টাব্দে সপ্তম ও ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে ষষ্ঠ শ্রেণি পড়ুয়া ছিল। তারাই ষষ্ঠ শ্রেণিতে থাকাকালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ও জেলা প্রশাসক এবং জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত ১০০ নম্বরের প্রাক্-মূল্যায়ন সমীক্ষায় বসেছিল। পরীক্ষার নম্বর বিভাজন বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে মোট ৬০ এবং সমাজ ও বিজ্ঞানে ৩০ এবং ধর্মে ১০। পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যবই থেকে তৈরি করা প্রশ্নে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত প্রাক্-মূল্যায়ন সমীক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, শিক্ষার্থীরা কী ধরনের দুর্বলতা নিয়ে মাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি হয়, তা জানা।

আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা প্রায় সব জেলার মূল্যায়ন সমীক্ষার সমন্বিত ফলাফলের সারাংশ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জেলার উদাহরণ দিচ্ছি। ওই সমীক্ষায় ঢাকা মহানগরসহ ঢাকা জেলার মোট ২৬টি থানা/উপজেলার ষষ্ঠ শ্রেণির প্রায় ৭৫ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে ৩৯ শতাংশের বেশি ফেল করেছে। অর্থাৎ ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় বসে ২৯-এর কম নম্বর পেয়েছে।

এ সমীক্ষায় শূন্য থেকে ২৯ নম্বরধারীদের ফেল ও ৩০-এর বেশি পেলে পাস ধরা হয়। পাঠক, মিলিয়ে দেখুন, চলতি বছর এসএসসিতে ঢাকা বোর্ডের পাসের হার ৯৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ। মাত্র ৬ শতাংশ ফেল। আর এরাই যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে ছিল, তখন ফেলের হার ৩৯ শতাংশের বেশি। তা-ও আবার ঢাকা মহানগরসহ ঢাকা জেলায় যেখানে ভালো প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের সংখ্যা বেশি বলে দাবি করা হয়। এবার দেখুন, চট্টগ্রাম মহানগরসহ এ জেলার প্রায় ৭৭ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে ফেল করেছে ৪৪ শতাংশ।

শিক্ষানগর হিসেবে খ্যাত রাজশাহী মহানগরসহ ১০ উপজেলার প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষার্থীর ৪৬ শতাংশই ফেল। নানা বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ কুমিল্লা জেলা থেকে ৬৭ হাজার অংশ নিয়ে ফেল করেছে প্রায় ৪৮ শতাংশ। বরিশাল জেলার প্রায় ৩০ ও কিশোরগঞ্জের ৪৪ শতাংশ ফেল। শিক্ষামন্ত্রীর সিলেট বিভাগে এবার এসএসসিতে পাসের হার ৮৯ শতাংশের বেশি। কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণির প্রাক্-মূল্যায়ন সমীক্ষায় দেখা যায়, হবিগঞ্জের প্রায় ৫০ শতাংশ, সদরসহ সিলেট জেলার প্রায় ২৫ শতাংশ ও সুনামগঞ্জের প্রায় ৪৪ শতাংশ ফেল করেছে। কেউ কেউ হয়তো বলতে চাইবেন, দক্ষ শিক্ষকদের সহায়তায় চার-পাঁচ বছরে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে দক্ষতা অর্জন করে নিয়েছে এ বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী। পাঠকের এ যুক্তির বিপরীতে বলতে চাই, ইংরেজি ও গণিতে হাজার হাজার দক্ষ শিক্ষক হঠাৎ নাজিল হওয়ার সুযোগ নেই। এরশাদের জমানায় ইংরেজি ও গণিত ছাড়াই স্নাতক পাস করে যাঁরা শিক্ষকতায় ঢুকেছিলেন, তাঁরাই এখন স্কুল-কলেজের সিনিয়র শিক্ষক। দু-চারজন ব্যতিক্রম বাদে কারা স্বেচ্ছায় বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক হন, তা–ও সবার জানা। কিন্তু কথা হচ্ছে, যা চলছে তাই কি চলতে থাকবে? কোথাও তো একটা ইতি টানতে হবে, যাতে করে একটা সুস্থ জায়গায় যাওয়া যায়।

সিদ্দিকুর রহমান খান, সম্পাদক, দৈনিক শিক্ষাডটকম। 

বি: দ্র: দৈনিক শিক্ষার সম্পাদকের এই লেখাটি ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ২৮ আগস্ট প্রথম আলোর সম্পাদকীয়তে প্রকাশ হয়। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় লেখাটি পুন:প্রকাশ করা হলো।  




পাঠকের মন্তব্য দেখুন
শিক্ষার মান ঠিক করতে হবে: শিক্ষামন্ত্রী - dainik shiksha শিক্ষার মান ঠিক করতে হবে: শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন: অর্থমন্ত্রী - dainik shiksha শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন: অর্থমন্ত্রী ববির রেজিস্ট্রারের নৈতিক স্খলন, কাজে যোগদানের ব্যর্থ চেষ্টা - dainik shiksha ববির রেজিস্ট্রারের নৈতিক স্খলন, কাজে যোগদানের ব্যর্থ চেষ্টা কোচিংয়ে লিপ্ত উইলসের ৩০ শিক্ষকের নাম - dainik shiksha কোচিংয়ে লিপ্ত উইলসের ৩০ শিক্ষকের নাম রকেটের জটিলতায় উপবৃত্তিবঞ্চিত রাজশাহীর শত শত শিক্ষার্থী - dainik shiksha রকেটের জটিলতায় উপবৃত্তিবঞ্চিত রাজশাহীর শত শত শিক্ষার্থী প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৫ মার্চ শুরু - dainik shiksha প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৫ মার্চ শুরু ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া শিক্ষার খবর সবার আগে পেতে ‘দৈনিক শিক্ষা ব্রেকিং নিউজ’ ফেসবুক পেজে লাইক দিন - dainik shiksha শিক্ষার খবর সবার আগে পেতে ‘দৈনিক শিক্ষা ব্রেকিং নিউজ’ ফেসবুক পেজে লাইক দিন please click here to view dainikshiksha website