ইএফটি বাস্তবায়ন করতে শিক্ষা ভবনের দুর্নীতিবাজদের অপসারণ জরুরি - মতামত - দৈনিকশিক্ষা


ইএফটি বাস্তবায়ন করতে শিক্ষা ভবনের দুর্নীতিবাজদের অপসারণ জরুরি

মাছুম বিল্লাহ |

বরাবরের মতোই শিক্ষার সব নতুন খবর সবার দৈনিক শিক্ষায়। নতুন বছরের ৭ তারিখ ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি)-র মাধ্যমে এমপিও-র টাকা নিতে শিক্ষকদের প্রস্তত থাকতে বলার খবরটিও দৈনিক শিক্ষার মাধ্যমেই জেনেছেন শিক্ষকরা। সংবাদটি বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য কতটা আনন্দের তা এক কলামে লিখে বোঝানো যাবে না।

আমাদের রাষ্টায়াত্ব প্রতিষ্ঠানগুলোতে হয়ারনি  হয় বিভিন্ন কারণে। একটি হচেছ প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানি। যারা যে কাজ করেন তারা সেই বিষয়য়ের খুঁটি নাটি জানেন, তাদের জানারই কথা। কিন্তু হঠাৎ যারা সেবা পেতে আসেন তাদের তো সে রকম জানার কথা নয়। এক্ষেত্রে বেসরকারি বা বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তবসম্মত কিছু  পদক্ষেপ গ্রহন  করে  বলে সেবার মান বেশি, হয়রাণি অনেক কম কিংবা নেই বললেই চলে। এসব প্রতিষ্ঠান  মানুষকে সেবা দিতে চায়, সেবা দেয়ার জন্য অপেক্ষা করে। তারা ওয়েবসাইটে নির্দিষ্ট কিছু কাজের জন্য যেসব ডকুমেন্ট প্রয়োজন তার তালিকা সব সময় ওয়েবসাইটে হালনাগাদ করে রাখেন। দ্বিতীয়ত, মিডিয়ায় মাঝে মাঝে সেসব ডকুমেন্ট নিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার করে থাকেন সেবাকরীদের অবহিত করার জন্য। অফিসে ঢুকে সবকিছু নির্দিষ্ট জায়গায় লেখা থাকে যাতে সেবাগ্রহনকারীদের সমস্যা না হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা দেওয়া থাকে সেখানে।

তারপরেও, অফিস থেকেই নির্ধারিত কিছু কর্মকর্তা/কর্মচারি আছেন যারা এসে আপনাকে বলবে ‘আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?’ আপনি যে কাজে এসেছেন সেটি বললে আপনাকে তারা সব দেখিয়ে দেবেন কোন ডেস্কে যেতে হবে, কি কি লাগবে। যদি কোন ডকুমেন্ট না থেকে থাকে তাহলে তার বিকল্প কি কিংবা সহজে সেটি কিভাবে করা যাবে সেটি বলে দিবেন আর্থাৎ তারা আপনার পাশে আছেন। এ ছাড়াও কর্মকর্তারা  নিজেরাও  মাঝে মাঝে তাদের রুম থেকে বের হয়ে কাষ্টমারদের জিজ্ঞেস করেন কে কি জন্য এসেছেন, কোন সমস্যা আছে কিনা। একটু ভীড় হলে তাদের লোকদের জিজ্ঞেস করেন, কেন ভীড় হয়েছে । সেই অবস্থা যাতে না হয় সেজন্য সবাই তৎপর থাকেন যাতে সেবাগ্রহনকারীদের সেবা পেতে কোন সমস্যা না হয়।  

আমাদের অধিকাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানে এর সবকিছুই উল্টো। অনন্য ব্যতিক্রম ছাড়া আপনি আপনার সঠিক কোন তথ্য ওয়েবসাইটে পাবেন না। আপনি চাবেন একটি আসবে হাজার ধরনের এলোমেলো তথ্য। সঠিকভাবে কোন কিছু লেখা আপনি পাবেন না। বহু কষ্ট করে আপনি কিছু ডকুমেন্ট নিয়ে এসেছেন, দিনের পর দিন অপেক্ষা করে, জুতার তলা ক্ষয় করে  যখন কাঙ্খিত কর্মকর্তার রুমে ঢুকবেন তখন তার পিওন বলবেন দেখি আপনার কাগজপত্র, ওনার বিশেষ উদ্দেশ্যে আপনাকে হাইকোর্ট দেখানোর চেষ্টা করবেন।বলবেন আপনার এটা নেই, সেটা নেই, এটি এভাবে কেন ইত্যাদি। আপনি বলবেন আমি সেই রংপুর থেকে এসেছি কিংবা চট্টগ্রাম থেকে এসেছি এখন এই কাগজ আনতে আমি আবার সেখানে যাব? সে বিরক্ত হয়ে বলবে ’ সেটি আমি কি করে বলব আপনি কি করবেন? কাজে আসছেন কাগজপত্র নিয়ে আসবেন না ? উনি যে কাজটি বিকল্প উপায়ে অর্থের বিনিময়ে করে দিতে পারেন সিটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেন। পরে, টাকা দিলে সব ঠিক। বড় বড় কর্মকর্তারা কখনও জানতে চান না বা জিজ্ঞেসও করেন না, এত লোকের সমাগম কেন, কি তাদের সমস্যা। অবস্থা দেখে মনে হয় তারা যেন চানই যে, লোকজন ভীড় করে বিরক্ত হয়ে চলে যাবে, তাতেই তাদের সাফল্য, আনন্দ, কারন তারা যে বড় কর্মকর্তা!আমাদের রাষ্ট্রায়ত্ব কোন প্রতিষ্ঠানে কিন্তু কোন ধরনের পরিবর্তন হয়নি, বেতন যদিও দ্বিগুনেরও বেশি হয়েছে। জগনগনের সেবা পেতে অর্থের পরিমানও যে বেড়েছে সেটি জানিনা রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করেন তারা জানেন কিনা। 

দ্বিতীয় হয়রানি হয় সিষ্টেমের অভাবে, অদক্ষতার কারণে। বেসরকারি বা বিদেশী কোন অফিসে গেলে একই কাজের জন্য কয়েকটি ডেস্ক/কাউন্টার থাকে। কোন ডেস্কে সেবাগ্রনকারীদের সংখ্যা বেশি হলে, যেটিতে কম আছে সেখান থেকে আপনাকে ডাকবে বা তারাই আপনাকে নিয়ে যাবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে  এর কোন বালাই নেই। দশজন লোককে সার্ভিস দিতে একটি ডেস্ক , দু’শো জন লোককে সার্ভিস দিতেও একটি ডেস্ট। ফলে, ভীড়,  বিরক্তি,  হয়রানি ও  দুর্নীতি তো সেখানে হবেই। মনে হয়, ইচেছ করেই যেন এসব বাঁধিয়ে রাখা হয় । 

ইএফটিতে বেতন পেতে  মাধ্যমিক ও উচচ শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে শিক্ষকদের কাছে যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছে ---(১) জাতীয় পরিচয় পত্রের নম্বর (২) এসএসসি সনদ অনুযায়ী শিক্ষকদের নাম । বলা হয়েছে এক্ষেত্রে  শিক্ষাসনদ, এমপিও শিট ও জাতীয় পরিচয় পত্রের বানান একই হতে হবে।  এগুলো তো অবশ্যই যুক্তির কথা। কিন্তু আমরা জানি আমাদের দেশের শিক্ষাবোর্ড থেকে দেয়া সার্টিফিকেটগুলো ছিল বাংলায়। যখন শিক্ষকদের বেতন ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়া শুরু হলো এবং কম্পিউটারে তথ্য রাখা শুরু হলো তখন বাংলা থেকে ইংরেজি করা নাম বিভিন্নভাবে লেখা হয়েছে। অনেকের নামের পূর্বে মু:/মো:/মোহাম্মদ/মুহম্মদ/মুহাম্মদ থাকে।এটি নিয়ে প্রাইভেট ব্যাংকে আমরা দেখেছি তারা মূল নামের পূর্বের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়না, মূল নাম ঠিক আছে কিনা সেটি দেখে সহজে লেন-দেন করতে দেয়। কিন্তু সরকারি ব্যাংক বা অফিসের নিয়ম তো আলাদা। শিক্ষকদের ক্ষেত্রে যা হয়েছে--- কারুর নাম বাংলায় লেখা ছিল খবির।

ইংরেজিতে বোর্ডে হয়তো লিখেছে  Khabir, মাউশিতে কম্পিউটারে লিখেছে Khobir. এভাবে অনেক শিক্ষক-কর্মচারীর শিক্ষা সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র ও এমপিও শীটে নামের বানানে পার্থক্য রয়েছে।  অনেকের নামের স্থলে ’Z'এর পরিবর্তে 'J' হয়ে আছে। কারো আবার 'G'. কারুর ক্ষেত্রে 'U'এর স্থলে 'O' হয়ে আছে। কারুর আবার 'I'এর স্থলে 'E' হয়ে আছে। কারুর কারুর শিক্ষা সনদ ও এমপিও শীটে কোন ভুল না থাকলেও আইডি কার্ডের নামের বানানে এক কিংবা দুই অক্ষরের মিল বা অমিল  আছে। সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষকদের ক্ষেত্রে  কয়েক লক্ষেরই এই সমস্যা হবে। বেশির ভাগ এমপিও শীটে নামের বানানে ভুল রয়েছে। এমপিওভুক্তির সময় নির্ধারিত ফরমে নামের বাংলা ও ইংরেজি বানান স্পষ্ট করে লিখে দিলেও এমপিও শীটে ইংরেজি বানানটি যে কারণেই হোক  দু’ একটি অক্ষর এদিক সেদিক হয়ে আছে। কেন হয়েছে, কিভাবে হয়েছে সেটির সঠিক কোন তথ্য নেই।তবে, শিক্ষকদের এমপিও-র টাকা পেতে খুব একটা বেগ পেতে হতোনাা। এখন ’মাউশি’ সেটিকে কিভাবে ম্যানেজ করবে।নামের বানানে কিংবা আলাদা আলাদা ডকুমেন্টে ভিন্নভিন্নভাবে লিখিত হওয়ার কারণে পুরো পদ্ধতিতে এক মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হবে। ’ইএফটি’ নামক উন্নত পদ্ধতির সেবা থেকে শিক্ষকগণ বঞ্চিত হওয়ার চিন্তায় অনেকে অস্থির হয়ে আছে। দৈনিক শিক্ষাকে তাদের দু:শ্চিন্তার কথা জানিয়েছেন। 

সেই লেখা সংশোধন করা তো সহজ নয়। সেই চট্টগ্রামের কোনো গ্রামের এক শিক্ষক সপ্তাহখানেক সময় সেক্রিফাইস করে যখন দুর্নীতির দূর্গখ্যাত শিক্ষা ভবনের মাউশি অধিদপ্তরে আসবেন ওনার কাজটি তো একদিনে বা দু’দেন বা সহজে হওয়ার কোন পথ নেই। এর শাখায় শাখায় বসে রয়েছেন কর্মকর্তা-মনস্ক ও বেসরকারি শিক্ষক-বিদ্বেষী বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত সরকারি কলেজ শিক্ষকরা। যদিও তারা শিক্ষক পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করেন। চট্টগ্রামের শিক্ষক যদি মাউশির মাধ্যমিক শাখার পরিচালকের কাছে যান। গেলে কবে যে তাকে পাওয়া যাবে তার তো কোন হিসেব নেই।

আমি নিজে ঢাকা থেকে বহুবার গিয়ে দেখেছি পরিচালক-উপপরিচালক-সহকারি পরিচালক রুমে নেই। অফিসের বাইরে। আর দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষকগণ এসে ঘন্টার পর ঘন্টার দিনের পর দিন এসে অপেক্ষা করছেন। কাঙ্খিত কর্মকর্তার সাথে কখন যে দেখা হবে তার কোন হিসেব নেই। ধরা যাক, দু’দিন /তিন ঘোড়াঘুরি করার পর মাধ্যমিক  পরিচালকের সাথে দেখা করলেন। তার সেকশনে কি কম্পিউটারে সেটি সংশোধন করার কোন সিস্টেম আছে? যতটা জানি নেই। নিশ্চয়ই কম্পিউটার সেকশন কিংবা যেখানে সব ডাটা আছে সেখানে দায়িত্ব নিয়ে কে সেই নাম ঠিক করবে? হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ শিক্ষক। এভাবে শিক্ষকদের অনেকেরই নাম সংশোধন করা হয়নি। শিক্ষকগন বলেছেন আমরা ’ টাকা দিয়ে এসেছি কিন্তু কাজ হয়নি।’ এখন টাকা কাকে দেন তারা? ঘন্টার পর ঘন্টার বসে থাকার  পর পিওন ও কর্মচারীরা যখন দেখেন  তখন তারা নিশ্চয়ই তাদের আশ্বাস দেন, টাকার বিনিময়ে তারা কজটি করে দেবেন। সেখানে কাজও হয়না, টাকা যায় জলে। 

শিক্ষা অধিদপ্তর বলছে, সব তথ্য সঠিক না থাকলে এমপিওর টাকা শিক্ষক কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে জমা হবে না। এসব তথ্য প্রতিষ্ঠান প্রধানের মাধ্যমে অনলাইনে সংগ্রহের জন্য মাধ্যমিক ও উচচ শিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ইএমআইএস সেলের লিংকসহ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হবে। এসব তথ্যগুলে সংগ্রহ করে শিক্ষকদের প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে  অধিদপ্তর। আমরা আশা করব কোন শিক্ষক যাতে কোন ধরনের হয়রাণির শিকার না হন এই ইএফটি-র মাধ্যমে তাদের প্রাপ্য পেতে। মাউশিকে খেয়াল রাখতে হবে যে, স্বল্প সময়ের মধ্যে বিশাল সংখ্যক শিক্ষকদের তথ্য সঠিকভাবে হালনাগাদ করার ক্যাপাসিটি তাদের কর্মকর্তাদের আছে কিনা। সময় নিয়ে এবং এলাকাভিত্তিক সমাধান করার তারিখ নির্ধারিত করে দিলে শিক্ষকদের হয়রানি অনেকটাই কমবে। তারও আগে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শাখা থেকে সরাতে হবে। 

বর্তমান পদ্ধতিতে গা-ছাড়াভাব প্রদর্শন করা হলে হাজার হাজার নয় এমনকি লক্ষ লক্ষ শিক্ষক ইএফটি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। সরকারের এমন একটি মহতী উদ্যোগকে আমরা কি  কতিপয় উচ্চাভিলাসী শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অদক্ষতার সাগরে ফেলে সেটিকে  ভেস্তে দিতে দিবো?

লেখক : মাছুম বিল্লাহ, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক। 


পাঠকের মন্তব্য দেখুন
হল না খোলার শর্তে সাত কলেজের পরীক্ষা গ্রহণের অনুমতি - dainik shiksha হল না খোলার শর্তে সাত কলেজের পরীক্ষা গ্রহণের অনুমতি স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়ার উসকানিদাতারা দেশের শত্রু: আমু - dainik shiksha স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়ার উসকানিদাতারা দেশের শত্রু: আমু রাস্তা ছাড়লেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা, যান চলাচল শুরু - dainik shiksha রাস্তা ছাড়লেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা, যান চলাচল শুরু শিক্ষক নেতা বাশারকে উচ্ছেদে শিক্ষা ভবনের সেই চিঠি, পদবি নিয়েও প্রতারণা - dainik shiksha শিক্ষক নেতা বাশারকে উচ্ছেদে শিক্ষা ভবনের সেই চিঠি, পদবি নিয়েও প্রতারণা যত দ্রুত সম্ভব স্কুল খুলে দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত : প্রতিমন্ত্রী - dainik shiksha যত দ্রুত সম্ভব স্কুল খুলে দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত : প্রতিমন্ত্রী এনসিটিবির ওয়েবসাইট ও ইমেইল হ্যাক করে সব স্কুলে চিঠি - dainik shiksha এনসিটিবির ওয়েবসাইট ও ইমেইল হ্যাক করে সব স্কুলে চিঠি পেছাচ্ছে না ৪০-৪২তম বিসিএস পরীক্ষার সময় - dainik shiksha পেছাচ্ছে না ৪০-৪২তম বিসিএস পরীক্ষার সময় ১৭ মে ঢাবির হল খোলার আগে পরীক্ষার সূচি নয় - dainik shiksha ১৭ মে ঢাবির হল খোলার আগে পরীক্ষার সূচি নয় এমপিওভুক্ত করা হবে আরো ৬৬১ শিক্ষককে - dainik shiksha এমপিওভুক্ত করা হবে আরো ৬৬১ শিক্ষককে please click here to view dainikshiksha website