জাতীয় বাজেটে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুবিধা

নিরঞ্জন রায় |

গত ৬ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব আওয়ামী লীগ সরকার তাদের নতুন মেয়াদের প্রথম বাজেট পেশ করেছে। সরকারের পক্ষে নতুন দায়িত্ব পাওয়া অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী মহান সংসদে আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট পেশ করেছেন। এবার বাজেট প্রণয়ন করা ছিলো সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং এক জটিল কাজ। কেনোনা দেশে ডলার সংকট বিরাজ করছে প্রায় দুই বছরের অধিক সময় ধরে, যা খুব সহসা কেটে যাবার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এদিকে ডলার সংকটের কারণে আছ তারল্য সংকট। এর ওপর উচ্চ মূল্যস্ফীতি এই মুহূর্তে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু তাই নয়, আমাদের দেশের যে বিশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থা এবং সাপ্লাই চেইন পদ্ধতি, তাতে সেখানে ফিসক্যাল পলিসি প্রয়োগ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ খুব একটা নেই। অথচ এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির সকল দায়ভার নিতে হয় সরকারকে। এ রকম বৈরি পরিস্থিতিতে জাতির প্রত্যাশা অনুযায়ী বাজেট প্রণয়ন করা দুরহ কাজ।   

অধিকন্তু বিশ্ব অর্থনীতি এখনো এক অনিশ্চিত অবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে। বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি এখনো বুঝে ওঠার সুযোগ নেই। আমেরিকাসহ ইউরোপের অনেক ধনী দেশ মুখে ভাল অর্থনৈতিক অবস্থার কথা বললেও কার্যক্ষেত্রে সেভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। যেমন–ধনি দেশগুলো মুখে বলছে মূল্যস্ফীতি কমে এসছে, বেকারত্ব সর্বনিম্ন পর্যায় আছে, চাকরির বাজার চড়া এবং স্টক মার্কেটও ঊর্ধ্বমুখী। অর্থনীতি এমন অবস্থায় থাকলে সেসব দেশের কেন্দ্রিয় ব্যাংকের নীতি সুদহার হ্রাস করার কথা। কিন্তু তারা সেটি এখন পর্যন্ত শুরুই করেনি। অন্যান্য দেশ আমেরিকার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানো শুরু করলে অন্যান্য ধনী দেশ তাদেরকে অনুসরণ করবে মাত্র। কিন্তু আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ তাদের নীতি সুদহার হ্রাসের সিদ্ধান্ত এখনো নেয়নি। যদি এবছরের শেষের দিক থেকে ফেডারেল নীতি সুদহার হ্রাস করতে শুরু করে, তাহলেও আগামি বছর পুরোটাই ডলার হার্ড কারেন্সি (অতি চাহিদার মুদ্রা) হিসেবে বিরাজ করবে। ফলে আন্তর্জাতিক লেনদেনে ডলারের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল দেশগুলোতে ডলার সংকট অব্যাহত থাকবে, যদি না ডলার সংগ্রহের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। আর সংগত কারণেই ডলার সংকট থাকলে, তারল্য সংকটও থাকবে এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিও থামবে না। এতোকিছু অনিশ্চয়তা স্বত্ত্বেও সরকারের নতুন অর্থমন্ত্রী অতীতের বাজেটের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই আগামী অর্থ বছরের জন্য বাজেট প্রণয়ন করতে পেরেছেন, সেটাই আশার কথা। 

ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিতে জাতীয় বাজেটের দুটো বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে। তার একটি হচ্ছে জনগণের কষ্ট লাঘব করা এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে দেশের ব্যবসায়ীদের বিশেষ সুযোগসুবিধা দেয়া, যাতে দেশে ব্যাবসায়িক তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। আমাদের দেশে বাজেটের প্রথম উদ্দেশ্য কখনই অর্জিত হয় না, তাতে সরকার যতোই জনগণের সহায়ক বাজেট প্রণয়ন করুক না কেনো। আমাদের দেশের একটা বাস্তবতাই হয়ে দাঁড়িয়েছে যে বাজেট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দ্রব্যমূল্য আরো একধাপ বেড়ে যায়, যা প্রকারান্তরে মানুষের ভোগান্তি বাড়ায়।

ব্যবসায়ীদের সহায়তা দেয়ার বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন প্রেক্ষাপট। কেনোনা এখানে কয়েক ধরনের ব্যবসায়ী আছেন, যেমন–বৃহৎ ব্যবসায়ী, রপ্তানিমুখী ব্যবসায়ী, আমদানিমুখি ব্যবসায়ী, মাঝারি বা এসএমই ব্যবসায়ী। এসব ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক সুসংগঠিত। কারণ, তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব ব্যবসায়ী সংগঠন যেমন আছে, তেমনি আছে প্রতিনিধি। এসব প্রতিনিধির সঙ্গে সরকার বাজেট প্রস্তুতের আগে বিষদ আলোচনা করেন এবং তাদের সহায়তার বিষয়গুলো বাজেটে প্রতিফলিতও হয়। এ কারণেই দেখা যায় বাজেট ঘোষণার পর ব্যাবসায়িক সংগঠনের পক্ষ থেকে স্বাগত জানানো হয় এবং ভালো বাজেট বলে আখ্যায়িত করা হয়। সেদিক থেকে বাজেটের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য কিছুটা হলেও অর্জিত হবার কথা। 

সমস্যা দেখা দেয় একেবারেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে। বিশেষ করে আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত যেসব খুদ্র ও ব্যক্তিগিত ব্যাবসা আছে তারাই বাজেট থেকে সেরকম কোনো সুবিধা পায় না। অন্তত বাজেট ঘোষণার পর সেরকম বিশেষ কিছু সুযোগ-সুবিধার বিষয় সেভাবে থাকে না, যা দেশের ক্ষুদ্র বা আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত ব্যবসায়ীদের জন্য রাখা হয়েছে। অথচ দেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র এবং আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত ব্যবসায়ীদের ভুমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যা কিছু করে তা তারা নিজেদের জমানো অর্থ বা ব্যাক্তিগতভাবে ধার করা অর্থ দিয়ে করে থাকে। ফলে তারা সরকার বা ব্যাংকের দায় হিসেবে গণ্য হয় না। দু-একজন ব্যতিক্রম বাদ দিলে, ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণে তাদের কোনো অংশ থাকে না। দ্বিতীয়ত, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে পণ্যসামগ্রী পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে তারা ভাল ভুমিকা রাখে। উৎপাদনকারী এবং বৃহৎ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পণ্যসামগ্রী ভোক্তার হাতে তুলে দেয়ার দায়িত্ব পালন করে এই ক্ষুদ্র এবং আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। সবচেয়ে বড় কথা দেশের বেকারত্ব দূর করতে এদের অপরিসীম ভূমিকা থাকে। দেশে যদি এক কোটি ক্ষুদ্র এবং আত্মকর্মসংস্থানের উপায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থাকে এবং প্রত্যেক ব্যবসার কাজে যদি দুই থেকে তিনজন মানুষ নিয়োজিত থাকে তাহলে আড়াই থেকে তিন কোটি লোকের কর্মসংস্থান হয় এই খাতে। কর্মসংস্থানের এতো বড় খাত হাওয়া স্বত্ত্বেও ক্ষুদ্র ও আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত ব্যাবসা আমাদের দেশে সেভাবে স্বীকৃতি পায় না। কারণ, এই খাতের তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নেই এবং যথেষ্ট অগোছালোভাবে চলছে। অতচ দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিকে টেকসই করতে হলে ক্ষুদ্র ও আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে এসে একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। উন্নত বিশ্বের আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যম হিসেবে ক্ষুদ্র ব্যবসাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ত্ব দেয়া হয় এবং সরকারীভাবে ব্যাপক সহযোগিতা প্রদান করা হয়। 

এ কথা ঠিক যে বাজেটের মাধ্যমে এই ক্ষুদ্র ও আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত ব্যাবসাকে খুব একটা সুবিধা দেয়ার সুযোগ নেই। এজন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে, যার মাধ্যমে এসব ব্যবসাকে নিবন্ধনের আওতায় আনা, ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করা এবং সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যাবস্থা থাকবে। বিষয়টি ভিন্ন প্রেক্ষাপট জন্যে এখানে আলোচনার সুযোগ নেই, তাই অন্য কোনো পরিসরে বিস্তারিত আলচনার ইচ্ছা রইলো। এসব ব্যবসার জন্য বাজেটে যে একেবারেই কিছু সুবিধা দেয়া যাবে না তেমন নয়। যেমন-তাদের নির্দিষ্ট একটি আয় পর্যন্ত আয়কর মুক্ত রাখা যেতে পারে। যাদের আশি শতাংশ ক্রয়বিক্রয় ডিজিটাল পদ্ধতিতে, অর্থাৎ নগদ-বিহীন (ক্যাশ-লেস) হবে এবং নিয়মিত ভ্যাট প্রদান করবে, তাদের ভ্যাটের একটি অংশ ফেরত দেয়া যেতে পারে। যারা নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিল করবে এবং বার্ষিক মুনাফা অর্জন করবে তাদের সহজ শর্তে এবং অল্প সুদের হারে ঋণ প্রদানের ব্যাবস্থা করা যেতে পারে। এ রকম অনেক পদক্ষেপই গ্রহণ করা যেতে পারে। অনেকেই ভাবতে পারেন যে ভ্যাট প্রদানের জন্য আবার কিছু অর্থ ফেরত দিতে হবে কেনো। দিতে হবে এজন্যে যে মানুষকে উৎসাহিত করতে হলে কিছু একটা সুবিধা দিতেই হবে। যদি এক হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় হয় তাহলে সেখান থেকে পাচ দশ কোটি টাকা প্রণোদনা হিসেবে প্রদান করতে সমস্যা হবার কথা নয়। আধুনিক কর ব্যবস্থায় ভয় দেখিয়ে কর আদায়ের সুযোগ কম। বরং উৎসাহ এবং অনুপ্রেরণা প্রদানের মাধ্যেম কর আদায়ে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনীতি এগিয়েছে অনেক দূর এবং আগামীতে আরো অগ্রগতি সাধিত হবে। এই উদ্দেশ্য সামনে রেখেই স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ২০৩১  খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ মধ্যম আয়ের দেশে, ২০৩৫ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়া এবং ২০৪১ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ দেশকে উন্নত বিশ্বের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। তা ছাড়া আঠার কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশে শুধুমাত্র চাকরি প্রদানের মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করা সম্ভব নয়। বেকারত্ব দূর করে স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিকে টেকসই করতে হলে ক্ষুদ্র ও আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত ব্যবসাকে অগ্রাধিকার দেয়ার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যেম যেমন এটি করতে হবে, তেমনি প্রতিবছর বাজেট বরাদ্দেও এসব ব্যবসার জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা থাকা প্রয়োজন। এমনটা করতে পারলে এসব অসহায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে যেমন কিছুটা লাভবান হবেন, তেমনি মানসিকভাবে বেশ উৎসাহিত হবে। যেহেতু প্রস্তাবিত বাজেট সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে মাত্র, তাই চূড়ান্তভাবে পাস হবার আগে দেশের ক্ষুদ্র ও আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত ব্যবসায়ীদের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা রাখার বিষয়টি বিবেচনার করা যেতে পারে।

লেখক: সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানিলন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার

 


পাঠকের মন্তব্য দেখুন
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পদত্যাগের জন্য বল প্রয়োগ করা যাবে না: শিক্ষা উপদেষ্টা - dainik shiksha শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পদত্যাগের জন্য বল প্রয়োগ করা যাবে না: শিক্ষা উপদেষ্টা শূন্যপদে বদলির দাবিতে শিক্ষকদের লংমার্চ - dainik shiksha শূন্যপদে বদলির দাবিতে শিক্ষকদের লংমার্চ শিক্ষকতা ছেড়ে আওয়ামী লীগে, সম্পদের পাহাড় গড়েন বাবুল - dainik shiksha শিক্ষকতা ছেড়ে আওয়ামী লীগে, সম্পদের পাহাড় গড়েন বাবুল শিক্ষাঙ্গনের ভদ্রতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন শিক্ষা উপদেষ্টা - dainik shiksha শিক্ষাঙ্গনের ভদ্রতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন শিক্ষা উপদেষ্টা জাতীয়করণের দাবিতে সপ্তম দিনের অবস্থান ধর্মঘটে ইবতেদায়ি শিক্ষকরা - dainik shiksha জাতীয়করণের দাবিতে সপ্তম দিনের অবস্থান ধর্মঘটে ইবতেদায়ি শিক্ষকরা খেয়াল রাখতে হবে শিক্ষার্থীরা এখনো ট্রমার মধ্যে - dainik shiksha খেয়াল রাখতে হবে শিক্ষার্থীরা এখনো ট্রমার মধ্যে দৈনিক শিক্ষার নামে একাধিক ভুয়া পেজ-গ্রুপ ফেসবুকে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষার নামে একাধিক ভুয়া পেজ-গ্রুপ ফেসবুকে কওমি মাদরাসা: একটি অসমাপ্ত প্রকাশনা গ্রন্থটি এখন বাজারে - dainik shiksha কওমি মাদরাসা: একটি অসমাপ্ত প্রকাশনা গ্রন্থটি এখন বাজারে গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ বৈষম্য বিরোধী ছাত্রদের - dainik shiksha গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ বৈষম্য বিরোধী ছাত্রদের please click here to view dainikshiksha website Execution time: 0.005324125289917