জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বৈত শাসন

মাছুম বিল্লাহ |

শিক্ষাবিষয়ক একমাত্র জাতীয় দৈনিক ‘দৈনিক আমাদের বার্তা’য় সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে দেখা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বেসরকারি কলেজগুলো দ্বৈত শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে শিক্ষার মান, শিক্ষা প্রশাসনে জটিলতা এবং এসব কলেজে শিক্ষাদানরত শিক্ষকদের করুণ দশার কথা। যুগ যুগ ধরে এসব কলেজে চলছে দ্বৈত শাসন। একটি হলো-নিয়ন্ত্রণকারী ও বেতন-ভাতা দেয়ার ক্ষমতার অধিকারী শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা অধিদপ্তর। অপরদিকে, রয়েছে শুধু তালিকা প্রকাশ আর নিয়োগ বোর্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি দেয়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

দীর্ঘদিন ধরে তারা এমপিওবিহীন, আদালতের বারান্দায় তাদের দৌড়াদৌড়ি ইত্যাদি চলছে আর মাঝখানে শিক্ষার মান নিম্নমুখী হচ্ছে। কিছুদিন আগে আমরা আর একটি প্রতিবেদন দেখেছিলাম, সেটি ছিলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে। সেখানে দেখানো হয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের ৪৮ শতাংশ বেকার থেকে যাচ্ছে। এজন্য কি শুধুই শিক্ষার্থীরা কিংবা শুধুই শিক্ষকরা দায়ী? এ প্রশ্ন সহজেই চলে আসে কিন্তু এর ভেতরকার কারণসমূহ আমরা খুঁজে দেখিনা। আমাদের বার্ত সেই গুরুত্বপূর্ন কাজটিই করেছে। 

ডিগ্রি, অনার্স ও মাস্টার্স স্তরের বেসরকারি কলেজগুলো পরিচালনার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের চাকরির শর্তাবলি রেগুলেশন মানতে হয়। আবার এসব কলেজে নিয়োগ ও পরিচালনার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো এবং এমপিও নীতিমালা রয়েছে, যা মেনে চলার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। গত ১১ জানুয়ারি অধ্যক্ষ নিয়োগের নতুন একটি সার্কুলার জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেখানে বলা হয়েছে, বেসরকারি কলেজে অধ্যক্ষ নিয়োগের কমিটিতে জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি থাকবেন। পাঁচ সদস্যের এই নিয়োগ কমিটিতে শিক্ষা বোর্ড ও মাউশির একজন করে প্রতিনিধিও থাকতে হবে। নিয়োগ পরীক্ষায় প্রতি পদের বিপরীতে কমপক্ষে তিনজন প্রার্থী থাকতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা অনুযায়ী বেসরকারি কলেজসমূহে অনার্স কোর্স পরিচালনার জন্য প্রতিটি বিভাগে সাতজন শিক্ষক থাকতে হবে এবং মাস্টার্স কোর্সে অতিরিক্ত আরো পাঁচজন শিক্ষক অর্থাৎ মোট ১২ জন শিক্ষকের প্রয়োজন হবে। প্রতিটি বিভাগে একজন অধ্যাপক, দুইজন সহযোগী অধ্যাপক, চারজন সহকারী অধ্যাপক ও পাঁচজন প্রভাষকসহ মোট ১২ জন থাকায় বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় অনার্স কলেজে প্রতি বিষয়ে শূন্যপদে মাত্র তিনজন শিক্ষক নিয়োগের বিধান আছে। অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগের সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। কোনো কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুসরণ করে অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক পদে নিয়োগ দিলে তা গ্রহণ করছে না শিক্ষা মন্ত্রণালয়। 

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম মেনে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে বেতন-ভাতা দেয়া হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিতে তা অবৈধ। তার মানে হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হলে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দেয় এমপিওসহ অন্যান্য ভাতা প্রাপ্তি থেকে। মন্ত্রণালয় যেহেতু এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ডিল করে, তাদের দেয়া নিয়ম না মানলে সেই কলেজ ও শিক্ষকদের দুর্দশা ভোগ করতে হচ্ছে। অথচ একটি বিষয়ে তিনজন শিক্ষক দিয়ে অনার্স পড়ানো সম্ভব নয় যে কথা মন্ত্রণালয়ের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। 

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা অনুযায়ী চাকরিতে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সহকারী অধ্যাপক অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ পদে আবেদন করতে পারবেন। অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নীতিমালা অনুযায়ী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত হিসেবে তিন বছরের অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ পদের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উপাধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত হিসেবে উচ্চমাধ্যমিক কলেজের অধ্যক্ষ/ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ/এমপিওতে তিন বছরের সহকারী অধ্যাপক পদে এবং মোট ১২ বছরের শিক্ষকতা অভিজ্ঞতা থাকার বিধান রয়েছে। ফলে নিয়োগ নিয়ে জটিলতা লেগেই আছে। আবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী কলেজে শিক্ষক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি নিয়োগ নির্বাচনী বোর্ড গঠন করে গভর্নিং বডির মাধ্যমে সরাসারি শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার বিধান রয়েছে। অথচ ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের ২২ অক্টোবরের পর থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে গভর্নিং বডির ক্ষমতা রহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের বিধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অনার্স মাস্টার্স কলেজে অতিরিক্ত শিক্ষক প্রয়োজন হলে কীভাবে নিয়োগ দেয়া হবে, তার বর্ণনা নেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিধিমালায়। কলেজে ডিগ্রি পাস কোর্স অনুমতি নিতে গিয়ে তিনজন করে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বেসরকারি ডিগ্রি কলেজগুলো। আর এতেই  ঘটে বিপত্তি। দুইজন শিক্ষক এমপিওভুক্ত হলেও তৃতীয় জন দীর্ঘদিন যাবত এমপিওভুক্ত হতে পারছিলেন না। উচ্চ আদালতে গিয়ে বিষয়টির সমাধান করতে হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্থ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি (পাস) কলেজের এই জনবল কাঠামোকে সমন্বয়হীনতার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। 

এদিকে, দেশের অনার্স মাস্টার্স কোর্সের ৩৫০ বেসরকারি কলেজের শিক্ষকেরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দীর্ঘ ২৮ বছরেও জনবল কাঠামো তৈরি না করায় শুধু অনার্স ও মাস্টার্স কোর্সের শিক্ষক-কর্মচারীরা এমপিও সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের জনবল কাঠামো অনুযায়ী অনার্স-মাস্টার্স স্তরে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়নি। অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবিধানে এই সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগে আট শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনার্স মাস্টার্স কোর্স চালু করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো বেগবান, গতিশীল, মানসম্পন্ন ও যুগের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা প্রদান করা জন্য দেশের সমস্ত বেসরকারি ডিগ্রি, অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের কলেজগুলো সরাসরি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সম্পূর্ণভাবে ন্যস্ত করা প্রয়োজন। তারা শুধু সার্টিফিকেট দেয়া আর নিয়োগ বোর্ডে প্রতিনিধি পাঠানোর প্রতিষ্ঠান হিসেবে থাকবে সেটি হলে এর মান বৃদ্ধি কিংবা এই বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি কার্যকরী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাই বেসরকারি কলেজগুলোর সব ধরনের নিয়োগ, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দেয়া, পদোন্নতি ও শিক্ষার মান বৃদ্ধির যাবতীয় কাজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা প্রয়োজন এবং জাতীয় বাজেটে সেই ধরনের বরাদ্দ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয়ার দরকার। মাউশিকে শুধুমাত্র উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত দায়িত্ব ন্যস্ত করা প্রয়োজন। 

অযথা মাথাভারি প্রশাসন এবং তথাকথিত উচ্চশিক্ষা মাউশির অধীনে থাকায় কোনো ভাবে এর মানও বাড়ছেন আর মাউশিতে কাজের গতি আসছে না। এতো বিশাল বহরের কলেজগুলোর সার্বিক দায়িত্ব এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বৈত দায়িত্ব পালন করার ফলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যলয় একটি অকার্যকরি কিংবা মানহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, মাউশি অধিদপ্তর হাজার হাজার সরকারি-বেসরকারি স্কুল ও কলেজ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজও দ্রুত এবং চাহিদা মাফিক সম্পন্ন করা হয়ে উঠছে না। সরকারি যেসব কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স পড়ানো হয় সেগুলোক স্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যলয়ের অধীনে ন্যস্ত করা প্রয়োজন। 

নতুন শিক্ষামন্ত্রী এই ধরনের একটি ঘোষণা দিয়েছেন এবং ইতোমধ্যে সম্ভবত কাজও শুরু হয়ে গেছে। এটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে কলেজগুলোর স্ট্যাটাস যেমন বাড়বে তেমনি শিক্ষার মানেরও উন্নতি ঘটবে। এসব কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ক্লাস নিতে পারবেন এবং ক্যাডারভুক্ত শিক্ষকেরা মন্ত্রণালয় থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন এই কলেজগুলোতে ডেপুটেশনে যাবেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিয়ন্ত্রণ করবেন। তাতে, তারা একটু জবাবাদিহিতার মধ্যে থাকবেন, ফলে পড়াশোনাসহ সার্বিক ক্ষেত্রে অনেকটাই পরিবর্তন ঘটবে। 

সর্বশেষ বেসরকারি কলেজ পরিচালনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথক দুটি বিধিমালায় গুরুত্বপূর্ন বিষয়গুলোতে সমন্বয়হীনতার অবিযোগ উঠেছে। একটি অপরটির সঙ্গে সাংঘর্ষিকও। ফলে দুই বিধিমালার আলোকে কলেজ পরিচালনা করতে গিয়ে নানামুখী ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষকেরা। আমাদের শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে এবং শিক্ষা প্রশাসনকে অধিকতর কার্যকরী ও স্মার্ট করার নিমিত্তে উপরোক্ত বিষয়গুলোতে দৃষ্টি দেয়া একান্ত প্রয়োজন। উপরোক্ত বিষয়গুলোর সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র মন্ত্রণালয় কিংবা শুধুমাত্র জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিতে পারবে না। এ জন্য প্রয়োজন হবে আমাদের জাতীয় সংসদে বিষয়গুলো উত্থাপন করা। জাতীয় স্বার্থে সেটি আমাদের শিগগিরই করা উচিত। 

লেখক: ক্যাডেক কলেজের সাবেক শিক্ষক

 

 


পাঠকের মন্তব্য দেখুন
ষাণ্মাসিক মূল্যায়ন নির্ধারিত দিনে শেষ করতে হবে পাঁচ ঘণ্টায় - dainik shiksha ষাণ্মাসিক মূল্যায়ন নির্ধারিত দিনে শেষ করতে হবে পাঁচ ঘণ্টায় কওমি মাদরাসায় বিশেষ সেল ও কমিটি গঠন করতে ছাত্রলীগকে নির্দেশ শিক্ষামন্ত্রীর - dainik shiksha কওমি মাদরাসায় বিশেষ সেল ও কমিটি গঠন করতে ছাত্রলীগকে নির্দেশ শিক্ষামন্ত্রীর ১৩৫৭ জনকে মৌলভী ও আইসিটি শিক্ষক পদে সুপারিশ এনটিআরসিএর - dainik shiksha ১৩৫৭ জনকে মৌলভী ও আইসিটি শিক্ষক পদে সুপারিশ এনটিআরসিএর পরীক্ষা না দিয়ে পাস: দুজনের খোঁজ নিতে গিয়ে ধরা ১৭ শিক্ষার্থী - dainik shiksha পরীক্ষা না দিয়ে পাস: দুজনের খোঁজ নিতে গিয়ে ধরা ১৭ শিক্ষার্থী বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন পেনশন আটকে থাকা সেই শিক্ষকের স্ত্রী - dainik shiksha বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন পেনশন আটকে থাকা সেই শিক্ষকের স্ত্রী বৌদ্ধ ও সংস্কৃত টোল শিক্ষকদের অনুদানের চেক ছাড় - dainik shiksha বৌদ্ধ ও সংস্কৃত টোল শিক্ষকদের অনুদানের চেক ছাড় দৈনিক শিক্ষার নামে একাধিক ভুয়া পেজ-গ্রুপ ফেসবুকে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষার নামে একাধিক ভুয়া পেজ-গ্রুপ ফেসবুকে কওমি মাদরাসা: একটি অসমাপ্ত প্রকাশনা গ্রন্থটি এখন বাজারে - dainik shiksha কওমি মাদরাসা: একটি অসমাপ্ত প্রকাশনা গ্রন্থটি এখন বাজারে র‌্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা কলেজগুলোর নাম এক নজরে - dainik shiksha র‌্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা কলেজগুলোর নাম এক নজরে please click here to view dainikshiksha website Execution time: 0.0047869682312012