সমান মেধাবী হলেও বেতন সাড়ে ৬ হাজার টাকা কম

নিজস্ব প্রতিবেদক |

৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ ৮৯৮ জনকে নন-ক্যাডার হিসেবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের সুপারিশ করেছিল সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি)। একই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও প্রায় সমান মেধার অধিকারী অন্য প্রার্থীদেরও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন নন-ক্যাডার পদে দশম গ্রেডে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। অথচ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের দুই ধাপ নিচে ১২তম গ্রেডে (১১,৩০০ টাকা, প্রশিক্ষণবিহীন হওয়ায়) নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এটি কার্যকর হলে নবনিযুক্ত প্রধান শিক্ষকরা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ পাওয়া তাদের সমান মেধার অধিকারী প্রার্থীদের চেয়ে মূল বেতন কম পাবেন ৪ হাজার ৭০০ টাকা। সে হিসেবে প্রতি মাসে কম পাবেন ৬ হাজার ৭৮৫ টাকা।

এ অবস্থায় প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সুপারিশপ্রাপ্তরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ ইতিমধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছে। এমনকি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ২০১৫ সালের ১১ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে প্রধান শিক্ষক পদকে দ্বিতীয় শ্রেণীর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে গত বছরের ২২ মে অর্থ বিভাগের চিঠিতেও পদটিকে দ্বিতীয় শ্রেণীর উল্লেখ করা হয়েছে। পিএসসি থেকেও দ্বিতীয় শ্রেণীর পদে নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। তাহলে কিসের ভিত্তিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের ১২তম গ্রেডে নিয়োগ দেয়ার চেষ্টা করছে। বিষয়টি নিয়ে শুধু সুপারিশপ্রাপ্তরাই নন, বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষকদের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা বলছেন, জটিলতায় ফেলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকদের পদমর্যাদা অবনমন করে রাখার চেষ্টা চলছে।

তবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব মোহাম্মদ আসিফ-উজ-জামান  বলেন, যেহেতু প্রধান শিক্ষকের পদটি গেজেটেড হয়েছে, তাই তারা পিএসসির কাছে এই পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করতে অনুরোধ জানান। সে অনুযায়ী ওই সব প্রার্থীর সুপারিশ করে পিএসসি। এখন বিদ্যমান নিয়মে প্রধান শিক্ষকেরা যে গ্রেডে নিয়োগ পান, তারাও সেভাবেই নিয়োগ পাবেন। এখানে তাদের কিছু করার নেই। কারণ সারা দেশের প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকরা ১২তম গ্রেডেই যোগদান করেছেন এবং ওই গ্রেডেই বেতন-ভাতা পাচ্ছেন।

মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তার এই ব্যাখ্যায় খুশি হতে পারেননি সুপারিশপ্রাপ্তরা। তাদের যুক্তি, আগের শিক্ষকেরা পিএসসির পরীক্ষায় অংশ নিয়ে নিয়োগ পাননি। তা ছাড়া পদটি দ্বিতীয় শ্রেণীর হওয়ার কারণেই পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ হচ্ছে। তাহলে কেন আগের মতো তৃতীয় শ্রেণীর গ্রেডে নিয়োগ দেয়া হবে। ওই গ্রেডে নিয়োগ দেয়া হলে মন্ত্রণালয় নিজেরাই আগের মতো পরীক্ষা নিয়ে নিয়োগ দিতে পারত।

জানতে চাইলে পিএসসির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ক্যাডার) আ.ই.ম নেছার উদ্দিন এ প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের কাছে পদের নাম উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়গুলো নিয়োগের সুপারিশ চায়। আমরা সংশ্লিষ্ট পদের নিয়োগবিধিতে উল্লিখিত বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচনা করে নিয়োগের সুপারিশ করে থাকি। একই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া কাউকে দশম আবার কাউকে ১২তম গ্রেডে কেন নিয়োগের সুপারিশ করা হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে নেছার উদ্দিন জানান, তারা শুধু সংশ্লিষ্ট পদের নাম উল্লেখ করে সুপারিশ করেছেন, গ্রেডের বিষয় নয়। ওই পদ কোন গ্রেডের সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সিদ্ধান্ত নেবে। তবে পিএসসি কখনও তৃতীয় শ্রেণীর পদে নিয়োগের সুপারিশ করে না।

গত ১০ আগস্ট ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মধ্যে নন-ক্যাডার হিসেবে ৮৯৮ জনকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে (দ্বিতীয় শ্রেণী) নিয়োগের সুপারিশ করে পিএসসি। কিন্তু এতদিন পরও তাদের নিয়োগ দিতে পারেনি মন্ত্রণালয়। এর চারদিন পর গত ১৪ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক পদে একই পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের নিয়োগের সুপারিশ করে পিএসসি। ইতিমধ্যে দশম গ্রেডে তাদের নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। একইভাবে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মুখ্য পরিদর্শক, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের সঞ্চয় অফিসার, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে শ্রম পরিদর্শক, সমাজসেবা অধিদফতরের সমাজসেবা অফিসার ও জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সহকারী প্রটোকল অফিসারসহ পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্তদের দশম গ্রেডে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। ব্যতিক্রম শুধু প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে। তারা সুপারিশপ্রাপ্তদের ১২তম গ্রেডে নিয়োগ দিতে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কমিটির অন্যতম সদস্য শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহম্মদ বলেন, ‘আমরা শিক্ষার মান উন্নয়নের কথা বললেও শিক্ষকদের মর্যাদা দিতে চাই না। তাদের সমাজে যত রকমভাবে হেয় করা যায়, সেই চেষ্টাই করি। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো দরকার। সমাজের অন্যদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যদি শিক্ষকেরা না চলতে পারেন তাহলে তারা মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করবেন কী করে? সরকারি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের পদমর্যাদা যদি দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত করা হয়ে থাকে তাহলে কেন তাদের তৃতীয় শ্রেণীর গ্রেডে নিয়োগ দেয়া হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান সংশোধন করতে হবে। শিক্ষকদের সম্মান দিলেই কেবল এ পেশায় মেধাবীরা আসতে আগ্রহী হবে।

সূত্র জানায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদটি ২০১৪ সালে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত করেছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু তখন মন্ত্রণালয় কৌশলে প্রধান শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণ করে ১১তম (প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত) ও ১২তম গ্রেডে (প্রশিক্ষণবিহীন)। ওই সময় যুক্তি দেখানো হয়- সহকারী উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসার পদটি বর্তমানে দশম গ্রেডের। তারা মূলত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে থাকেন। প্রধান শিক্ষকদের পদ সম গ্রেডের হলে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে এখন বিসিএসে উত্তীর্ণদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম বাস্তবায়ন করতে চাইছে মন্ত্রণালয়। অথচ নন-ক্যাডার পদে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন পদে যারা নিয়োগ পেয়েছেন বা পেতে যাচ্ছেন, তারা সবাই দশম গ্রেডে যোগ দিয়েছেন বা দিচ্ছেন। সুপারিশপ্রাপ্তদের প্রশ্ন, যদি অন্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থদের দশম গ্রেডে নিয়োগ দেয়া হয়, তাহলে তাদের কেন এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হবে। একই মেধায় উত্তীর্ণ হলেও কেন তাদের দুই গ্রেড নিচের চাকরিতে যোগদান করতে হবে। এতে অন্যদের চেয়ে তাদের বেতন স্কেল কম হবে ৪ হাজার ৭০০ টাকা। ১২তম গ্রেডে মূল বেতন ১১ হাজার ৩০০ টাকার ৫৫ ভাগ বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ১৫০০ টাকা ও টিফিন ভাতা ৫০০ টাকা। এ হিসেবে মোট বেতন হয় ১৯ হাজার ৫১৫ টাকা। অন্যদিকে দশম গ্রেডে মূল বেতন ১৬ হাজার টাকার ৫৫ ভাগ বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা ১৫০০ টাকা হিসেবে মোট পাবেন ২৬ হাজার ৩০০ টাকা। ফলে প্রতিমাসে তারা ৬ হাজার ৭৮৫ টাকা কম পাবে। এতে তাদের সামাজিক অবস্থান দশম গ্রেডধারীদের তুলনায় নিচে হবে। এ রকম করলে মেধাবীরা আর শিক্ষকতায় আসতে চাইবেন না।


পাঠকের মন্তব্য দেখুন
শুক্রবার স্কুল খোলার সিদ্ধান্ত হয়নি, জানালো শিক্ষা মন্ত্রণালয় - dainik shiksha শুক্রবার স্কুল খোলার সিদ্ধান্ত হয়নি, জানালো শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্কুল-কলেজ শিক্ষকদের এপ্রিল মাসের এমপিওর চেক ছাড় - dainik shiksha স্কুল-কলেজ শিক্ষকদের এপ্রিল মাসের এমপিওর চেক ছাড় গুচ্ছের ‘বি’ ইউনিটে প্রথম লামিয়া - dainik shiksha গুচ্ছের ‘বি’ ইউনিটে প্রথম লামিয়া প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগে দ্বিতীয় ধাপের চূড়ান্ত ফল আগামী সপ্তাহ - dainik shiksha প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগে দ্বিতীয় ধাপের চূড়ান্ত ফল আগামী সপ্তাহ ছাত্রলীগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিলিস্তিনের পতাকা উড়াবে কাল - dainik shiksha ছাত্রলীগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিলিস্তিনের পতাকা উড়াবে কাল চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ করার বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রী যা জানালেন - dainik shiksha চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ করার বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রী যা জানালেন গুচ্ছের ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ, পাস ৩৬.৩৩ শতাংশ - dainik shiksha গুচ্ছের ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ, পাস ৩৬.৩৩ শতাংশ কওমি মাদরাসা : একটি অসমাপ্ত প্রকাশনা গ্রন্থটি এখন বাজারে - dainik shiksha কওমি মাদরাসা : একটি অসমাপ্ত প্রকাশনা গ্রন্থটি এখন বাজারে দৈনিক শিক্ষার নামে একাধিক ভুয়া পেজ-গ্রুপ ফেসবুকে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষার নামে একাধিক ভুয়া পেজ-গ্রুপ ফেসবুকে please click here to view dainikshiksha website Execution time: 0.0039989948272705